Friday, 21 September, 2018 | ৬ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
Advertisement

উম্মাহর মূল সঙ্কট

আবদুল হামিদ আহমদ আবু সুলাইমান: মুসলিম জাতির মূল্যবোধ, রীতিনীতি এবং এর মানবীয় ও বৈষয়িক সম্পদ সম্পর্কে ধারণা থাকা সত্তে¡ও যদি উম্মাহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না রাখেন, তাহলে তার পে উম্মাহর বর্তমান সাংস্কৃতিক অধোগতি, রাজনৈতিক বিচ্যুতি এবং উম্মাহর মানবিক দুর্ভোগ ও দুর্দশা সম্পর্কে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা কঠিন হবে। আর এটিই হলো উম্মাহর মূল সঙ্কট। এটি অবশ্যম্ভাবী, এ ধরনের পশ্চাৎপদ এবং দিকনির্দেশনাহীন অবস্থা মুসলিম উম্মাহর চেতনার জগতে প্রধান বিষয় হিসেবে গণ্য ছিল, যা মুসলিম উম্মাহর অগ্রবর্তী ও চিন্তাশীল মনীষীরা বরাবর চর্চা করে এসেছেন। সুতরাং এটিই স্বাভাবিক, উম্মাহকেই পরিবর্তন, সংস্কার ও পুনর্জাগরণ সম্ভব করতে হবে।
উম্মাহর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতে হলে এবং সীমাবদ্ধতাগুলো সফলতার সাথে দূর করার জন্য যে সব শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন হবে, আমাদের সে সব মূল কারণ অবশ্যই নির্ণয় করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে উম্মাহর বর্তমান দুর্বলতা ও পশ্চাৎপদতা এমন প্রকটভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে যে, উম্মাহর অস্তিত্ব, এর জীবন বিধান, চিন্তা, প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিমা সভ্যতার দ্বারা ধ্বংসের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে উম্মাহর প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য একটি ব্যাপক এবং গভীর বিচার-বিশ্লেষণমূলক নিরীা ও অনুসন্ধিৎসা থাকা দরকার। এ ধরনের চুলচেরা বিশ্লেষণ আমাদের এমন এক পথের সন্ধান দেবে, যে পথে অগ্রসর হলে উম্মাহর অধঃপতনের মৌলিক কারণগুলো আমরা আবিষ্কার করতে সম হবো।
কয়েক শতাব্দী ধরে উম্মাহ অধঃপতিত অবস্থায় রয়েছে। প্রত্যন্ত কিছু অঞ্চল ছাড়া উম্মাহর সব এলাকা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দখলে ছিল। সম্ভবত এর চেয়েও বেদনাদায়ক সত্য, এখন পর্যন্ত উম্মাহর ওপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব সতত ক্রিয়াশীল। গোটা বিশ্ব উম্মাহর ক‚টনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকাগুলো, বিদেশী শিল্পের জন্য উপযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার, এর কাঁচামাল এবং সস্তা অদ শ্রমিক দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ওই সব ঘটনা এমন সময় ঘটছে, যখন উম্মাহ নিজের প্রয়োজনই মেটাতে পারছে না এবং শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত কাঠামোসহ অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তির উন্নততর প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন সার্বভৌম মতার উৎসগুলোর অভাবের তাড়নায় দারুণভাবে জর্জরিত।
উম্মাহর অধঃপতনের কারণ ইতিহাসের গভীরে গ্রোথিত রয়েছে। যেমনÑ অনেক জাতির েেত্র দেখা যায়, তাদের অধঃপতনের শুরুতে তারা সম্পদ ভোগ করেছে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন নির্বাহ করেছে, যা ছিল তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের উন্নতি ও প্রগতির ফসল। উম্মাহর েেত্র উপযুক্ত উদাহরণ, ব্যক্তির অঢেল ধনসম্পদ এবং সরকারি কর্মচাঞ্চল্যের কোনো কমতি ছিল না। তবুও পতনের সুস্পষ্ট চিহ্নগুলো সীমান্ত বৃদ্ধির তৎপরতা, দুর্নীতির সামাজিকীকরণ ও আক্রমণাত্মক মনোভাবের বদলে আত্মরামূলক দৃষ্টিভঙ্গির লালনে এবং বাগদাদ, জেরুসালেম, কর্ডোভাসহ বিভিন্ন স্থানের অপরিমেয় তির মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আমরা আমাদের অধঃপতনের কারণগুলো জানতে চাইলে আমাদের অসুস্থতার কারণ ও এর লণ এবং জটাজালের মধ্যে সুস্পষ্ট রেখা টেনে তার পরই তুলনামূলক আলোচনায় প্রবেশ করতে হবে। প্রাচীন সম্প্রদায়গুলোর ঐতিহাসিক বিকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের মতবাদ উম্মাহর েেত্র নতুন কোনো বিষয় নয়। এসব দার্শনিক মহৎ হলো সাবাইয়া, ইসমাইলিয়া, নুসাইবিয়া, দ্রুজ ও অন্যান্য। অতীতের ধারাবাহিকতার সূত্রে বর্তমান টিকে আছে বাহাই, আহমাদিয়া, কাদিয়ানি ও জাতীয়তাবাদ।
উপরি উক্ত আন্দোলনগুলো কোনো সমস্যার চিহ্ন বহন করে না, উম্মাহর প্রাথমিক বছরগুলোয়ই এগুলো শেকড় গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। রোমান ও পারসিয়ার রাজন্যবর্গ মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল, এই অস্ত্র ধারণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণেই মরু আরব জাতির মধ্য সামাজিক ও সামরিক শক্তি প্রসারের (যারা সে সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিল)। ল্েয কার্যক্রম গৃহীত হয়েছিল। তার ফলেই ওই ধরনের বিভিন্নমুখী মতবাদের সৃষ্টি হয়। ইসলামি শিার পরও আরববাসীর উপজাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি কখনো পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়নি। তারা শিগগিরই বিদ্রোহ করে বসে এবং কালক্রমে নবীর প্রতিষ্ঠিত রাজধানী মদিনা আক্রমণ করে উসমান ইবনে আফ্ফান তথা তৃতীয় খলিফার সরকারের পতন ঘটায়। এই দুর্ঘটনা রাষ্ট্র সৃষ্টিতে উপজাতীয় এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গির এমন পর্যায় অতিক্রম করে, যা ইসলামি এবং ইসলাম পূর্ব শিা ও ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।
গভীর অভিনিবেশের সাথে উম্মাহর বিষয়গুলো মূল্যায়ন করলে আমরা উম্মাহর সঙ্কট ও সমস্যাগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি। এসব তিকর ঘটনাগুলো স্পষ্ট এবং বাস্তব, মূলত ওপর সব যুক্তিবাদী মানুষ একমত হতে পারে, তবুও এসব বিষয়ের সমাধানের ব্যাপারে কোনো ঐকমত্য নেই বা সিদ্ধান্তের জন্য সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট কোনো দৃষ্টিভঙ্গিও নেই। সবচেয়ে বড় জটিলতা হলোÑ জাতিকেন্দ্রিকতা ও জাতীয় নাস্তিকতা, বল প্রয়োগ এবং যৌন স্বাধীনতার এন্তার বিস্তার। নিজেদের যারা সংস্কারক বলে দাবি করেন, তাদের মধ্যে অনেকে রয়েছেন; যারা প্রকৃতপে উম্মাহর শত্রæ। কেননা তারা এসব বিদেশী মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের সব পথ ও পন্থা ব্যবহার করেন। তাদের প্রকাশ্য দাবি হলোÑ এসব মতবাদ সুস্থ সমাজের লণ বা এগুলোর সংস্কার প্রগতির পথে যাত্রা শুরুরই ইঙ্গিত।
প্রথমত আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে সঙ্কট সমাধানের শুরুটা আমরা কোথা থেকে করব। আমাদের উচিত হবে উম্মাহর আওতাধীন যাত্রা শুরুর নির্দিষ্ট েেত্র নির্ণয়ের বিকল্পগুলো স্থির করা। সে পরিপ্রেেিত এগুলোকে তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা যায় :
০১. বিদেশী সমাধানের অনুকরণ : এটিকে প্রায়ই বিদেশী সমাধান বলা হয়, যা মূলত ধার করা সমাধান এবং যার মূল ভিত্তি বা উৎস হলো সমসাময়িক পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা (ধর্মনিরপে ও বস্তুবাদ), এটি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, সমষ্টিবাদ বা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেতাবাদ, নিরিশ্বরবাদ, পুঁজিবাদ অথবা মার্কসবাদ হিসেবে পরিচিত।
০২. ঐতিহাসিক সমাধানের অনুকরণ : এই সমাধান ইসলামের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে সঞ্চিত সমাধানের ওপর নির্ভর করে, যা কোনো স্থান-কাল-পাত্রের সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দেয় না।
০৩. ইসলামের মৌলিক সমাধান : এটি হচ্ছে ইসলামের সূত্রগুলো থেকে সাহায্য নিয়ে উম্মাহর বিভিন্ন সমস্যার প্রাসঙ্গিক সমাধানের জন্য প্রয়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি। মৌলিক প্রাণশক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য উম্মাহর আকাক্সার চারটি পূর্বশর্ত রয়েছে।
ক. একটি সুষ্ঠু দৃষ্টিভঙ্গি নির্দিষ্টকরণ; খ. দৃষ্টিভঙ্গির ওপর অবিচল আস্থা; গ. ল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করার দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ হওয়া এবং ঘ. এর সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব উপকরণের ব্যবস্থা করা।
আমরা যে বিষয়গুলোকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মনে করেছি, তা যদি সরাসরি জনগণের কাছে নিয়ে গিয়ে এবং উম্মাহর লেখক, চিন্তাবিদ ও নেতৃবৃন্দের কাছে ব্যাখ্যা করে আমরা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে পারি এবং তাহলেই আমাদের মাঝে দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে তার সাথে তাদের শরিক করা সম্ভব হবে।
সম্ভবত সমাধান খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হচ্ছে আমাদের ত্রæটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতাগুলোও খোলাখুলি প্রকাশ করা। কেন এ দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয় তা ব্যাখ্যা করার পর সঠিক সমাধান উপস্থাপন করে কেন এ সমাধান গ্রহণ করা হলো তাও ব্যাখ্যা করতে হবে। উম্মাহ যেখানে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে আক্রান্ত এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসীরা উম্মাহকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করতে চায়, সেই সব েেত্র উম্মাহকে অবশ্যই সেই কারণগুলো উপলব্ধি করতে হবে, কেন অন্যদের প্রস্তাবিত সমাধান উম্মাহর কোনো কাজে আসছে না। এভাবে উম্মাহ নিজের জন্য এর চেয়ে উপযোগী সমাধান নির্ণয় করতে আরো বেশি সম হবে এবং এই সমাধানকে বাস্তবে রূপদান করা যাবে।
অনুবাদ : মো: মাহবুবুল হক

সর্বশেষ সংবাদ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: