Friday, 19 January, 2018 | ৬ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

Advertisement

হায় ফর্সা ত্বক

মাহবুবা জান্নাত: আমার ত্বক ফর্সাই। কিন্তু নিজেকে আমি কখনোই খুব সুন্দরী মনে করিনি। আসলে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে মানবিক গুণ অর্জন ও সেই সাথে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন নিয়েই ছিল আমার মাথাব্যথা। ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছি। সংসারের বড় মেয়ে হ্ওয়ায় সৌন্দর্যচিন্তার চেয়ে সংসার বাঁচানোটাই তখন মুখ্য ছিল।

আমার ছোট ভাই বোনের ত্মক কালো। কিন্তু বাবা মাক কখনও গায়ের রঙ নিয়ে কথা বলতে শুনিনি। তাদের আচরণেও কখনো মনে হয়নি এ বিষয়ে তাদের চিন্তা রয়েছে বা ছেলেমেয়েদের মধ্যে বৈষম্য করার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু তারপরও ছোট বোনটিকে দেখেছি আড়াই তিন বছর বয়স হতে না হতেই বড় বোনের ত্বকের রঙের প্রতি মোহ, বড় বোনের লোশন মেখে ফর্সা হওয়ার চেষ্টা। শিশুর এই হীনমন্যতা দূর করতে বলেছি, ‘তোমাকে তো দেখতে আমার চেয়ে বেশি ভালো লাগে। আমার তো তোমার গায়ের রঙই বেশি পছন্দ।’

কিন্তু না, একটা মানুষের মনের ভেতর কোথায়, কখন আর কীভাবে যে রঙ নিয়ে হীনমন্যতা বোধের জন্ম হয়, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। হতে পারে এটি স্কুল কলেজে বান্ধবীদের দেখে, টেলিভিশনের নাটক আর বিজ্ঞাপনগুলো থেকে কিংবা আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীর কোন কথা বা আচরণে। তবে আজকে আমি কারণ বিশেèষণে যাব না। আজকে যাব ফলাফলের দিকে।

টিভি নাটক বা সিনেমায় অনেক দেখেছি ত্বকের রঙ কালো বলে স্বামী, শ্বশুর বাড়ির লোকের কাছে নিন্দা মন্দ শুনতে হচ্ছে মেয়েদের। উচ্চ পদে কর্মরত থাকা কোন মেয়েকেও বিয়ের বাজারে লোকরা রীতিমত মুখের ওপর ‘কালো’ শুনিয়ে চলে যেতেও দ্বিধাবোধ করে না।

আর এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু ঐ মেয়েটি হচ্ছে না। বরং যে পরিবার গুণের কদর না করে কেবল রঙের কদর করে পাত্রী পছন্দ করে, ঐ ফর্সা গুণহীন মেয়েটির সৌন্দর্য তাদের খুব বেশিদিন প্রীত রাখতে পারে না। সহসাই ওই সংসারে শুরু হয় অশান্তি আর ঝগড়াঝাটি।

যাই হোক, এ সত্য খুব কম পরিবারই বিশ্বাস করবে এখনও। তাই এখন বিশ^বিদ্যালয়পড়ূয়া মেয়েদের বেশিরভাগই পড়াশোনা, সংস্কৃতি চর্চা বা খেলাধুলা করে নিজের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের চেয়ে বেশি সময় দেয় পার্লারে নিজেদের সৌন্দর্য্য বিকাশে। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার কাছে কি নির্লজ্জভাবে বলী হয়ে যাওয়া!

এমনকি একজন বেশ ভালো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক সাংবাদিক আপার ফেসবুক স্ট্যাটাসে একদিন দেখলাম, ‘নতুন হেয়ার স্টাইল। মন খারাপ লাগলেই আমি পার্লারে যাই। নিজেকে নতুন করে সাজাই।’ নিজেকে নতুন করে সাজানোতে অবশ্যই দোষের কিছু নেই। কিন্তু খুব গুণের বিষয়ও তো নয় এটা, তাই না?

আমার স্বভাব খারাপ। হাজারো লাইক দেখে কমেন্ট দেখে একটা কমেন্ট দিয়েই দিলাম। ‘তার মানে, আপনার বেশি বেশি মন খারাপ হলে তো পার্লারের বেশি বেশি লাভ।’

কী ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে, কী ধরণের প্রশিক্ষণ এই পার্লার কর্মীদের কিছুই জানি না আমরা। তবু হুমড়ি খেয়ে পড়ছি পাড়ার অলিতে গলিতে গজিয়ে ওঠা এইসব পার্লারে। এসব রাসায়নিকের নিয়মিত প্রয়োগ দীর্ঘমেয়াদে ত্বকে কী ধরণের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে ভাবারও প্রয়োজন মনে করছি না।

ফিরে আসি আবারো কালো ত্বকের কথায়। কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে থাকতে দেখেছি, অনেক বড় আপু, যাদের ত্বক একটু কালো, একটা ভারতীয় ক্রিম ব্যবহার করছে। আর আশ্চর্যজনকভাবে এক সপ্তাহের মাথায় তাদের মুখ দেখে বোঝার উপায় থাকেনি যে সে কালো। বলা বাহুল্য, হোস্টেলে ক্রিমটির জনপ্রিয়তা পেতে খুব একটা সময় লাগল না। কিন্তু দুঃখজনক হলো, কয়েক বছর পরে ঐ আপুদের মুখের ত্বকের কী অবস্থা হয়েছে, তা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু আমি তাদের বলতাম, যে ক্রিমটি এত তাড়াতাড়ি ত্বককে পাল্টে দিচ্ছে, তা অবশ্যই ক্ষতিকর। হোক তা ভারতীয় বা আমেরিকান। সেখানে থাকা রাসায়নিকের কারণে পরে স্কিন ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু স্কিন ক্যান্সার প্রতিরোধের চেয়ে অন্যের মুখে ‘সুন্দর’ শব্দটি শোনা আর বিয়ের বাজারে দাম বাড়ানোতেই তাদের মনোযোগ ছিল বেশি।

তো একই কান্ড করলো আমার সেই ছোট বোনটিও। যার কথা শুরুতেই বলেছি। আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, যেই মাকে আমি ভেবেছি যে কখনো বৈষম্য করেনি বা রঙ নিয়ে বোনটিকে খোঁটা দেয়নি, সেই মা অবাক করলেন আমাকে। বোনের বিয়ে ঠিক হ্ওয়ার পর মায়ের মন্তব্য ‘ভাগ্যিস তুই ক্রিম মেখে রঙটা ফর্সা করলি, নাহলে তো তোর বিয়ে হতো না।’

এত কিছু লিখছি এজন্য যে, এই জাতির মনের খুব খুব গভীরে আসলে ফর্সা ত্বক নিয়ে অবসেশন বাসা বেঁধে আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রকট। কোন কোন সময় তা অনুপস্থিত ভেবে ভুল করি আমরা। তো যেই জাতি বাহ্যিক সৌন্দর্য বলতে কেবল রঙ বোঝে, সে নান্দনিকতা, অপরের সৌন্দর্য্য, উদারতা, পরোপকারিতা বুঝতে আরো ৫০ বছর সময় নেবে বৈকি। তাছাড়া গনমাধ্যম আর কসমেটিক্স ইন্ডাস্ট্রিগুলোতো এগুলোকে উস্কে দিতে কাজ করছেই।

কিন্তু আমার বড় ভয় হয় যে, এই বাহ্যিক সৌন্দর্য্য তথা রঙ, পোশাক, চুলের ছাঁট আর চুল রঙিন করতে আমরা মেয়েরা যে সময় নষ্ট করছি, সেই সময়ে কি নিজের দক্ষতা বাড়ানোর কোন প্রশিক্ষণ নেওয়া যায় না? দুটো ভালো গল্পের বই পড়ে নিজের মননশীলতা, চিন্তা ও কল্পনার জগৎটাকে একটু বড় করা যায় না?

লেখক: সাংবাদিক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: