Wednesday, 22 November, 2017 | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
জগন্নাথপুরে গুলি, কার্তুজসহ ২ অস্ত্র ব্যবসায়ী গ্রেফতার  » «   ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ সফলের লক্ষে জেলা প্রশাসনের মতবিনিময় সভা  » «   নবীগঞ্জে ৩ সন্তানের জননীকে পিটিয়ে হত্যা ॥ আহত ২  » «   আ’লীগ নেতা বিজিত চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা  » «   ‘তারেক রহমানের নাম’ আবারো ভুল করলেন মেয়র আরিফ!  » «   সুরমা নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনায় সিসিকের উচ্ছেদ অভিযান  » «   ‘স্প্রে পার্টি’ এখন সিলেটে, সাবধান…  » «   আজ জকিগঞ্জ শত্রু মুক্ত দিবস: রাষ্টীয় স্বীকৃতির দাবী  » «   ‘একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে’  » «   প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় শায়েস্তাগঞ্জে উৎসবের আমেজ  » «   এমপি সেলিম উদ্দিনের রোষানলে ট্রাফিক পুলিশ!(ভিডিও সহ)  » «   সিসিকের গাড়ি কেলেংকারী : আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন  » «   মৌলভীবাজারের ৫ আসামির রায় যেকোনো দিন  » «   নেতাকর্মীর ‘কদর’ বাড়ছে মেয়র পদপ্রার্থীর কাছে  » «   খাজাঞ্চিবাড়ি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষিকা শম্পা চক্রবর্তীর জাল সনদ: তোলপাড়  » «  

 

Advertisement
Advertisement

ট্রাম্পের ‘পরমাণু চুক্তি’ থেকে সরে আসা

মো: বজলুর রশীদ:এক দশকেরও বেশি সময় ধরে খুঁটিনাটি থেকে ইরানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিবেচনা করে ইরানের সাথে বৃহৎ ছয় জাতিগোষ্ঠী- আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও জার্মানির সাথে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে, পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিকে ‘এই দশকের সেরা বহু জাতিক চুক্তি’ও বলা হয়। চুক্তির সিদ্ধান্তে আসতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ, আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এবং ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মোঘেরিনি প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন।

ঐতিহাসিক এই চুক্তির মূল শর্ত হলো ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত রাখতে হবে, বিনিময়ে তেহরানের ওপর পাশ্চাত্যে আরোপিত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার জন্য এবং ইরান যাতে একক শক্তিধর দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সে উদ্দেশ্যে এক দশক ধরে দেশটির ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব। এতে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। দেশটির বিগত প্রেসিডেন্ট আহমদিনেজাদ প্রকাশ্যেই বলতেন, ‘এভাবে ইরান হয়তো পাঁচ বছর টিকবে।’ চুক্তির আওতায় ইরানের সবক’টি স্থাপনায় জাতিসঙ্ঘ পরিদর্শকদের পর্যবেক্ষণের অধিকার এবং জাতিসঙ্ঘের আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। চুক্তিতে ইরানের ওপর আরোপিত নিরাপত্তা পরিষদের সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া, ইরানের সব পরমাণু গবেষণা অব্যাহত রাখা, অত্যাধুনিক আইআর-৬ এবং আইআর-৮সহ সব ধরনের সেন্ট্রিফিউজের উন্নয়ন তৎপরতা অব্যাহত রাখা, বিদেশী ব্যাংকগুলোতে জব্দ থাকা ১০ হাজার কোটি ডলার অবমুক্ত করা, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, শিপিং লাইন্স, জাতীয় তেল সংস্থাসহ ৮০০ সংস্থা এবং ব্যক্তির ওপর থেকেও সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কথা উল্লেখ আছে। ফলে চুক্তিটি উভয়পক্ষের জন্য ‘উইন উইন’ অবস্থানে আসে। আমেরিকার কৌশলগত অবস্থান অনেকটা এরূপ, চুক্তির ফলে ইরান ‘গণবিধ্বংসী’ অস্ত্র উৎপাদনের দিকে যেতে পারবে না এবং এই সময়ে ইসরাইলকে অস্ত্রসহ যথাসাধ্য সহায়তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য একটি সর্বাধুনিক অস্ত্রের ডিপো বা শক্তিশালী দুর্গ তৈরি করে প্রয়োজনে আরব-মুসলমানদের বিরুদ্ধে নামানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তির বিরুদ্ধে ইসরাইল ক্ষোভ প্রকাশ করে ইসরাইল বলেছে, এটি ‘একটি বাজে চুক্তি’। এতে মূলত ইরানের কোনো পরমাণু চুল্লি কিংবা একটিও সেন্ট্রিফিউজ বন্ধ হচ্ছে না। ইসরাইলের যুদ্ধমন্ত্রী মোশে ইয়ালুন বলেছিলেন, ‘তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে তেল আবিবের নিজেরই ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নিতে হবে।’ ইসরাইল এই চুক্তির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে দায়ী করে। ইসরাইলি এক সমালোচক লিখেছেন, ‘চুক্তিটি এ বছরের হাগানা উৎসবে ইসরাইলিদের জন্য ওবামার উপহার।’ অপর দিকে চুক্তির পর সৌদি আরব, মিসর, তুরস্ক ও জর্ডান ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে।
২০০৫ সালে ইরান আক্রমণ করতে ব্যর্থ হয়ে ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধেঅনৈতিক যুদ্ধ শুরু করে। যেমন, ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে ইন্টারনেট ভাইরাস হামলা। এটি নভেম্বর ২০১০ সালের ঘটনা। স্ট্রাক্সনেট ভাইরাস টার্গেটের দিকে লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে পারে, এমনকি যদি ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করেও দেয়া হয় তারপরও এগুলো টার্গেটে হামলা চালাতে সক্ষম এবং পরমাণু কন্ট্রোল টাওয়ার শনাক্ত করে তা ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ভাইরাসকে অনেকে ‘সফটওয়ার বোমা’ও বলে থাকেন। এভাবে হামলা চালানোর পর কয়েক মাস ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখে। এই আঘাতের ফলে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে তিন মাস কোনো কাজ হয়নি। ইরানকে এই অবস্থা থেকে উঠে আসতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। ইরানি বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, তারাও এই সফটওয়ার বোমা ব্যবহার করতে সক্ষম।

দীর্ঘ দিন ইরানকে বিভিন্ন প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে। চোরাগোপ্তা ও বোমা হামলায় দেশটির শীর্ষ স্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হয়েছে। ইরান বিশ্বাস করে, এসব হত্যাকাণ্ড মোসাদ ঘটিয়েছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার প্রকৌশলী বেহেশতিকে। অপর আক্রমণে ড. ফরিদুন আব্বাসি ও তার স্ত্রী মারাত্মকভাবে আহত হন। আব্বাসি নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন এবং আইসোটোপ পৃথকীকরণে দক্ষ এক বিজ্ঞানী। মাসুদ আলী মোহাম্মদীকেও একই কায়দায় আঘাত করা হয়। তিনি কোয়ান্টাম ফিজিক্সের এক্সপার্ট। এসব ঘটনার আগে আমেরিকা ঘোষণা দিয়েছিল ইরানের পরমাণু কার্যক্রম থাকায় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়া যায় কিনা তা ওয়াশিংটন বিবেচনা করছে। এডমিরাল মাইক মুলেন, ইউএস জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ, বলতেন, ‘বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য ইরানের পরমাণু কর্র্মসূচি নিবেদিত এই কথাটি এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করি না।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিপ্লবী গার্ড রেজিমেন্টকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যায়িত। তবে সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন বলেছেন, ‘একটি দেশের পুরো সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করা অনেক রিস্ক ও জটিল।’ ট্রাম্প মনে করেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহকে সহায়তা, ইয়েমেনে হুতিদের এবং ইরাক ও সিরিয়ায় শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তা সবই আমেরিকার স্বার্থের বিরোধী। ইরান রাশিয়ার সাথে মিলে এসব কাজ করছে এবং এতে ইসরাইল-আমেরিকার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সমালোচকেরা বলছেন, মোড়ল যে সব খেলা খেলে ইরানও সেই খেলা খেলছে বিধায় আমেরিকার মন খুবই খারাপ। তাই ইরানকে ‘শিক্ষা’ দিতে দেরি করা উচিত নয় মনে করা হচ্ছে। এই কাজটা অচিরেই শুরুর জন্য ইসরাইল ১২ বছর ধরে চেষ্টা তদবির করে আসছে।

ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বড় অভিযোগ হলো, ইরান খুরমশাহরে মিসাইল পরীক্ষা করেছে। ২০০০ কি.মি. মধ্যম পাল্লার এই মিসাইল কয়েকটি ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এর আগেও ইরান কয়েকটি মিসাইল পরীক্ষা করেছে। তখন আমেরিকা বলেছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ পরমাণু চুক্তির মেজাজের বিপরীত। ইরান বলেছে, ‘প্রতিরক্ষার জন্য ইরান পরমাণু অস্ত্রবিহীন অন্যান্য অস্ত্র উৎপাদন করার অধিকার রাখে।’ ‘এজন্য কারো অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন নেই।’ তখন আমেরিকা একতরফা ‘অবরোধ’ আরোপ করে। এই পদক্ষেপও পরমাণু চুক্তির মেজাজের খেলাফ।
ট্রাম্প ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তির ঘোর বিরোধী। তিনি বলেছেন, ‘সবচেয়ে বাজে চুক্তি। এটা বোঝা যায় কথাটা ইসরাইল থেকে ধার করা। ট্রাম্প মনে করেন, চুক্তিতে এককভাবে ইরানের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। তিনি ক্ষমতায় গেলে এই চুক্তি বাতিল করবেন বলে আগেই জানিয়েছিলেন। তবে এ পর্যন্ত দু’বার চুক্তি বাতিলের পরিবর্তে মেয়াদ বাড়িয়ে নবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন নিয়মে কংগ্রেসকে প্রতি তিন মাস অন্তর ইরানের পরমাণু বিষয় জানাতে হয়। নবায়নের কারণ হিসেবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলেছিল, ‘ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের যে চুক্তি হয়েছিল, মার্কিন প্রশাসন তা মেনে চলছে। এর আওতায় চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে।’ ট্রাম্প এই চুক্তি বাতিল করতে চান। ১৩ অক্টোবর তবুও ভাষণে তিনি বলেছেন, we will not continue down a path whose inevitable result is more violence, more chaos, and Iran’s nuclear breakout. তিনি কংগ্রেসকে চুক্তিটি পুনঃবিবেচনা করতে বলেছেন। এ কাজের জন্য কংগ্রেস ৬০ দিন সময় পাবে। এ দিকে কংগ্রেসে এখন রিপাবলিকানদের রমরমা অবস্থা। ট্রাম্প কেন এমন করলেন তা রাজনৈতিক ব্যাপার। এর সূতিকাগার হলো ইসরাইল। নির্বাচনের শুরু থেকেই তিনি এসব বিষয়ে মতপ্রকাশ করে আসছিলেন। এসব পদক্ষেপ তাকে একজন ‘চরম মুসলিমবিদ্বেষী’ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত করে তুলেছে।

আমেরিকার প্রথম কাতারের লোকজন, এমনকি জিম ম্যাটিস, সেক্রেটারি অব ডিফেন্স, টিলারসন, সেক্রেটারি অব স্টেট, জেনারেল জোসেফ ডুনফোর্ড প্রমুখ বলেছেন, এই পরমাণু চুক্তির সাথে থাকা আমেরিকার জাতীয় স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা ও ইইউর বেশির ভাগ চিন্তাশীল ব্যক্তি মনে করেন যে, ইরান পরমাণু চুক্তির শর্ত মেনে চলছে। ট্রাম্পের ভাষণের একদিন আগে অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাজেমির ডিজি ইউকিয়া আমানো বলেন, ইরান চুক্তি অনুসরণ করে চলছে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সভায় টিলারসন ইরানি ডেলিগেটকে বলেন, ইরান চুক্তির শর্ত মানছে না- এমন কোনো বিষয়ই নেই। ট্রাম্পও চুক্তি খেলাফের উদাহরণ দিতে পারবেন না। ট্রাম্প বলটি কংগ্রেসের দিকে গড়িয়ে দিয়েছেন এবং বলেছেন, এখানে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা হয়নি। কংগ্রেস ইরানের ওপর আরো অবরোধ আরোপের বিরোধী। কিছু রিপাবলিকানও মনে করেন, এই চুক্তি থেকে সরে আসা উচিত নয়।

ইরান এর আগে আমেরিকাকে সাবধান করে বলেছিল, ‘যদি ওয়াশিংটন সমঝোতা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ইরানের নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়া অন্যান্য সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ রয়েছে।’ ট্রাম্পের ভাষণের পর দিন ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানি জবাবে বলেন, ‘ট্রাম্পের কথা পুরনো কাসুন্দি। বছরের পর বছর এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তাই ওয়াশিংটন বলে আসছে।’ ‘ইরানি জনগণ ট্রাম্পের কাছ থেকে কিছুই আশা করে না।’ ‘ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে তিনি নিজের দেশকে বিশ্ববাসী থেকে পৃথক করে ফেলেছেন।’ ‘তিনি ঘোরের মধ্যে আছেন; তাই বুঝতে পারছেন না এই চুক্তি আমেরিকার সাথে কোনো চুক্তি নয়।’ তিনি ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছেন, ইরানের জনগণ কি অবাধ নির্বাচনে অংশ নেয়নি? ইরান কি আমেরিকার কোনো সেনাশাসিত দেশ না রাজার রাজ্য? তিনি আরো বলেন, ইরান আপ্রাণ চেষ্টা করবে চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে। ইরান কোনো টেকনিক্যাল পয়েন্ট ভাঙবে না। ট্রাম্পের হুমকির পরে কুদস ফোর্সের ডেপুটি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসমাইল ঘানি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধবাজ দেশ নই। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিলে ওয়াশিংটনকে আফসোস করতে হবে। ইরানকে ট্রাম্পের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি করবে। আমরা এমন অনেক ট্রাম্পকে মাটিতে পুঁতেছি। আর এটাও জানি, কিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাঠে নামতে হয়।’
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা’র জন্য এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি ট্রাম্পকে ফোন করে ব্রিটেনের অবস্থান জানিয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাকরন এই কাজ ‘চরম ভুল’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা কিভাবে ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে এই চুক্তি ধরে রাখা যায় তা নিয়ে চিন্তা করছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেছেন, আমাদের সবাইকে এ চুক্তি নিয়েইতো বাঁচতে হবে।’ ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক মিনিট পরেই ইউরোপীয় নেতা মোসেরিনি সাংবাদিকদের তিনি জানান, ‘এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি নয়। আন্তর্জাতিকও নয়। কোনো প্রেসিডেন্টের ইচ্ছার ওপরও নির্ভরশীল নয়। কেউ চাইলেই এটা ছুড়ে ফেলে দিতে পারে না।’ ‘চলমান চুক্তিকে আমরা নস্যাৎ হতে দিতে পারি না।’ জন কেরি, আমেরিকার সাবেক সেক্রেটারি অব স্টেট বলেছেন, ‘ট্রাম্প আরেকটি আন্তর্জাতিক সমস্যার সৃষ্টি করলেন। আমেরিকার ও মিত্রদের নিরাপত্তার জন্য এই পদক্ষেপ ক্ষতিকর।’

যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে পরমাণু চুক্তি কতটুকু প্রাণ পাবে তা হিসাবের বিষয়। অবরোধের ফলে ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে; তা ইরান পুষিয়ে নেয়ার জন্য কতদিন অপেক্ষা করতে পারবে তাও হিসাবে আনার বিষয়। কংগ্রেস চুক্তি বাতিল না করে যদি আরো অবরোধ দেয়, তখন ইরান কিভাবে তা বহন করবে? অপর দিকে ইসরাইলকে ফি বছর কোটি ডলারের ঋণ ও অস্ত্র দিয়ে সেখানে অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি করা হচ্ছে আর ইরানকে অবরোধে ফেলে কিছুই করতে না দিয়ে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের নীলনকশা প্রণয়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র, তা সহজেই বোঝা যায়। ইরানেরও ধৈর্য ধরার সীমা রয়েছে। ট্রাম্প সেটা বুঝতে চাইছেন না বলে মনে হয়।

ইরান চুক্তির পর আরাকে অবস্থিত হেভি ওয়াটার রিঅ্যাকটর থেকে এর মূল জিনিস খুলে নেয়া হয়েছিল। ওয়েপন গ্রেড ইউরেনিয়াম তৈরি এবং চুক্তির পূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে ইরানের অনেক সময়ের প্রয়োজন। ইরান বলেছে, চুক্তি বাতিল হলে এসব কাজে ইরান এক মুহূর্তও দেরি করবে না। ট্রাম্পের হইচইয়ের পর ইরান বুদ্ধিমত্তার সাথে বলেছে তারা পরমাণু চুক্তির শর্ত মেনে চলবে, যদি শুধু ইউরোপীয়রা সাথে থাকে। ২০১২ সালে ইরান ইইউর সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার জন্য অগ্রসর হয়। রাশিয়া ও চীনের সাথে তাদের রয়েছে সংযোগ। ইরানের এই বিচক্ষণতায় আমেরিকা ও ইইউর বিরোধের একটি অধ্যায় ফ্রন্টলাইনে চলে এলো। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানকে আরো অবরোধ দিয়ে, চাপ সৃষ্টি করে একঘরে করে রাখা। কিন্তু ইরান বারবারই আমেরিকা-ইহুদির চক্র ভেঙে বের হয়ে যায়।

ইরানের কিছু কাজ আমেরিকার প্রতি চ্যালেঞ্জ। যেমন- আফগানিস্তান ইরাক ও সিরিয়া এবং ইয়ামেনের রাজনৈতিক ও সামরিক মঞ্চে আমেরিকা যা করতে চায়, ইরানের জন্য তা করতে পারছে না। ইরান এখন এমন এক স্থানে অবস্থান করছে যে, তার বিরুদ্ধে যেকোনো ঘটনা বড় সমস্যার জন্ম দেবে। ইইউ ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সাথে আমেরিকার ‘আস্থার অভাবের জন্ম হতে পারে। আমেরিকার সাথে কোনো কাজ করতে তারা এখন দু’বার চিন্তা করবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরমাণু সমঝোতা বজায় রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান আলী আকবর সালেহি বলেছেন, আমেরিকা পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন করলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা এক লাখ এসডব্লিউইউতে উন্নীত করা হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা আগের চেয়ে ৯১ হাজার এসডব্লিউইউ বাড়বে। এটা হলো, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় একেকটি সেন্ট্রিফিউজের সক্ষমতা। সালেহি বলেন, দেশটি কী চাচ্ছে তা তাদের নিজেদেরও জানা নেই।

ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেছেন, ট্রাম্প পরমাণু চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত দিয়ে বিশ্বের জনগণের বিরোধিতা করছেন। কোন দেশে আইনবিহীন সরকার চলছে, কোন দেশ জনগণ ও বিশ্ববাসীর মতের ওপর শ্রদ্ধা রাখে এবং কারা ধ্বংস ও অরাজকতা চায়, তা এখন পরিষ্কার । ইরানের সাথে সব সমস্যা এক চুক্তি দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। সব কিছু গুলিয়ে ফেললে ঝুঁকি বাড়বে। পরমাণু চুক্তির উদ্দেশ্য এই নয় যে, এর মাধ্যমে লেবানন ও হিজবুল্লাহ সমস্যার সমাধান হবে। ইরানের সাথে এখন পর্যন্ত কোনো কিছুতে না পেরে ট্রাম্প ক্ষেপে গেছেন বলে সাধারণ ইরানিদের ধারণা। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরানি জনগণকে আরো ঐক্যবদ্ধ করেছে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: