Sunday, 19 August, 2018 | ৪ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

Advertisement

ওষুধ সেবন করলেই কি রোজা ভেঙে যায়?

ড. মোহা: এমরান হোসেন: সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যৌন সম্ভোগ ও পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। এ সময়ে মধ্যে খাদ্য জাতীয় হোক বা অখাদ্য যেমন-ইট, পাথর, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদি হোক মুখ ও পয়নালী বা অন্য কোনো পন্থায় পাকস্থলিতে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রবেশ করালে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। কাজেই রোজা অবস্থায় ওষুধ সেবন করলেও রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসার বদৌলতে অনেক উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলোতে ওষুধ পাকস্থলিতে পৌঁছানোর দরকার হয় না। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও কি রোজা ভেঙে যাবে? এ নিয়ে রোগী ও ডাক্তার উভয়ই অনেক সময় দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান। এ ক্ষেত্রে সঠিক দিশা দানের জন্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা এগিয়ে এসেছেন। রোজা অবস্থায় কোন ধরনের ওষুধ গ্রহণ করা যাবে বা রোজা অবস্থায় রোগ নির্ণয়ের জন্য কোন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাবে ইত্যাদির ব্যাপারে সারা বিশ্বের ইসলামি চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা তাদের সুচিন্তিত অভিমত দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা ইসলামি চিন্তাবিদদের সাথে পরামর্শক্রমে রোজা অবস্থায় কিছু চিকিৎসা গ্রহণে এবং কিছু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রোজা ভঙ্গ হবে না এ বিষয়ে কিছু যৌক্তিক মতামত পরিবেশন করেছেন।

১৯৯৭ সালের জুনে মরক্কোতে ‘ইসলামের সমসাময়িক চিকিৎসা সমস্যা’ শিরোনামে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এই সেমিনারের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল কী কী মেডিক্যালজনিত কারণে রোজার ক্ষতি হবে না। পরবর্তী সময়ে নবম ফিকহ-মেডিক্যাল সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যৌথভাবে বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও স্বাস্থ্য বিষয়ে আলোচনা হয়। এ আলোচনা যৌথভাবে জেদ্দার ইসলামিক ফিকহ অ্যাকাডেমি, মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ইসলামি শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের (আইএসইএসিও) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়। এই সেমিনারেরও মূল আলোচ্য বিষয় ছিল কী কিভাবে ওষুধ সেবনে বা পরীক্ষা করলে রোজা নষ্ট হবে না। তারা কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তাদের সিদ্ধান্তগুলো ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়াও কিছু মনীষী তাদের গ্রন্থাবলিতে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তাদের মতামতের আলোকে রোজা অবস্থায় কিছু চিকিৎসার কথা ও রোগ নির্ণয়ক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা নিচে তুলে ধরা হলো।

১. রোজা অবস্থায় চোখ ও কানে ড্রপ দেয়া যাবে। এ ব্যাপারে সবাই একমত। তবে রোজা অবস্থায় নাকে ড্রপ ব্যবহার করা যাবে কি না এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে দ্বিমত পাওয়া যায়। একদল মনীষীর মতে তা বৈধ। অপর একদল মনীষীর মতে তা অবৈধ। কারণ নাকের মাধ্যমে পানাহার পাকস্থলিতে পৌঁছে যায়। অনেক সময় নাকে ওষুধ ব্যবহারের সাথে সাথেই গলাতে স্বাদ অনুভূত হয়। কাজেই নাকে ড্রপ না ব্যবহার করাতেই সতর্কতা বেশি।

২. হৃদরোগীর বেলায় বুকে ব্যথা হলে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে বা ট্যাবলেট জিহবার নিচে নিতে পারবে।
৩. মহিলা রোগীর তলপেটে পরীক্ষার জন্য যোনিদ্বার দিয়ে চিকিৎসক বা নার্স হাতের আঙ্গুল অথবা কোনো যন্ত্র প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না। এমনকি চিকিৎসার জন্য যোনিপথে পেসারি বা কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে।
৪. মূত্রথলি পরীক্ষা বা এক্স-রে করার জন্য রোগীর প্রস্রাবের দ্বার দিয়ে ক্যাথেটার অথবা অন্য কোনো যন্ত্র প্রবেশ করালে অথবা রেডিও-ওপেক ডাই প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না।
৫. দাঁত তোলা, ড্রিলিং করা বা মেসওয়াক বা ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা যাবে, তাতে রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে যেন এগুলো করার সময় পাকস্থলিতে থুথু বা টুথপেস্ট প্রবেশ না করে।

৬. রোজাদারের জন্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেই ইনজেকশন ব্যবহার করা বৈধ যা পানাহারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। যেমন- পেনিসিলিন বা ইনসুলিন ইনজেকশন অথবা অ্যান্টিবায়োটিক বা টনিক কিংবা ভিটামিন ইনজেকশন অথবা ভ্যাকসিন ইনজেকশন প্রভৃতি হাতে, কোমরে বা অন্য জায়গায় অথবা দেহের পেশী বা শিরায় ব্যবহার করলে রোজার ক্ষতি হবে না। রোগীর চামড়া, মাংস, অস্থিসন্ধি ও শিরায় ইনজেকশন করা যাবে। তবে নিতান্ত প্রয়োজন না হলে দিনে ব্যবহার না করে রাতে ব্যবহার করাই উত্তম। অপরপক্ষে স্যালাইন, ডেক্সট্রোজ, প্রোটিনজাতীয় জিনিস ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।
৭. যে কেউ রক্ত অন্যকে দিতে পারবে এবং প্রয়োজনে নিজেও রক্ত নিতে পারবে। শরীর থেকে দূষিত রক্ত বের করাতে কোনো দোষ নেই।
৮. কোনো রোগী অক্সিজেন অথবা অজ্ঞানকারী গ্যাস (অ্যানেসথেসিয়া) নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না।
৯. ত্বকের মাধ্যমে শরীরের ভেতরে যায় এমন মলম, ক্রিম, অয়েন্টমেন্ট ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে। কারণ তা পেটে যায় না। অনুরূপভাবে রোজা অবস্থায় ত্বককে নরম রাখার জন্য তেল, ভ্যাসলিন বা ক্রিম ব্যবহার করাও বৈধ। এগুলো লোমকুপের ভেতরে প্রবেশ করলেও রোজা ভঙ্গ হবে না। ক্ষত স্থানে ওষুধ ব্যবহার করা ওষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ করা বৈধ। ক্ষত গভীর হোক বা অগভীর হোক। অনুরূপভাবে মহিলাদের জন্য হাতে মেহেন্দী, পায়ে আলতা অথবা চুলে কলপ ব্যবহার করাও বৈধ।
১০. পরীক্ষার জন্য রোগীর শরীর থেকে রক্ত নেয়া যাবে।
১১. হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী হার্টের এনজিওগ্রাম এবং কার্ডিয়াক ক্যাথেটার ব্যবহার করতে পারবে।

১২. রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বা চিকিৎসার অংশ হিসেবে এন্ডোস্কপি করলে রোজা ভাঙবে না। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, যদি পাইপের সাথে কোনো পদার্থ থাকে এবং তা তার পেটে গিয়ে পৌঁছে তাতে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য একান্ত প্রয়োজন ছাড়া না করাই ভালো।
১৩. নাকে বা মুখে স্প্রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই ধরনের স্প্রে দেখতে পাওয়া যায়। এক প্রকার হলো ক্যাপসুল স্প্রে, পাউডার জাতীয়, যা পিস্তলের মতো কোনো পাত্রে রেখে পুশ করে স্প্রে করা হয় এবং ধুলোর মতো উড়ে গিয়ে গলায় পৌঁছলে রোগী তা গিলতে থাকে। এই প্রকারের স্প্রেতে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। দ্বিতীয় প্রকার স্প্রে হলো বাষ্প জাতীয় স্প্রে। এ প্রকার স্প্রেতে রোজা ভাঙবে না। কেননা তা পাকস্থলিতে পৌঁছে না। তা হলো এক প্রকার কমপ্রেসড গ্যাস, যার ডিব্বায় প্রেসার পড়লে উড়ে গিয়ে (নিঃশ্বাসের বাতাসের সাথে) ফুসফুসে পৌঁছে এবং শ্বাসকষ্ট দূর হয়। এ ধরনের গ্যাস কোনো প্রকারের খাদ্য নয়। কাজেই হাঁপানি রোগী রোজা অবস্থায় ইনহেলার নিতে পারবে তাতে রোজা ভঙ্গ হবে না।

১৪. রোজা অবস্থায় আতর বা অন্য প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং সর্বপ্রকার সুঘ্রাণ নাকে নেয়া বৈধ। তবে ধোঁয়া জাতীয় সুগন্ধি যেমন- আগরবাতি, চন্দন-ধোঁয়া প্রভৃতি ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে নেয়া বৈধ হবে না। কারণ এ শ্রেণীর সুগন্ধির ঘনত্ব আছে, যা পাকস্থলিতে গিয়ে পৌঁছে।
১৫. মুখ পরিষ্কারের জন্য মাউথ ওয়াশ বা গড়গড়া বা মুখে স্প্রে জাতীয় ওষুধ ব্যহবহার করা যাবে, তবে যেন পাকস্থলিতে কোনো কিছু না যায়।

১৬. জরায়ু পরীক্ষার জন্য শরীরে হিস্টারোস্কপি করা যাবে, এমনকি জরায়ুতে কোনো যন্ত্রপাতি বা অন্য কিছু পরীক্ষার জন্য প্রবেশ করালে রোজার কোনো সমস্যা হবে না।
১৭. লিভার বায়োপসি অথবা অন্য কোনো অঙ্গের বায়োপসি করলে রোজা নষ্ট হবে না।
১৮. রোগীর পায়ুপথে ইনজেকশন অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আঙ্গুল বা অন্য কোনো যন্ত্র প্রবেশ করালে রোজা নষ্ট হবে না। রোজা অবস্থায় জ্বরে আক্রান্ত হলে পায়খানার দ্বারে ওষুধ (সাপোজিটারি) ব্যবহার করা যায়। অনুরূপভাবে জ্বর মাপার জন্য বা অন্য কোনো পরীক্ষার জন্য মলদ্বারে কোনো যন্ত্র ব্যবহার করলে রোজা নষ্ট হবে না। কারণ এ কাজকে খাওয়া বা পান করা কিছুই বলা যাবে না এবং পায়খানার পথ পানাহারের পথ হিসেবে গণ্য নয়।

১৯. জরুরি কোনো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোজা অবস্থায় করা যাবে।
২০. কিডনি অকেজো হলে রোজা অবস্থায় দেহের রক্ত পরিষ্কার বা শোধন (ডায়ালাইসিস) করলে রোজা ভাঙবে না।
২১. শরীরের কোনো কাটা বা ফাটা স্থান থেকে রক্ত বের হলে অথবা নাক থেকে রক্ত পড়লে রোজা নষ্ট হবে না।

২২. দাঁত থেকে পাথরি উঠানো বা ডাক্তারি ভরণ (ইনলেই) ব্যবহার করা এবং যন্ত্রণার কারণে দাঁত তুলে ফেলা বৈধ। তবে তাতে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার যাতে ওষুধ বা রক্ত যাতে গলধকরণ না হয়ে যায়।
লেখক : অধ্যক্ষ, শংকরবাটী হেফজুল উলুম এফ কে কামিল মাদরাসা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: