Sunday, 19 November, 2017 | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
কান থেকে ডিভাইস পড়ে ধরা খেলেন শাবিতে ভর্তিচ্ছু দুই শিক্ষার্থী!  » «   শাহজালালের মাজারের কুপের পানিকে জমজমের পানি বলে প্রতারণা: তদন্তের নির্দেশ আদালতের  » «   মৌলভীবাজারে অবাধে চলছে পাহাড় কাটা  » «   কিংবদন্তি নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী  » «   নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে:জেলা প্রশাসক  » «   আম্বরখানায় ছাত্রলীগ ও অটোরিক্সা শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ, অবরোধ  » «   সম্মানিত হয়েছে ইউনেস্কো : ড. জাফর ইকবাল  » «   সিলেট মহানগর বিএনপির আনন্দ সমাবেশ অনুষ্ঠিত  » «   খাদিমপাড়ায় টিলাকাটার অভিযোগে একজনকে দুইলক্ষ টাকা জরিমানা  » «   জৈন্তাপুরে বেকারদের জন্য ন্যাশনাল সার্ভিস চালু  » «   এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে আগুন: ২৯ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী জড়িত  » «   ওসমানী মেডিকেলের ইর্মাজেন্সী গেইটে অটোরিক্সা ভাংচুর  » «   যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েই চলেছে  » «   সিলেটে জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের বিক্ষোভ সমাবেশ  » «   সিলেটে শতকোটি টাকা ব্যয়ে ইসকন মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন  » «  

 

Advertisement
Advertisement

২০১৭-১৮সালের বাজেটঃ প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নপূরণের বাজেট: ড. মোমেন

বাজেট নিয়ে এবার অনেক বিতর্ক হল যা দেশের জন্য ভালো। তবে বিতর্ক যদি ব্যক্তি বিশেষের উপর বিশেধাগার না হয়ে বস্তুনিষ্ঠ হতো, তাহলে আরও ভালো হতো। তবে সুখের বিষয় যে, এ সব আলোচনা-সমালোচনায় জনগণের মঙ্গল হয়েছে, বাজেটটি জন-বান্ধব হয়েছে এবং বাজেট যে শুধুমাত্র কয়েকটি অংকের সমাহার নয় –এর জীবন আছে, এর প্রয়োজনে মানুষের যেমন উপকার হবে, একই ভাবে অতিরিক্ত করের বোঝায় মানুষের জীবন অভিশপ্ত হতে পারে – এসত্যটি আবার প্রমাণিত হলো।

নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত ভ্যাট বাধ্যতামূলক করলে ভোটের খেলায় পরাজয় হতে পারে, সরকারে পুনঃনির্বাচনে জয় বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে – এ উপলব্ধি নিশ্চয়ই উত্তম। শুধু ভ্যাটের ক্ষেত্রে নয় গুটি কতেক পুলিশের অতিমাত্রায় খবরদারি ও অত্যাচার বা সরকারিকর্মচারী অথবা কোন কোন দলীয় নেতৃতের দুর্নীতি বা অবিচার যে ভোটের খেলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে তার উপলব্ধি ও অতীব প্রয়োজন এবং সেই মতে কাজ করা প্রয়োজন বৈকি।

বস্তুতঃ গুটিকতেক দুর্নীতি পরায়ণ লোকের জন্যে বা অতি উৎসাহী কর্মচারী বা দলীয় নেতৃতের জন্য সময় সময় সরকারের বহুবিদ উন্নয়ন এবং জন-বান্ধব সেবা ম্লান হয়ে যায়। যেমন বেসিক বা সোনালী ব্যাংকের কেলেঙ্কারি বা হরিল্লুট এবং অসৎলোকদের যথোপযুক্ত শাস্তিনা দেয়ায় বা আড়াল করায় সরকারি ও বিরোধীদলীয় সাংসদরা এক বাক্যে সরকারের উপর বিশোদাগার করেছেন এবং মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে Scapegoat বা “বলিরপাঠা” বানিয়েছেন। তবে এসব ব্যাংক কেলেংকারির নায়করা কিন্তু আড়ালেই থেকে গেলেন। সমালোচকরা বলেছেন “চোরেরগলাবড়গলা” এবং এদের মধ্যেই অনেক রাঘব গোয়াল রয়েছেন যারা সরকারের সুযোগ-সুবিধা অন্যায়ভাবে নিয়েছেন এবং তারা সরকার থেকেও ক্ষমতাবান এবং এর ফলে অর্থমন্ত্রণালয় ও অর্থমন্ত্রী কোনো কেলেংকারির রিপোর্টটিও জনসমক্ষে প্রকাশকরতে পারেননি।

কোন একজন মাননীয় সংসদ ব্যাঙ্ক গুলোকে সচল রাখতে সরকারি অনুদান প্রদানকে “ক্রিমিনাল” আইনের আওতায় এনে মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে জেলে পাঠাতে সুপারিশ করেছেন। ব্যাঙ্কগুলোকে সচল না রাখলে যে বহুলোকের চাকরি যাবে, অর্থনীতির সমূহ ক্ষতি হবে – এক এক করে কয়েকটি ব্যাংক যদি দেওলিয়া হয়ে যায় বা লালবাতি জ্বালায় তাহলে বৃহত্তর অর্থনীতির উপর এর যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তাহয়তো তিনি ভেবে দেখেননি। তিনি হয়তো জানেন না যে ২০০৮সালে যখন মার্কিন অর্থনীতিতে ধস নামে তখন অনেক ব্যাংক দেওলিয়া হয় বা লাল বাতি জ্বালায়। যখন আরো অনেকগুলো বড় বড় ব্যাংক দেওলিয়া হয়ে যাচ্ছিল তখন এগুলোকে জিয়িয়ে রাখার জন্যে প্রথমে বুশপ্রশাসন এবং পরবর্তীতে ওবামা প্রশাসন দু-দুবারে সর্বমোট ৬.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়ে মার্কিন ব্যাঙ্ক সমূহ ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখেন এবং এর ফলে গোটা বিশ্বঅর্থনীতি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠে। এই ভর্তুকিকে তারা “স্টিমুলাসপ্যাকেজ” (Stimulus Package) হিসাবে আখ্যায়িত করেন। আমাদের দেশেও পোশাক শিল্পকে চাঙ্গা রাখার জন্যে “স্ট্রিমুলাস” বা “প্রণোদনা” প্রদান করা হয়। যাই হোক এসব বিতর্কে না গিয়ে যে জিনিসটি লক্ষ্যনীয় তা হচ্ছে সরকার দলীয় মন্ত্রীরাও যারা প্রস্তাবিত বাজেটটি মন্ত্রীসভায় পাশ করেছেন তারাও এনিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য রাখেন। প্রস্তাবিত বাজেটটি অর্থমন্ত্রী মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন এবং উপস্থাপন করার আগে তা মন্ত্রীসভায় চুল-চেরা বিশ্লেষণ করে মন্ত্রীসভার সকল সদস্যবৃন্দের সম্মতিতে তা গৃহীত হয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে মন্ত্রীসভার মিটিং এ মাননীয় মন্ত্রীরা তাদের সুপারিশগুলো কি তুলে ধরেছিলেন এবং তুলে ধরার পর যখন তা গৃহীত হলো না তখন তারা কেন তা মেনে নিলেন? মোট কথা মন্ত্রীসভা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে প্রস্তাবিত বাজেটগৃহীত হয় এবং প্রস্তাবিত বাজেটটি যেহেতু “যৌথ বা জয়েন্ট দায়-দায়িত্ব”, তাহলে একজনের উপর এত গলাবাজি কেন? ভ্যাটের বিষয়টি ২০১২ সালে এসরকার গ্রহণ করে এবং গেল বছর তা বাস্তবায়ন না করে এ বছরে করবে বলে প্রস্তাব দেয়। প্রাক-বাজেট আলোচনায় নতুন ভ্যাট আইন এ বছরে চালু না করার জন্যে সুপারিশ এসেছে, তবে অর্থ মন্ত্রনালায় ও মন্ত্রীসভা তা আমলে নেয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটের তিনটি ইস্যু সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এগুলো হচ্ছে
(১) নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়নের প্রস্তাব
(২) ব্যাঙ্কে সঞ্চয়ী একাউন্টের উপর আবগারী শুল্ক আরোপ এবং
(৩) লোকসানি ব্যাঙ্কগুলোকে অতিরিক্ত টাকা বরাদ্দকরণ এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদ মার্কেট-ভিত্তিক করার সুপারিশ।
উল্লেখ্য যে, গৃহীত বাজেটে (১) ও (২) নং বাতিল হয়েছে এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদ এখনও আগের মতো অধিক রয়ে গেছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগণের যাতে অসুবিধা না হয় সেজন্যে এক্ষেত্রে পুরাতন সুদ রাখা হয়েছে যেহেতু এদের অনেকেই সঞ্চয়পত্রের সুদের উপর নির্ভরশীল।

তবে তারা এক্ষেত্রে আবগারী শুল্কের মতো ব্যবস্থা নিতে পারতেন। ইনস্টিটিউশন বা কর্পোরেট সঞ্চয় পত্রের উপর আলাদা সুদ নির্ণয় করা হয়তো অযুক্তিক নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এ কয়েকটি দুর্বলতা ছাড়া, বাজেটটি অত্যন্ত উন্নতমানের। বস্তুতঃ বলা চলে  যে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন “সোনার বাংলা” বাস্তবায়নে এবং দেশরত্ন শেখ হাসিনার “ভিশন ২০২১” ও “ভিশন ২০৪১” অর্জনের এ হচ্ছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার এবং রোডম্যাপ। তাই অর্থমন্ত্রী যথার্থ বলেছেন যে এ বাজেট হচ্ছে তার “শ্রেষ্ঠ বাজেট”। যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর “রূপকল্প” বা “ভীষণগুলো” অর্জন করতে হয় তাহলে এ বাজেটের বিকল্প সীমিত।

২০১৭-২০১৮ সালের বাজেট গেল কয়েকটি বাজেটের ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতি ও অর্জন। এর প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে উন্নয়নের মহাসড়কে আমরা যে যাত্রা শুরু করেছি তা চরিতার্থ করা এবং অর্জন করা। এজন্যেই এ বাজেটে উন্নয়ন বা ডিভালপমেন্ট খাতে অধিক বরাদ্দ ধরা হয়েছে। ২০১৬-২০১৭ সালে ডিভালপমেন্ট খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫% ভাগ, বর্তমান বাজেটে ৪১% ভাগে বর্ধিত করা হয়েছে যা চারটিখানি কথা নয়।

২০১৭-২০১৮ বার্ষিক বাজেট
মোট বাজেট
(কোটি টাকা)    উন্নয়ন বাজেট
(কোটি টাকা)    অন্নুয়ন বাজেট
(কোটি টাকা)
৪,০০,২৬৬    ১,৫৩,৩৩১
(৩৮.৩%)    ২,৩৬,১৮২
(৫৯.০%)
স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহ    ১০,৭৫৩
(২.৬৯%)
= ৪১%

অর্থাৎ মোট বাজেট যা ৪ লক্ষ ২৬৬ কোটি টাকা এর মধ্যে উন্নয়ন বাজেটে সর্বমোট ব্যয় হচ্ছে ১,৬৪,০৫৮ কোটি টাকা বা ৪১% শতাংশ।

তবে দুঃখের বিষয় এই যে, উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন দিন দিন অধিকতর খারাপ হচ্ছে। ২০০৮-২০০৯ সালে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন ছিল প্রায় ৮৯.৪% ভাগ এবং তা ২০১০-২০১১ সালে বর্ধিত হয়ে দাড়ায়  ৯৭.১% ভাগে। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে বাস্তবায়ন দিন দিন খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে যেমন ২০১৫-২০১৬ তে তা দাড়ায় ৭৬.২৬% শতাংশ। সেজন্য বাজেট বাস্তবায়নের উপর সমধিক জোর দিতে হবে। সেই সাথে বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে বেহুদা বা স্পুরিয়াস কাজে অপচয় না হয় তার জন্যে তদারকি বাড়ানো দরকার। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ যে, সিলেট সুনামগঞ্জ এলাকায় যে সমস্ত বাঁধ দেয়ার জন্যে টাকা বরাদ্দ হয় তার ৯০% ভাগই নাকি অপচয় হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্থ দুর্বল বাঁধগুলো ভেঙ্গে যখন “কালো পানি” অত্র এলাকায় প্রধান ফসল, হাজারহাজারকোটি টাকার শস্য, মাছ, পাখি ধ্বংস করে নিয়ে যায় তখন “হাওয়র উন্নয়ন বোর্ডের” নয়জন ঊর্ধ্বতন কর্মচারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “নায়াগ্রা” প্রপাত ভ্রমণে হাওয়া খাচ্ছিলেন। এমন সংবাদ সরকারের ভাবমূর্তিকে দুর্বল করে এবং বিদেশ সফরের যে অপ্রতিরোধ্য হিড়িক শুরু হয়েছে যারফলে সরকারের সম্পদের বা জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকারই অপচয় হচ্ছে সে সম্পর্কে সজাগ হওয়া প্রয়োজন বৈকি।

বর্তমান সরকার মানুষের প্রত্যাশাকে অনেক অনেক উর্ধেনিয়ে গেছেন এবং এরফলে মানুষের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সে-সব চাহিদা মেটানোর জন্যে সম্পদের অপ্রতুলতা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, দেশের বাজেট দেশের বার্ষিক আয় বা জিডিপির মাত্র ১৪% ভাগ যা নিতান্ত অল্প। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা অন্যসব ইমারজিং উন্নয়নশীল দেশে এর গড় পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ২০ থেকে ৩০% ভাগ। তবে সুখের কথা যে, ২০০৮-২০০৯ সালে আমাদের দেশে এর পরিমাণ ছিল ১২.৭% ভাগ এবং তা বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টার দলে ২০১৬-২০১৭ সালে বেড়ে গিয়ে দাড়ায় তা ১৭.৪% ভাগে এবং বর্তমান বাজেটে ১৮.৩% ভাগে উন্নীত করার প্রস্তাব করেছেন এবং এ কারনেই চার লক্ষ কোটি টাকার বাজেট গুনতে হচ্ছে। দেশের চাহিদা বিবেচনায় এবং বহুবিদ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে এ বাজেট ৭ লক্ষ হলেও আকাশ কুসুম কিছু নয়। দেশের জিডিপির যদি ৩০% বাজেট পাশ করা যেত তাহলে তা প্রায় ৬-৭ লক্ষে পৌঁছাত। আমরা যদি ৮-১০% বা ডাবল ডিজিট বার্ষিক জিডিপিরপ্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই তাহলে বাজেট আরও বাড়াতে হবে তার বিকল্প নাই। তাই বাজেটটি বাস্তবায়নযোগ্য, কাল্পনিক নয়। তবে তার জন্যে প্রশাসনিক দক্ষতা যেমন বাড়ানো দরকার সেই সাথে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও একান্ত প্রয়োজন।

বাজেটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে “স্বপ্ন পূরণের” রোডম্যাপ হিসেবে যে সমস্ত খাতে অধিকতর বিনিয়োগ দরকার সে সমস্ত খাতে যথার্থভাবেঅগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। যেমন, অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার বাবদ, জ্বালানি, রাস্তাঘাট, হাইওয়ে, ইত্যাদি বাবদ প্রায় ৪৮% ভাগ বর্ধিত করা হয়েছে। গেল অর্থ বছরে এ বাবদে বরাদ্দ ছিল ৪১,৮৭৪ কোটি টাকা যা বর্তমান বাজেটে বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬২,০১০ কোটি টাকা।  তবে সরকারকে এসব বাবদ বাজেট যাতে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় তার জন্যে কঠোর হতে হবে। নতুবা দুর্নীতির ও স্বজনপ্রীতির কারণে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ভেস্তে যাবে। দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ হচ্ছে এর জনগণ এবং নদী-নালা জলাশয়। বাজেটে মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্যে যেমন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য খাত ইত্যাদিতে বাজেটরাখা হয়েছে ৪৪,০২৯ কোটি টাকা বা ২৮.৭% ভাগ। যদি এই বরাদ্দ কৃত অর্থ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুণগত মান ও প্রশিক্ষণ না বাড়াতে পারে তাহলে এর প্রতিফলন উন্নয়নের মহাসড়কে বিড়ম্বনা নিয়ে আসতে পারে। উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সাইবার সিকিউরিটি দক্ষ জনবলের অভাব হেতু আমরা “বাংলাদেশ ব্যাঙ্কে” হোঁচট খেয়েছি।  উন্নত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জনবলের অভাব হেতু বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের চাকরি দিতে হচ্ছে এবং এরফলে প্রতিবছর প্রায় ৪/৫ বিলিয়ন ডলার বা ৪/৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। তবে একথাও তলিয়ে দেখতে হবে শিক্ষাক্ষেত্রে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে, প্রযুক্তিরক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত বাজেট যেন গুণগতমান ও উন্নত প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যবহৃত হয়, অপচয় না হয়।

মানব সম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষার সাথে বেকার সমস্যাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশে শিল্প কলকারখানা যদি আরও বাড়ে তাহলে বেকার যুবক যুবতীদের চাকরির সংস্থান হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, শুধুমাত্র সরকারের একা প্রচেষ্টায় অধিকতর চাকরির সংস্থান যেমন সম্ভব নয়, একিভাবে শিল্পায়ন ও টিকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও সম্ভব নয়। এজন্যে বেসরকারী বিনিয়োগকে আরও অধিকতর উৎসাহিত করতে হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে এটা সত্য যে, বাংলাদেশে যারা বিনিয়োগ ক্ষেত্রে নিয়োজিত আছেন তাদের অনেকের আচার আচারণ ও মন-মানসিকতা ব্যবসা বান্ধব নয় – তারা বিনিয়োগকারীদের হরহামেশা হয়রানি করতে ভালবাসেন। এসব ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে একথাও সত্য যে, যারা ব্যবসা করেন তাদের এক বিরাট অংশ নিজের টাকায় নয় বরং  সরকারের টাকায়ই ব্যবসা করতে অধিকতর আগ্রহী। তাদের ও মন মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।

বাজেটে ভালো মন্দ আছে, তবে ভালো দিকটাই অধিকতর। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এর বাস্তবায়ন এবং এটাকে বাস্তবায়ন করতে হলে সম্পদের জোগান দান। নতুন ভ্যাট বাদ পড়ায় কিংবা আবগারী শুল্ক বাদ দেয়ায় যে ১৫/২০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হবে তা কিভাবে পূরণ করা যায়। এ ঘাটতি পূরণ খুব কঠিন নয়। সরকার বাহাদুর সকল সরকারি কর্মচারীর বেতন প্রায় ১০০% বাড়িয়েছেন এবং এমতাবস্থায় আনুসাঙ্গিক সুবিধাসমূহ যেমন সরকারি গাড়ি বা জ্বালানি বাবদ অপব্যয় কমানো, স্বর্ণ বা গোল্ড আমদানি লিগেল করে তার উপর আমদানি শুল্ক ধার্যকরণ, বাড়িঘর, জমিজমা রিজিস্ট্রিকরণ বাবদ দেয় ফিস সোনালী ব্যাঙ্কের মনোপুলি ভেঙ্গে অন্যান্য সরকারি ব্যাঙ্কে জমা দেয়ার রীতি চালু করা, বিদেশে যারা স্বদেশের টাকা পাচার করে বাড়িঘরের মালিক হয়েছেন তাদের উপর করের বোঝা ও পেনাল্টি ধার্য করণ, ইত্যাদি প্রয়োজন বোধ করি। বিভিন্ন দেশে জাতীয় লটারি চালু আছে এবং এর মাধ্যমে সেই সমস্ত দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অগ্নি নির্বাপণ ও সামাজিক খাতে যথেষ্ট বাজেট দেয়া হয়।

বস্তুতঃ লটারি হচ্ছে এক ধরনের ঐছিক বা ভলোন্টারি ট্যাক্স প্রথা এবং অনেক অনেক মুসলিম প্রধান দেশে তা চালু আছে। মোটকথা সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অপচয় থেকে ১০/১৫ হাজার কোটি, স্বর্ণের উপর কর ধার্য করে ২/৩ শ কোটি টাকা,  রিজিস্ট্রিকরণ সহজকরন বাবদ ১০/১৫ হাজার কোটি, লটারি বাবদ ৫/৭ হাজার কোটি অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ সম্ভব। উল্লেখ্য যে, সম্পদ বা আয় আহরণের সুযোগ রয়েছে। তবে তা অর্জনের জন্যে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রয়োজন এবং যারা ব্যাঙ্ক লুঠ করে পাহাড়সম সম্পদের মালিক হয়েছেন তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা জনকল্যাণে নিয়োগ প্রয়োজন।

বাজেট আলোচনায় যারা অর্থমন্ত্রীকে হেয় করার জন্যে আদাজল খেয়ে ব্যক্তিভাবে আক্রমণ করেন তাদের জেনে রাখা ভালো যে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় সহযোগিতায় গত ৮ বছর ধরে প্রমান করেছেন যে, তাদের দিকনিদর্শন ও বাজেট সমূহ দেশের জন্য মঙ্গলকর এবং এর ফলে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের জন্য বিশ্ববাসি একে “উন্নয়নের রোল মডেল” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বাংলাদেশ বিস্ময়করভাবে মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল সমূহ অর্জন করেছে এবং বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, এমনকি দারিদ্রসীমা অর্ধেকের নীচে নামিয়ে এনেছে, মাথা পিছু আয় ২০০৬ সালে যা ৫৭০ মার্কিন ডলার ছিল বর্তমানে তা ১৬০২ ডলারে উন্নিত করেছে, বার্ষিক জিডিপির  প্রবৃদ্ধি ৭.২% অতিক্রম করেছে, সকল কর্মচারির বেতন ১০০% বৃদ্ধি করেও মুদ্রাস্ফিতি ওবেকারের সংখ্যা ৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে পেরেছে – এগুলো সত্যি অবাক হওয়ার। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, দুনিয়ায় যে সমস্ত দেশে প্রবৃদ্ধি ত্বড়িতগতিতে বাড়ে সে সমস্ত দেশে আয়ের বৈষম্য অত্যাধিক হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধিউত্তর উত্তর বাড়ার সাথেও আয় বৈষম্য ততদুর বাড়েনি। বাংলাদেশে আয় বৈষম্য প্রতিবেশি রাষ্ট্র সমুহ যেমন ভারত, নেপাল, ভূটান, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকেও অনেক কম এবং একই সাথে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতা অনেক অনেক বেড়েছে। এ সবগুলোই সম্ভব হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বর্তমান অর্থমন্ত্রী, ও সরকারের সুচিন্তিত ও বাস্তবভিত্তিক স্ট্রাটেজি ও বাজেটের রোড ম্যাপের কারনে। যেখানে বাংলাদেশকে “ওয়াল স্ট্রিট  জার্নালের” মত নামীদামী পত্রিকায় “Standard Bearer of the South” বা দক্ষিণ এশিয়ার আদর্শ আখ্যায়িত করে এবং সম্প্রিতিকালে যুক্তরাজ্যের নামীদামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, “প্রাইস ওয়াটার হাউস” এর মতে বিশ্বে মাত্র তিনটি অর্থনীতি খুব ভালো করছে এবং এদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম তা কি তারা ভুলে গেছেন যে মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে হলো ।

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী যে দেশেই সফরে যাচ্ছেন সেই সমস্ত দেশের রাষ্ট্রনায়করা প্রায়শই বাংলাদেশের এই অভাবনীয় সাফল্য কিভাবে সম্ভব হোল তা হরহামেশা জিজ্ঞেস করেন। তবে দুঃখের বিষয় যে, যারা অর্থমন্ত্রীর বার্ধক্য এবং প্রজ্ঞার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাদের কাছে প্রশ্ন তারা কি বাংলাদেশের অর্থনীতির সাফল্যকে সাফল্য মনে করেন না যার জন্যে তারা দাবি তুলেছেন “অর্থমন্ত্রী বিদায় হন, আপনার বাজেট আর দেখতে চাই না”

মোদ্দাকথা ২০১৭-২০১৮ সালের বাজেটটি স্বপ্ন পূরণের বাজেট। এর দিক নির্দেশনা বা রোড ম্যাপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ,২০৩০ সালের মধ্যে টিকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনএবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, সমৃদ্ধশালী, স্থিতিশালী, আত্মনির্ভর অর্থনীতি বিনির্মাণের বাজেট।

লেখক:
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাতি সংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: