Thursday, 19 July, 2018 | ৪ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

Advertisement

মাননীয় শিক্ষক নেতৃবৃন্দ, রক্তের চেয়ে ঐতিহ্যের গুরুত্ব বেশি নয়

গোলাম মোর্তোজা: লিখব? কী লিখব? মানসিকভাবে স্থির থাকতে পারছি না।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মী ফাহমিদা লুবনা ১১ এপ্রিল ভোর ছয়টার দিকে লিখেছেন ‘বিভীষিকার রাতটা নির্ঘুম কাটলো। সকাল হচ্ছে…’। রাতে আক্রমণ করা হয়েছিল বেগম সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রীদের ওপর। অপরাধ, তারা কোটা সংস্কার আন্দোলন করছেন। বিভীষিকাময় একটা রাত কেটেছে শিক্ষার্থীদের। সাহসিকতা এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রতিরোধও করেছেন ছাত্রীরা। ফলশ্রুতিতে আক্রমণে নেতৃত্বদানকারী হল শাখা সভাপতি ইশরাত জাহান এশাকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছে ছাত্রলীগ।

আগের রাতে রক্তাক্ত হয়েছেন শিক্ষার্থীরা, মাথায় ঘুরছেন শিক্ষকেরা। বলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা। ভাবছি উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের কথা। মনে পড়ছে উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরীর কথা। চোখের সামনে ভেসে উঠছেন অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ। স্বৈরাচার এরশাদের পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি করেছিল। প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী। শুধু শিক্ষক বা শিক্ষার্থীরা নয়, সারা দেশের মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা পেয়েছিলেন তিনি। বিএনপি-জামায়াত সরকারের পুলিশি ও ছাত্রদলের তাণ্ডব চলেছিল শামসুন্নাহার হলে। পুলিশ-ছাত্রদল মিলে পিটিয়েছিল শিক্ষার্থীদের। ধরে নিয়ে গিয়েছিল থানায়। হাতে ফুল নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য থানায় ছুটে গিয়েছিলেন অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ। শিক্ষার্থীরা চোখের পানি ফেলে ভালোবাসায় সিক্ত করেছিলেন অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে।

৯ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত নির্দয়ভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের। রাস্তায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, জলকামান, লাঠি দিয়ে নির্যাতন শুরু করেছে। নিপীড়ন-নির্যাতনে মাঝরাত থেকে পুলিশকে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা-ক্যাডার।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা-ক্যাডাররাই নয়, ঢাকা কলেজসহ নগরীর অন্যান্য কলেজ থেকে ক্যাডারদের নিয়ে এসেছিল তারা। সাধারণ সমর্থকদের অনেকে, কোনও কোনও হল নেতাও ছিলেন আন্দোলনের সঙ্গে। শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে তিনজন নেতা পদত্যাগও করেছেন। নেতা-ক্যাডাররা বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে ইট ছুড়ে, রড দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়েছে শিক্ষার্থীদের। মাথা ফেটে রক্তাক্ত হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রীও। নেতা-ক্যাডাররা লাঞ্ছিত করেছে ছাত্রীদের, নির্দয়ভাবে পিটিয়েছে ছাত্রদের। পুলিশ এবং ছাত্রলীগ মিলে নির্যাতনের মাত্রা ভয়ঙ্কর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল ভোরবেলা।

শাহবাগ-চারুকলা-রাজু ভাস্কর্য-টিএসসি-দোয়েল চত্বর-শহীদুল্লাহ হল-কার্জন হল-ভিসির বাসভবন… নির্যাতন চলল পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে।বলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ১৮শ’র মতো। কয়েকশ’ শিক্ষক ক্যাম্পাস এলাকাতেই থাকেন। শিক্ষার্থীদের দেখাশোনার জন্যে হলে তো শিক্ষকেরা আছেনই। প্রক্টোরিয়াল বডি, সেখানেও আছেন শিক্ষকেরা। শিক্ষার্থীদের দেখে রাখাই তাদের কাজ।

সারা রাত ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর যে নিপীড়ন-নির্যাতন লাঞ্ছনা চলল, শিক্ষকেরা কোথায় থাকলেন, কী করলেন?

তানজিম উদ্দিন খান, কামরুল হাসান মামুন, ফাহমিদুল হক, মোসাহিদা সুলতানাদের মতো কয়েকজনকে সোচ্চার দেখা গেলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হয়তো সরাসরিও তারা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বা দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এই কাতারে নিশ্চয় আরও কিছু শিক্ষক আছেন। তাদের নাম হয়তো জানি না। বিস্মিত হয়ে জানলাম অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলামের নাম। তিনি শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট। বহিরাগত ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়ে ভোররাতে কোনও কারণ ছাড়া শহীদুল্লাহ হলের ঘুমন্ত শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ করা হলো।

হলে ঢুকে পেটাতে শুরু করলো! আক্রান্ত হওয়া ছাত্রদের অধিকাংশই তখনও ঘুমে। পুলিশ হলের ভেতরে টিয়ারশেল মারল। চোখ জ্বলে যাওয়া যন্ত্রণা, নিশ্বাস আটকে যাওয়ার কষ্ট আর লাঠিপেটার আতঙ্ক নিয়ে ঘুম ভাঙলো ছাত্রদের। তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। সেখানে তখন কোনও গণমাধ্যম কর্মী বা ক্যামেরা ছিল না। আক্রমণের সংবাদটি জানতেও পারলেন না দেশের মানুষ। ছাত্রদের পাশে দাঁড়ালেন একজন। সত্যিকারের শিক্ষকের মতো দৃঢ়তা নিয়ে পুলিশের দিকে এগিয়ে গেলেন একা ড. আইনুল ইসলাম।

‘আমার সামনে আমার ছাত্রদের ওপর টিয়ারশেল ছুড়লেন!’– চিৎকার করে পুলিশের উদ্দেশে কথাগুলো বললেন প্রভোস্ট ড. আইনুল ইসলাম।

শহীদুল্লাহ হলের তুলনায় ক্যাম্পাসের অন্যান্য জায়গায় শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চলছিল অনেক বেশি ভয়াবহ মাত্রায়। কিন্তু কোনও একজন শিক্ষক এগিয়ে আসেননি, রক্তাক্ত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াননি। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮শ’ শিক্ষকের সংগঠন শিক্ষক সমিতি আছে, সমিতির নেতা আছেন।

ভিসির বাড়ি আক্রমণের প্রতিবাদে শিক্ষক সমিতি মানববন্ধন করেছেন। সেই মানববন্ধন থেকে জ্বালাময়ী বক্তব্যে ভিসির বাড়িতে হামলাকারীদের বিচার চাচ্ছিলেন শিক্ষক নেতারা। শিক্ষার্থীদের কারা রক্তাক্ত করলো, কেন করলো বা বিচারের কোনও কথা তারা বললেন না। তারাই নাকি এই শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। সন্তানরা অভিভাবকদের লজ্জা দেওয়ার একটি অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনজন শিক্ষার্থী তিনটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন শিক্ষকদের মানববন্ধনের সামনে। প্লাকার্ডে লেখা ‘ক্যাম্পাসে হামলা কেন?’ ‘ছাত্ররা আহত কেন?’ ‘শিক্ষক অভিভাবক জবাব চাই’। একটু বিব্রত হলেও, লজ্জা কি একটু পেয়েছিলেন শিক্ষকরা? মনে হয় না। ‘লজ্জা’ শব্দ থেকে নিজেদের অবস্থান বহুদূরে নিয়ে গেছেন শিক্ষকেরা।

তবে অভিভাবকদের লজ্জা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সে এক কঠিন-নিষ্পাপ প্রতিবাদ করলেন সন্তানরা।

২.

পুলিশ-ছাত্রলীগ নেতা-ক্যাডার মিলে তাণ্ডব চালিয়েছে। শিক্ষার্থীরা ইট ছুড়ে প্রতিরোধের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। মাঝরাতের পর একপর্যায়ে ভিসির বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ভিসির বক্তব্য অনুযায়ী, মুখোশ পরা বহিরাগতরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করেছিল। যে পর্যায়ের আক্রমণ ভাঙচুর হয়েছে, কোনও বিবেচনাতেই সমর্থনযোগ্য নয়। কোনও তথ্য প্রমাণ নেই, প্রথমাবস্থায় ধারণা করেছিলাম ভিসির বাড়ি ভাঙচুর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। সারা রাত ধরে নির্যাতিত শিক্ষার্থীরা কতটা বিক্ষুব্ধ ছিল, তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তারা যখন ভিসি বা শিক্ষক কাউকে পাশে পায়নি, রাগ-ক্ষোভের প্রকাশটা ভিসির বাড়ির ওপর পড়েছে। ধারণা ভুল ছিল বলেই মনে হচ্ছে।

আর ভিসির বক্তব্য অনুযায়ী বহিরাগতরাই যদি আক্রমণ করে থাকে, তাহলে দায় ছাত্রলীগ নেতাদের ওপরই পড়ে। কারণ, বহিরাগত ক্যাডার ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতারাই এনেছিল।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন,

‘যারা মাননীয় উপাচার্যের বাসভবনে হামলা করেছে, তারা কারা? ঘটনার রাতে আমি স্বচক্ষে দেখেছি, রাত প্রায় দেড়টা থেকে রাত আড়াইটা পর্যন্ত, মুখোশধারী এবং হেলমেট পরা লোকজন লাঠি হাতে এ এফ রহমান হল এবং মহসিন হল খেলার মাঠ-সংলগ্ন রাস্তায় ফ্রীলি ঘোরাফেরা করছে। তখনো জানতাম না উপাচার্যের বাসভবনে আসলে কি হয়েছে। পরে যখন জানলাম মুখোশধারীরা হামলা করেছে, তখন বুঝলাম আমি যাদেরকে দেখেছি তারা নিশ্চয়ই হামলাকারীদের অংশ ছিল। প্রশ্ন জাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্যে যেখানে “সরকার বিরোধী” কোনো আন্দোলন নিকট অতীতে সম্ভব হয়নি, সেখানে কিভাবে ছাত্রলীগের নাকের ডগায় মুখোশধারীরা ফ্রীলি ঘোরাফেরা করল এবং মাননীয় উপাচার্যের বাসভবনে হামলা করল?’

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরাও ছিল। ‘ক্যাম্পাসে গুলি কেন? পুলিশ কেন? প্রক্টোর- শিক্ষক- উপাচার্য ঘুমিয়ে কেন?’–অভিমানমিশ্রত প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীদের মনে– মুখে ছিল।

শিক্ষার্থীদের মনে যে তীব্র ক্ষোভ জমা হয়েছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তারা ভাঙুক বা না ভাঙুক, দায় তাদের ওপর চাপানো যায়।

এবং ভিসির বাড়ি ভাঙচুর ইস্যুটি নিয়ে সামনে এসেছে শিক্ষক সমিতি। তারা তিন দিনের প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। মানববন্ধন করেছেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ভিসির বাড়ি দেখতে গেছেন, কলম বিরতি পালন করবেন।

রক্তাক্ত শিক্ষার্থীদের জন্যে শিক্ষক সমিতির কর্মসূচিতে কিছু উল্লেখ নেই। শুধু আহতের সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন। রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, জলকামান এবং লাঠিপেটা করে কয়েকশ’ ছাত্রছাত্রীকে ক্ষতবিক্ষত করা হলো, শিক্ষক সমিতি বা শিক্ষকদের কেউ তাদের রক্ষায় এগিয়ে এলেন না। ভিসি ঘুমাচ্ছিলেন। প্রক্টোর একবার টিএসসিতে এসে ছাত্রীদের হলে ফেরার জন্যে ধমক দিয়ে গিয়েছিলেন। আহত-রক্তাক্ত হয়ে যেসব শিক্ষার্থী ঢাকা মেডিক্যালে গেছেন, কোনও শিক্ষক তাদের খোঁজ নেননি, দেখতে যাননি। আহত রক্তাক্ত শিক্ষার্থীদের হাসপাতাল থেকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন যখন সবকিছু পাশ কাটিয়ে ‘ভিসির বাড়ি’ হয়ে উঠেছে প্রধান বিষয়, তখন বোঝা যায় গভীর পরিকল্পনা থেকেই হয়তো ভিসির বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে।

শিক্ষকসহ সবারই মনে রাখা দরকার, ভিসির বাড়ি যত সম্মান শ্রদ্ধার হোক, যত ঐতিহ্যবাহী হোক, তার মূল্য বা গুরুত্ব একজন মানুষ বা একজন শিক্ষার্থীর রক্তের চেয়ে বেশি নয়। রক্ত চাপা দিয়ে, আসবাবপত্রের জন্যে কান্না বড় বেশি বেমানান। ভিসির স্ত্রী-পরিজনের সেই রাতের আতঙ্কটা অনুধাবন করতে পারছি। শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক তারচেয়েও কতটা ভয়াবহ ছিল, তাও অনুধাবন করতে হবে শিক্ষকদের।

বাড়ি ভাঙচুরের প্রতিবাদ- বিচার শাস্তি হতে হবে। তবে বাড়ি ভাঙচুর ইস্যু দিয়ে ন্যায্য দাবি- শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো বর্বর নিপীড়কদের আড়াল করা যাবে না।

৩.

শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা বিষয়ে কিঞ্চিত ধারণার জন্যে একজন শিক্ষার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি’র একটি লেখার কিছু অংশ তুলে ধরছি। ৯ এপ্রিল ভোরবেলা ইমি তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন-

‘রাত প্রায় একটা।… প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টা করার পর অবশেষে হলগেট খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। সেখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক রাজু ভাস্কর্যের সামনে স্লোগান দিতে থাকি আমরা। হঠাৎ মহসিন হলের দিক থেকে কারা যেন ছুটে আসে আমাদের দিকে। অনবরত ইট ছুঁড়তে থাকে। জ্বি হ্যাঁ, মেয়েদের দিকেই ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে সোনার ছেলেরা। পুলিশও ছিল না তখন। আমরা এলোমেলোভাবে টিএসসির দিকে ছুটতে থাকি। দিকবিদিক ছুটতে ছুটতে আমি পড়ে যাই একেবারে পেছনে। টিএসসির গেটে ঢুকতে গিয়ে আটকে যাই। তখনও পেছন দিয়ে ইট মেরেই যাচ্ছে। আমার ঠিক পেছনেই এক ভাইয়া ছিল। ইট লাগে তার মাথায়। বলা যায়, আমাদের, মানে মেয়েদের বাঁচাতে গিয়েই ইট লাগে উনার মাথায়। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মুখ, আমি হতভম্বের মত তাকিয়ে আছি। ভিতরেও ঢোকা যাচ্ছে না। একপর্যায়ে পড়ে যাই মাটিতে। ভাইয়া চিৎকার করছে, ভাই আমার মাথা ফাটছে, ভাই আমারে বাঁচান। অসহায়ের মত পড়ে থাকি। নড়ার মতনও অবস্থা ছিল না তখন। অনেক কষ্টে যতক্ষণে টিএসসির ভেতরে ঢুকতে পারি, ততক্ষণে দুই পা রীতিমতো পিষ্ট, হাঁটার মত শক্তি নাই। অসহ্য যন্ত্রণা। যখন আটকা পড়েছিলাম, তখন যে বেঁচে ফিরতে পারব এই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভাবছিলাম বোধহয় মারা যাচ্ছি। আমার পেছনে ভাইয়াটা। ইট লাগে ঠিক তার মাথার পেছনে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তাকে ভেতরে নেয়া হল। মাথায় কাপড় দেবার পরেও রক্ত বন্ধ হয় না। আরো একটা কাপড় বেঁধে দেয়া হল। ততক্ষণেও থামে না। তারপর আমি আমার ওড়না দিয়ে দিলাম। রক্ত তখনও থামছে না। মানুষটা কি করুণ ভাবে বলে যাচ্ছিল, আমাকে বাঁচান ভাই। আম্মুকে ডাকছিল। প্রায় ১৫ মিনিট এভাবেই থাকে। তারপর পেছনের দরজা দিয়ে কোনোমতে তাকে মেডিকেলে পাঠানো হয়। বাইরে তখন তুমুল সংঘর্ষ। আর টিএসসির ভেতর গুরুতরভাবে আহত কিছু রক্তাক্ত শরীর। তাদের চিকিৎসার জন্য বাইরে পাঠানো হবে, এমন অবস্থাও নেই। না প্রেস, আর না কোনো নেট সংযোগ। যাদের দেখলাম, তাদের প্রায় সবগুলো মুখ চেনা। ক্যাম্পাসের বড়, ছোট ভাইবোন।

… টিএএসসির ভেতর ঢুকে দেখলাম আমার হলের এক আপুর মাথা ফেটে গেছে। ইট লেগেছে মাথার মাঝ বরাবর। মৈত্রী হলের এক আপু গুরুতর আহত। যে ভাইয়াটা আমার পেছনে ছিল, উনার ইট লেগেছিল মাথার পেছনে। অনেকগুলো ভাইয়ার পা রক্তাক্ত। ফুঁপিয়ে রইলাম টিএসসির ভেতর। সকাল পর্যন্ত জীবন নিয়ে হলে ফিরতে পারব কিনা, তাও জানি না তখন। এমন সময় পোক্টর এলেন। বোধহয় ভুল করেই চলে এসেছিলেন। ছাত্ররা তাকে তাদের দাবিদাওয়া বলল, দোষীদের বিচার চাইল। তিনি কিছুক্ষণ অহেতুক আস্ফালন করে বিদায় হলেন। এমন সময় ছোটবোন মৌসুমি কান্নাকাটি শুরু করল, ওর রুমমেট হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে। সাথে সাথে রওনা দিলাম ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশে। এসে দেখি আপুর মাথায় বিশটা সেলাই! কর্তব্যরত ডাক্তার বললেন, রাত থেকে প্রায় ৬০ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন তিনি। সবাই আমার ক্যাম্পাসের। ভোর পাঁচটায় যখন এই পোস্ট লিখতে শুরু করি, তখনও মেডিকেলের ভেতর চোখ জ্বলছে। বাইরে টিয়ারগ্যাস ছোঁড়া হয়েছে। হাসপাতালের সাধারণ রোগী, ডাক্তার সবাইকে মাশুল দিতে হচ্ছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের!

এখনো মেডিকেলে আছি। পাঁচটার দিকে এক ভাইয়াকে আনা হলো তার মাথার পেছনে ফাটা, নাক ফাটা, হাতে রক্ত পায়ে রক্ত! কাঁদতে কাঁদতে তাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি দেখলাম। এখন সিটিস্ক্যান করতে দিয়েছে।

আক্ষেপ একটাই। কোনো মিডিয়াকে দেখলাম না আসল ঘটনা প্রকাশ করতে, কোনো রাজপথের সৈনিক এগিয়ে এল না মেয়েদের বাঁচাতে!’

যে মাত্রার নির্যাতন হয়েছে, এটা তার অতি সামান্য বিবরণ।

৪.

শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়ানো, দেখতে যাওয়ার প্রয়োজন মনে না করা শিক্ষক সমিতির বড় নেতার মনোভাব জানার সুযোগ হয়েছিল ওই রাতে একটি টকশোতে। শিক্ষক সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কতজন শিক্ষার্থী পুলিশের রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং সরকারি ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা- ক্যাডারদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে আহত বা বুলেটবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত হয়েছেন, আপনাদের এই সংখ্যা জানা আছে কিনা? তাদের চিকিৎসা বা পরিচর্যার ব্যবস্থা করেছেন কিনা? শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে তাদের দেখতে হাসপাতাল বা অন্য কোথাও গিয়েছিলেন কিনা?

উত্তরে রুবাইয়াতুল ইসলাম বললেন, ‘আমাদের কাছে প্রকৃত সংখ্যা হিসেবে নেই। কিন্তু যখনই যে ছাত্ররা আহত হয়েছে বা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে গেছে, আমাদের শিক্ষক সমিতির যারা সদস্য তাদের অনেকেই তাদের খোঁজ খবর নিয়েছে। তাদেরকে দেখতে মেডিক্যাল কলেজে যাওয়ার জন্যে ফোনও করেছে।’

আপনারা হাসপাতালে গেছেন কিনা? আমরা জানি যে, শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে আপনারা কেউ আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে হাসপাতালে যাননি। অভিযোগটি সত্য কিনা?

‘আমি সাড়ে ১১টা (রাত) পর্যন্ত আমার অনুষদেই ছিলাম। বাইরের এলাকাটা টিয়ার গ্যাসের কারণে বের হলে চোখ জ্বলে যাচ্ছিল। যার কারণে আমরা অফিসেই অপেক্ষা করছিলাম। সাড়ে ১১টার সময় শিক্ষক সমিতির সভাপতিসহ আমরা যখন বের হয়েছি, তখন কিন্তু এখানে এই জিনিসটি হয়নি। আমি ক্যাম্পাসে থাকি না, বাইরে থাকি। পৌনে বারোটায় বাসায় ফেরত এসেছি। শিক্ষক সমিতির অন্য যারা সেখানে ছিলেন, তারা অনেকেই খোঁজ খবর নিয়েছেন, আমাদের প্রক্টোরিয়াল বডির দু’একজন মেডিকেল কলেজে গিয়ে জরুরি বিভাগে গিয়ে তাদেরকে দেখে এসেছেন। …পুরো এলাকায় টিয়ারগ্যাস এমনভাবে ছড়িয়ে গিয়েছে যে দশ মিটারও হেঁটে যাওয়া যাচ্ছিল না।’

এই ক্যাম্পাসের ভেতরে যে শত শত টিয়ারশেল ছোড়া হলো, রাবার বুলেট মারা হলো, জলকামান ব্যবহার করা হলো, এক্ষেত্রে প্রক্টোরিয়াল বডি, শিক্ষক সমিতি বা ভিসির কি কিছু করণীয় ছিল? দোষ করুক বা না করুক, আক্রান্ত-আহত-রক্তাক্ত হচ্ছিল শিক্ষার্থীরা। আপনারা তো তাদের অভিভাবক। সারা রাত ধরে তাদের ওপর আক্রমণ চলল, আপনাদের কী কিছু করার ছিল না?

‘আপনারা জানেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট এলাকা আছে। আমরা সেই এলাকার ভেতরে পুলিশকে ঢুকতে দেইনি। মাননীয় উপাচার্য যখন আক্রান্ত হন, তখন তার গেটের সামনে আট দশজন যে পুলিশ থাকে, তারা ছাড়া আর কোনো পুলিশ ডাকেননি। এখানে যে ঘটনাটি ঘটছিল শাহবাগ এবং রাজু ভাস্কর্যের মাঝখানের জায়গাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতার বাইরে। সেখানে ঢাকা মহানগর পুলিশ কী ব্যবস্থা নেবে, আমাদের সিদ্ধান্তের জন্যে তারা অপেক্ষা করেনি।’

৫.

চারুকলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। রাজু ভাস্কর্য- টিএসসি… এগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাইরে?

শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য তেমনই। তিনি একজন শিক্ষক, সত্য- অসত্য বলে মন্তব্য করতে চাই না। তাদের শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হলেন, তারা দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার মতো দাগ কেটে এলাকা নির্ধারণ করে ঘুমিয়ে থাকলেন। অতঃপর জেগে উঠে বললেন ‘বাড়ি কেন ভাঙল’? যেন এর আগে- পরে কিছু ঘটেনি। শিক্ষকরা ভাবছেন দেশের সব মানুষ তাদের মতো করে, তাদের চোখ দিয়েই সবকিছু দেখছেন। এত যৌক্তিক দাবি, এত স্থুল কূটচালে বিভ্রান্ত করা যাবে না। নিজেদের হাস্যকর হিসেবে পরিচিত বা উপস্থাপন করা যাবে। নিজেদেরকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে শিক্ষকরা ইতিমধ্যে অনেক কিছু করে ফেলেছেন। ধারণা করছি সমস্ত লজ্জা- নৈতিকতাকে বহু দূরে সরিয়ে রেখে, তারা তা অব্যাহতই রাখবেন।

ছাত্রলীগ নেতা-ক্যাডার যারা এখনও ক্যাম্পাস এবং হলগুলোতে আতঙ্ক তৈরি করছেন, ‘আমরাও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে আছি’– অচিরেই একথা বলতে বাধ্য হবেন। ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের সময় যেভাবে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর যদি আক্রমণ- নিপীড়ন অব্যাহত রাখার নীতিতেই থাকেন, প্রতিরোধের মুখে পতন অনিবার্য। শিক্ষা নেওয়ার জন্যে সুফিয়া কামাল হল দৃষ্টান্ত হতে পারে।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: