Sunday, 22 April, 2018 | ৯ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

Advertisement

ব্যাংক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার অবসান চাই

আনিস আলমগীর: কিছুদিন আগে সংসদে অর্থমন্ত্রী আব্দুল মাল আবুল মুহিত বলেছিলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সরকার গত ১০ বছরে ১০ হাজার ২৭২ কোটি টাকা ‘পুনঃমূলধনীকরণ’ সুবিধা প্রদান করেছেন। এ তথ্য তিনি গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদে প্রদান করেছিলেন। কিন্তু কিছু পত্রিকা তথ্য দিয়েছে, ২০১৬-২০১৭ পর্যন্ত এ ‘পুনঃমূলধনীকরণ’ সুবিধা প্রদান করতে গিয়ে সর্বমোট ১৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ খাতে ‘মূলধন পুনর্গঠন ও বিনিয়োগ খাতে’ ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এখন জানা যাচ্ছে যে সে টাকাও ঋণ দিয়ে ফতুর হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোকে ‘পুনঃমূলধনীকরণ’ স্কিমে সরবরাহ করা হবে। এভাবে চলতে থাকলে রাজকোষের অবস্থা কী হবে? এই টাকা তো কারও ব্যক্তিগত টাকা নয়, এই টাকা ১৬ কোটি মানুষের প্রদত্ত রাজস্বের টাকা।
গত ২৯ মার্চ ‘ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স অব ব্যাংকস’ শীর্ষক কর্মশালায় সরবরাহ করা তথ্যমতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে ১ লক্ষ ২২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। দেশের অর্থখাত চলে মূলত ব্যাংকগুলোকে নিয়ে। এই খাতেরই যদি অনুরূপ লণ্ডভণ্ড অবস্থা হয় তবে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা টিকবে কীভাবে?

এক শাখা এক ব্যাংক আমেরিকার ব্যাংক ব্যবস্থার মতো ব্যবস্থা বাংলাদেশের নয়। ব্রিটিশ ব্যাংক ব্যবস্থার মতো বাংলাদেশের ব্যাংক হলো, এক ব্যাংকের অর্থ হলো শত শত শাখা আর লক্ষ লক্ষ গ্রাহক। জনতা ব্যাংক দেউলিয়া হলে শত শত শাখাসহ দেউলিয়া হবে। আর লক্ষ লক্ষ গ্রাহক চূড়ান্ত দুর্দশায় নিপতিত হবে।

অনুরূপ ব্যাংক ব্যবস্থায় গার্ডিয়ান ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক আর সরকারের অর্থ দফতর অমনোযোগী থাকে কীভাবে? দেখলাম বিদেশি ব্যাংকগুলোও অনিয়মে জড়িত হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকের দুইটা শাখা আছে ঢাকায়, মতিঝিল, আর গুলশানে। তারা এমন এমন গ্রাহককে শত শত কোটি টাকা ঋণ প্রদান করেছে, তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে উত্তরায় প্রদত্ত ঠিকানায় ওই নামের কোনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ও নেই।

খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে যে গত ৫/৭ বছরের মাঝে ওই বিল্ডিংয়ে অনুরূপ নামের কোনও প্রতিষ্ঠান ছিলও না। অনেকের ধারণা, এ টাকা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পেছনে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের পেছনে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ করছে কেউ না কেউ। যে কারণে সন্ত্রাস নির্মূল করা যাচ্ছে না।

একটা স্বাভাবিক মানুষের খরচের চেয়ে একটা সন্ত্রাসীর খরচ অনেক বেশি। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ঘরের থেকে আসা সন্ত্রাসীরা এত টাকা পায় কোথায়? এতদিন বলা হয়েছে স্থানীয় ইসলামী ব্যাংক রাজনীতিকে গোপনে সাহায্য করেছে। এখন মনে হচ্ছে বিদেশি ব্যাংক, বিশেষ করে পাকিস্তানি ন্যাশনাল ব্যাংকও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ, ন্যাশনাল ব্যাংক পাকিস্তানের রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক। আইএসআই- এর কোনও কুমতলব পূরণ করতে তারা পাকিস্তানের সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংককে ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা জালনোট পর্যন্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সরবরাহ করে থাকে।

যাক, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ এখন ১ লক্ষ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা খুবই উদ্বেগজনক। ব্যাংকিং খাতের এই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হবে। এই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হলে ১. পরিচালনা বোর্ড, ২. ম্যানেজমেন্ট ও ৩. শাখা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে সৎ যোগ্য এবং প্রশিক্ষিত জনশক্তি প্রয়োজন।

রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকগুলোর বোর্ড অব ডাইরেক্টরস গঠন করা হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। তারা অনভিজ্ঞ এবং দাপুটে স্বভাবের লোক। ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স অব ব্যাংকসের কর্মশালায় ডাইরেক্টরদের প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ডাইরেক্টর তো অস্থায়ীভাবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। সুতরাং তাদের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করে বিদেশ পাঠিয়ে আরও কিছু টাকা অপচয়ের আয়োজন করা কোনোভাবেই সঠিক হবে না।

রাজনীতিতে জড়িতদের মাঝেও সৎ অভিজ্ঞ লোক আছে, ডাইরেক্টর সিলেকশনের সময় অর্থ দফতর সতর্ক হলেই এ সমস্যার সমাধা হবে। এখন আমরা দেখছি টেলিভিশনের উপস্থাপক, পাতি রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিকও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ডাইরেক্টর হয়েছেন দলীয় সম্পৃক্ততার কারণে। যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা যদি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক-এর ডাইরেক্টর/চেয়ারম্যান সিলেকশনে অমনোযোগী হয় তবে ব্যাংক ব্যবস্থা তো ধ্বংস হয়ে যাবে।

শেখ আব্দুল হাইয়ের মতো মানুষকে চেয়ারম্যান করাতেই তো একটা ব্যাংক অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স অব ব্যাংকস-এর কর্মশালার আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে ডাইরেক্টর বোর্ডের চাপে অনেক সময় ব্যাংকের অনেক অনিয়ম নাকি চাপা পড়ে যায়। এমনকি, অডিটে অনেক কিছুই নাকি রিপোর্টে প্রকাশ পায় না।

আর ডাইরেক্টর বোর্ড এবং ঊর্ধ্বতন ম্যানেজমেন্টের ইচ্ছেমতো নির্দোষ ব্যক্তিকেও দোষী করে প্রতিবেদন প্রদান করা হয়। স্বাধীনভাবে অডিট রিপোর্ট দেওয়াই নাকি মুশকিল। এইভাবে যদি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ব্যবস্থা চলে তবে ব্যাংক ব্যবস্থা তো একদিন অচল হয়ে যাবে। ১৯৬৩-৬৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায়ও অনুরূপ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছি। যে কারণে সুকার্নোর মতো লৌহমানবের পতন হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণ ব্যাংকের গলার কাঁটার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এসব খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের আয় থেকে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। আবার এসব ঋণের বিপরীতে অর্জিত সুদ ব্যাংকের আয়ের খাতে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে মূলধন ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কীয় সংসদীয় কমিটি একটি ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ২৫ জন ঋণখেলাপির ঋণ সম্পর্কে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সমন্বয়ে কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন এবং এই ২৫ জন ঋণখেলাপি সম্পর্কে ৪৫ দিনের মাঝে সংসদীয় কমিটিকে রিপোর্ট প্রদানের কথা বলেছেন। উল্লেখ্য, এই ২৫ ঋণখেলাপির কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে এবং তা ‘কুঋণ’-এর পর্যায়ভুক্ত হয়ে গেছে।

এই ২৫ জন ছাড়াও আরও বড় বড় খেলাপি রয়েছে, যাদের সম্পর্কে সংসদীয় কমিটি এখনও কিছু বলেননি। এই ২৫ জন ঋণখেলাপির মাঝে সর্বোচ্চ ইলিয়াছ ব্রাদার্সের ৮৮৯ কোটি টাকা ঋণ আর সর্বনিম্ন বিসবিল্লাহ টাওয়েল-এর ২৪৩ কোটি টাকা ঋণ। আমরা আশা করবো এক হাজার কোটি টাকার ঊর্ধ্বে থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা যাদের কাছে ঋণখেলাপি হয়েছে তাদের সম্পর্কেও সংসদীয় কমিটি একটি কার্যকর ও গঠনমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

সংসদীয় কমিটির কথা নাকি কার্যকর করতে কোনও কোনও সংস্থা গড়িমসি করে। এবার অর্থ দফতর এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে আমরা অনুরোধ করবো যেন কোনও আইন প্রণয়ন করতে হলে তারও সুপারিশসহ পেশ করে ব্যাংক বিষয়ক অনিয়মকে শৃঙ্খলার মাঝে আনার একটা পদক্ষেপ গ্রহণে সবাই উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

লেখক: সাংবাদিক

anisalamgir@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: