Wednesday, 18 October, 2017 | ৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
কামরান এবং আরিফ দুই জন দুই দলে জনপ্রিয়  » «   মৌলভীবাজারে শোকের মাতম চলছে  » «   নগরবাসীকে সব ধরণের সেবা দিতে সিসিক অঙ্গীকারবদ্ধ: আরিফ  » «   জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সফলতা  » «   পরোয়ানা থাকলেই খালেদাকে গ্রেপ্তার করা হবে এটা ঠিক নয়: আইজিপি  » «   সিলেটে বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট  » «   মিয়াদ খুনের ঘটনায় সিলেটে ছাত্রলীগের চারদিনের কর্মসূচি  » «   মিয়াদের লাশ নিয়ে ছাত্রলীগের মিছিল, চৌহাট্টায় সড়ক অবরোধ  » «   ‘আমার মেয়ের মতো ইন্টারনেট আসক্ত যেন কেউ না হয়’  » «   সিলেটে ছাত্রলীগের গ্রুপিং: আর কত লাশ পড়বে?  » «   মুখে কৈ মাছ আটকে যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু  » «   কুয়েতে অগ্নিকাণ্ডে ৫ সিলেটির মৃত্যু  » «   মেয়রের নির্দেশে নামাজের সময় দোকানপাট বন্ধ  » «   ভূটানের রাষ্ট্রদূতের সাথে সিলেট চেম্বার নেতৃবৃন্দের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত  » «   টিলাগড়ে ছাত্রলীগকর্মী খুন  » «  
Advertisement
Advertisement

ত্রিদেশীয় স্বার্থেই রাখাইনে বর্বরতা

আরিফুজ্জামান মামুন:মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও মগদের বর্বর হামলা-নির্যাতনে দেশ ছাড়ছে রোহিঙ্গারা। ইতোমধ্যে সোয়া ৪ লাখ শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবিতে ২১৪টি গ্রাম সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বল জানিয়েছে হিউম্যানরাইটসওয়াচ। মিয়ানমারের এ বর্বরতাকে অনেকে জাতিগত নিধন, আবার কেউ কেউ গণহত্যা বলে উল্লেখ করছে। তবে একদল গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী বলছেন, এ বর্বরতার পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। তারা ভূরাজনীতি ও সম্পত্তি দখলের পরিকল্পনাকে দায়ী করছেন।

রোহিঙ্গা সংকট বর্তমান বিশে^র সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তা যেমন বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করেছে, বিশ^ব্যাপী তা আলোড়ন তুলেছে। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এ জাতিগত নিধনের নীলনকশার অনেকটাই ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। মিয়ানমার তার রোহিঙ্গা জনগণকে পুরোপুরি নির্মূল ও উচ্ছেদ করতে চাইছে। মাত্র দুসপ্তাহের মধ্যে প্রায় চার লাখ ছিন্নমূল মানুষের আগমন সে কথাই প্রমাণ করে, যা এক নজিরবিহীন ঘটনা।

রোহিঙ্গাদের জন্মভূমি হচ্ছে ইতিহাসের আরাকান, এখন যার নামকরণ করা হয়েছে রাখাইন প্রদেশ। রাখাইনের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ রোহিঙ্গা। সেখানে চলছে নিষ্ঠুর গণহত্যা। অ্যামনেস্টির জরুরি সহায়তাবিষয়ক পরিচালক তিরানা হাসান বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যা হচ্ছে তা ব্যাপক বিস্তৃত এক পদ্ধতিগত নিপীড়ন। তার মতে, মিয়ানমার তার রোহিঙ্গা জনগণকে পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনছে।

২৫ আগস্ট সর্বশেষ সহিংসতা শুরু হয়। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। রাখাইনে সহিংসতার জন্য অনেকে ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক পার্থক্যকে দায়ী করছেন। তবে রোহিঙ্গাদের ‘জাতিগত নিধনের’ পেছনে ভূরাজনীতি এবং সম্পত্তি দখলের রাজনীতিই মূলত দায়ী বল উল্লেখ করেছে জোসেপ ফোরিনো, টমাস জনসন ও জেসন ভন মেডিং নামে তিন গবেষক। সম্প্রতি তারা ‘দি অয়েল ইকোনমি অ্যান্ড ল্যান্ডগ্রেভ পলিটিকস বিহাইন্ড মিয়ানমারস রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্রাইসিস’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ কোয়ার্টজ সাময়িকীতে প্রকাশ করেন। জোসেপ ফোরিনো ও টমাস জনসন অস্ট্রেলিয়ার নিউ ক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণারত।

গবেষণায় তারা দেখিয়েছেন, মিয়ানমারের এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার জন্য দেশটির ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক পার্থক্যকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। এ প্রচার ব্যাপক মাত্রায় হচ্ছে। ফলে এখন এটা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ছে, এ ‘খেলার’ পেছনে আরও অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, মিয়ানমারে ১৩৫টি বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর জাতিসত্তার বসবাস রয়েছে।

ভূমিদস্যুতা এবং ভূমি অধিগ্রহণ মিয়ানমারে ব্যাপকভাবেই আছে। এটা নতুন ঘটনা নয়। বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে সামরিক জান্তা কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সারা দেশ থেকে ধর্মীয় ও নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে ছোট ছোট ভূমিমালিকদের জমি অধিগ্রহণ করে। ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প, সেনানিবাস সম্প্রসারণ, প্রাকৃতিক সম্পদ উন্মুক্তকরণ, বৃহৎ কৃষি খামার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যটনের নামে এসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, সামরিক জান্তা তখন কাচিন রাজ্যে সোনার খনি খননের জন্য গ্রামবাসীর কাছ থেকে ৫০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করে নেয়। এসব ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের কারণে তখন হাজার হাজার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়। অনেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশ, ভারত ও থাইল্যান্ডে চলে যায়। আবার কেউ কেউ সমুদ্রপথে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার পথে পাড়ি দেয়।

রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনের পাশাপাশি দেশটির সরকার এখন সেখানকার মংগদু শহরে স্পেশাল ইকোনমিক জোন গড়তে যাচ্ছে। এ নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর। ইকোনমিক জোন গড়তে ইতোমধ্যে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নাফ রিভার গ্যালাক্সি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলভমেন্ট গ্রুপ’। দেশটির মিডিয়া ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমার এ খবর দিয়ে বলছে, এ ধরনের উদ্যোগকে ‘রহস্যজনক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। রাখাইন অঞ্চলের ফিন্যান্স অ্যান্ড প্ল্যানিং প্রতিমন্ত্রী উ খেওয়া আই থেইন ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমারকে বলেন, মিয়ানমার সরকার এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে কিয়াপফুর অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করছে চীন। যেখানে ৪ হাজার একর জমির ওপর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে চায় দেশটি। সেখানকার তেল ও গ্যাস টার্মিনালেও অর্থায়ন করেছে চীনের পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। জমি অধিগ্রহণকালে মূল্য পরিশোধ না করারও অভিযোগ রয়েছে।

মিয়ানমারের পত্রিকা ফ্রন্টিয়ার বলছে, ৫ সেপ্টেম্বর দেশটির বিনিয়োগ এবং কোম্পানি পরিচালকের দপ্তরে নিবন্ধন করেছে গ্যালাক্সি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ। বলা হচ্ছে, এ গ্রুপ মংডু ও ইয়াঙ্গুনের মোট ৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত গ্রুপ।

জোসেপ ফোরিনো, টমাস জনসন ও জেসন ভন মেডিং তাদের গবেষণা নিবন্ধে বলেন, ২০১১ সালে মিয়ানমারের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সংস্কার আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তখন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ‘এশিয়া ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’ বা ‘এশিয়ার চূড়ান্ত গন্তব্য’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর কিছুদিন পরেই ২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা চালানো হয়। কিছুটা কম হলেও কারেন সম্প্রদায়ের লোকজনও এই হামলার শিকার হয়। উপরন্তু এই সময়ে মিয়ানমার সরকার কৃষি খামারের জমি বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কতকগুলো আইনও তৈরি করে।

গবেষণায় বলা হয়, ভৌগোলিক দিক থেকে মিয়ানমারের অবস্থান এমন একটি জায়গায়, যার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রতিবেশী চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর দীর্ঘদিন ধরেই লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে। বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে চীনা কোম্পানি দেশটির উত্তরের শান রাজ্যে কাঠশিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদ ও নৌপরিবহন খাতে বিনিয়োগ করে। এ নিয়ে তখন সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। কারেন ও শান রাজ্যে এই সংঘর্ষে কাচিন ইনডিপেনডেন্ট অরগানাইজেশন (কেআইও) এবং তাদের অন্য সহযোগীরাও অংশ নেয়। রাখাইন রাজ্যে চীন ও ভারতের স্বার্থ মূলত দেশ দুটির সীমান্ত সম্পর্কেরই একটা অংশ। এসব স্বার্থ মূলত এই অঞ্চলের অবকাঠামো খাতের বিনিয়োগ ও গ্যাসের পাইপলাইন নির্মাণকে কেন্দ্র করে। এই প্রকল্পগুলোর মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান, ট্রানজিট ফির নিশ্চয়তার দাবি করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যের তেল ও গ্যাস খাত থেকে যে রাজস্ব আয় আসবে, তা গোটা মিয়ানমারের অর্থনীতিকে চাঙা করবে। অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্পের একটি হচ্ছে চীনের রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস উত্তোলন ও বিতরণ প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কোম্পানির বহুজাতিক পাইপলাইন নির্মাণ। এটি রাখাইনে রাজধানী সিতুর সঙ্গে চীনের কুনমিংকে সংযুক্ত করবে। এর কাজ শুরু হয়েছে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে। মিয়ানমারের সিয় গ্যাসফিল্ড থেকে তেল ও গ্যাস গানজুয়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য চীন ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সমান্তরাল আরেকটি পাইপলাইন স্থাপনের কথা ভাবা হচ্ছে, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেল মিয়ানমারের কিওফিও বন্দর থেকে চীন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে।

ভারত এরই মধ্যে কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় সিতুতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এর মাধ্যমে উত্তর-পূর্বের মিজোরাম রাজ্যকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা। রাখাইন রাজ্যের উপকূলীয় এলাকা স্পষ্টই ভারত ও চীনের কাছে কৌশলগত কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বভাবতই মিয়ানমারের স্বার্থ হচ্ছে জায়গাটি খালি করে পরবর্তী উন্নয়নকাজের জন্য উপযুক্ত করে তৈরি করা এবং এরই মধ্যে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তা অব্যাহত রাখা। অন্যদিকে মিয়ানমারের কাছে সব থেকে বেশি অস্ত্র বিক্রি করে রাশিয়া। অস্ত্রের অন্যতম বাজার হিসেবে মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করছে রাশিয়া তাদের স্বার্থে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএম আকাশ এক সেমিনারে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূলে রয়েছে ভূরাজনীতি। এই ভূরাজনীতি রোহিঙ্গা সংকটকে গভীর করে তুলবে। বিশ্বব্যাপী বৃহৎ শক্তিগুলো পরস্পর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত। তারা এ ঘটনাকে ব্যবহার করে অস্ত্র বিক্রি ও বার্মার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় সম্পদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তখন রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী শান্তিপূর্ণ সমাধানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সমস্যার উদ্ভব হতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, এটা ঠিক মিয়ানমারের সঙ্গে বৃহৎ দেশগুলোর কিছু স্বার্থ রয়েছে। ভৌগোলিকভাবে মিয়ানমারের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। চীন, রাশিয়া, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের পক্ষে আনতে হবে। কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে।-আমাদেরসময়

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

উপদেষ্টা: ড.এ কে আব্দুল মোমেন
সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: