Friday, 22 June, 2018 | ৮ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

Advertisement

ইফতার আয়োজনে অনন্য মদিনা

মসজিদে নববীর চত্ত্বরে ইফতারের দৃশ্য

তৌহিদুল ইসলাম: ‘তোরা কে কে যাবি আয় সোনার মদিনায়’। মরমি শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের এই কালজয়ী গান প্রত্যেক মুসলিম হৃদয়কে আবেগ তাড়িত করে তোলে। সত্যি তারাইতো সৌভাগ্যবান যারা নবী সা:-এর দেশে নবীর টানে ভ্রমণের সুযোগ পান। আর এই ভ্রমণের সময়টি যদি হয় রমজান মাস তাহলেতো কথাই নেই।
মাহে রমজান। মুসলমানদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের মাস। পবিত্র কুরআন নাজিলের এই মাসে প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান চান আরো গভীরভাবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিদার লাভ। এ মাসের মধ্য দিয়েই রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পথ খুঁজে ফিরেন তারা। তাইতো সামর্থ্যবান নারী-পুরুষ ছুটে আসেন পবিত্র নগরী মদিনায়।

রমজান মাসকে কেন্দ্র করে মদিনা হয়ে ওঠে উৎসবের নগরী। চারদিকে সাজসাজ রব। শাবান মাসের মধ্য রজনী থেকেই হাওয়া পাল্টে যায় এখানকার। মসজিদে নববীতে চলে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। আবাসিক হোটেল, বিপণিবিতানগুলোতে চলে বিশেষ আয়োজন। সারা বছরই মদিনা শহর ব্যস্ত থাকে ওমরায় আগত মুসলিমদের সমাদরে। সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম হয় হজের মওসুমে। হজের ক’দিন আগে থেকে পর পর্যন্ত দশ লক্ষাধিক হাজী মদিনাতে থাকেন। এই গণজমায়েতের পর সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম হয় মাহে রমজানে। বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে লাখ লাখ মুসলমান শুধু ইবাদতের নিয়তে আসেন শান্তির শহর মদিনায়। এদের একটি বড় অংশ এতেকাফে বসেন মসজিদে নববীতে। অন্যরা দিনরাত মশগুল থাকেন ইবাদতে।

মদিনাতে ইফতার
রমজানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন অধ্যায় হচ্ছে ইফতার। আর রোজাদারদের আতিথেয়তায় মসজিদে নববীর আয়োজন অনন্য। বলে বুঝানোর উপায় নেই যে, মদিনাতে ইফতারের মধ্য দিয়ে যে উৎসব হয়, পৃথিবীর আর কোথাও এর তুলনা মেলা ভার। এখানে রোজাদারদের ইফতার করানোর জন্য যে আকুতি তা প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। তবে বলে রাখা ভালো এ প্রতিযোগিতা কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতা নয়। রোজাদারদের খেদমতের মাধ্যমে নেকি অর্জনই প্রধান উদ্দেশ্য। সেজন্য এখানকার মানুষ দিল থেকে চেষ্টা করেন দেশী-বিদেশী রোজাদারদের সর্বোচ্চ খেদমতের।
রমজান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এত মুসল্লি ওমরা করতে আসেন সৌদি আরবে যে, দেশটির সরকার লোক সমাগম নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়েই ভিসা প্রদানে শর্তারোপ করে। আগত মুসল্লিদের অর্ধেকের বেশি মক্কায় ওমরা শেষে মদিনায় চলে আসেন। এখানকার বাসিন্দারা এ ধরনের ওমরাকারী মুসাফিরদের ‘আল্লাহর মেহমান’ বলে থাকেন। আর আল্লাহর মেহমানদের খেদমতে এরা জান দিতে পারেন।

যারা ইফতারের আয়োজন করেন
শুধু যে সৌদি আরবেরা এ ইফতারের আয়োজন করেন তা কিন্তু নয়। শুধু ইফতার খাওয়ানোর নিয়তে তুরস্ক, মিসর, কাতার, ওমান, দুবাই থেকেও বিত্তশালীরা মদিনায় আসেন। এসব আরব শেখ শুধু মসজিদে নববীর ইফতার আয়োজনে লাখ লাখ রিয়াল ব্যয় করেন। তবে মজার বিষয় হলো মদিনায় ইফতার করানোর সুযোগ পাওয়া খুব সহজ কিছু নয়। বিভিন্ন দেশের আরব শেখরা মাস খানেক আগে থেকেই তাদের ইফতার আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। আগ্রহীর সংখ্যা এত বেশি যে এক কোটি মুসল্লিকেও ইচ্ছা করলে একত্রে ইফতার করানো কোনো ব্যাপারই নয়। কিন্তু স্থান সঙ্কুলানের কারণে অনেকটা টেন্ডারের পদ্ধতিতেই ইফতার আয়োজনের কোটা বরাদ্দ করেন মসজিদে নববী কর্তৃপক্ষ। যারা বেশি সৌভাগ্যবান তারা মসজিদের ভেতরে ইফতার আয়োজনের সুযোগ পান। একেকজন আয়োজককে দুই থেকে পাঁচ শ’ রোজাদারের কোটা দিয়ে এরিয়া ভাগ করে দেয়া হয়। যারা ভেতরে সুযোগ পান না তারা মসজিদের চার দিকের খোলা ময়দানে আয়োজন করেন। তবে ইফতার আয়োজনে আরবদের পাশাপাশি সৌদি প্রবাসী পাকিস্থানি ও তুর্কিরা বেশি এগিয়ে। আয়োজকদের মধ্যে এমনও আছেন যারা কয়েক দশক ধরে বংশপরম্পরায় এখানে ইফতারের নিয়মিত আয়োজক হিসেবে সুপরিচিত। অনেক বিদেশী আছেন যারা প্রতি বছরই রমজানে ওমরায় যান এবং মদিনাতে একই আয়োজকের মেহমান হন।

ইফতারে ভরপুর আয়োজন
রমজানে আমার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলছি। গত রমজানের পঞ্চম দিন আমরা মক্কা থেকে ওমরা শেষে মদিনাতে পৌঁছি। সেদিন রাসূল সা:-এর রওজার পেছনে যেখানটায় মসজিদের ছাদ নেই সেই খোলা আকাশের নিচে বসে ছিলাম আসরের নামাজ পড়তে। আসরের পর মাগরিবের ওয়াক্ত হতে সময়ের ব্যবধান প্রায় দুই ঘণ্টা। কিন্তু সালাম ফিরাতেই কয়েকজন সৌদি তরুণকে দেখলাম দ্রুত উঠে গিয়ে পলিথিন ও কাপড়ের রোল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তে। লাল পুরু কার্পেটের ওপরে তারা অনেকটা পাতলা কার্পেটের মতো লম্বা দস্তরখান বিছিয়ে দিলেন। তার ওপর বিছালেন পাতলা পলিথিন। এই পলিথিনকে এখানে সুবরা বলা হয়। একই দৃশ্য দেখলাম আশপাশের প্রতিটি সারিতে। বুঝতে পারলাম এটি ইফতারের আয়োজন। কিন্তু দুই ঘণ্টা আগে কেন এই আয়োজন তা বুঝতে সময় লাগলো। এটি আসলে অনেকটা ‘দখলের’ মতো। আয়োজকেরা দস্তরখান বিছিয়ে তাদের সীমানা নির্ধারণ করে নেন আগেই। তবে এ কাজে আয়োজকদের মধ্যে নেই কোনো বিশৃঙ্খলা। মুসল্লিরা তখন থেকেই দস্তরখানের পাশে লাইন ধরে বসে যাচ্ছেন। একই আয়োজন মসজিদের বাইরে খোলা ময়দানেও। সময়ের আধ ঘণ্টা আগে থেকে দস্তরখান সাজতে থাকে। প্রথমে শুরু হয় ওয়ানটাইম গ্লাস, খেজুর দিয়ে। এরপর একে একে আসতে থাকে আপেল, মাল্টা, কলা, আঙ্গুরসহ নানা ধরনের ফল। সাথে থাকে জুস, লাবান (মাঠা), ইয়োগার্ট (দধি), শুকনো রুটিসহ অনেক কিছু। মসজিদের ভেতরে পরিচ্ছন্নতার কারণে শুষ্ক আইটেম পরিবেশনের পরামর্শ থাকে সবার প্রতি।

তবে বাইরের ময়দানে আয়োজন থাকে ব্যাপক। ভেতরে এসির বাতাসে ঠাণ্ডা লেগে যায়। তাই দ্বিতীয় দিন ইফতার করি বাইরে। আমার হোটেল (দার আল খায়ের) মসজিদের সাথে প্রায় লাগোয়া। এক মিনিটও লাগে না পৌঁছতে। মসজিদের প্রধান গেটের সামনে ও দুই পাশের এলাকার অধিকাংশজুড়েই পাকিস্তানিদের আধিপত্ত। ইফতার আয়োজনে তারা খুবই সিদ্ধহস্ত। এখানেও আসরের নামাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই দস্তরখান বিছানো হয়। তবে এখানে ভেতরের আয়োজনের চেয়ে বাড়তি থাকে গরম বিরিয়ানি। ইফতার পর্যন্ত বিরিয়ানি গরম রাখতে তারা বিশাল আকৃতির স্টিলের কিচেন ওভেন নিয়ে আসেন। একটি পাকিস্তানি গ্রুপতো প্রতিদিন পিকআপ ভরে বিরিয়ানির ড্যাগ নিয়ে হাজির হয়। সেখানে সব রোজাদারের সামনে ওয়ানটাইম প্লেট দেয়া থাকে বিরিয়ানি খাওয়ার জন্য। যারা ইফতারের সময় ভারী খাবার খেতে পছন্দ করেন তারা এ তল্লাটে ভিড় করেন।

মেহমান করার আকুতি আয়োজকদের
ইফতারের সময় যত ঘনিয়ে আসে আয়োজকেরা তত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন মেহমানের (রোজাদার) সংখ্যা বাড়াতে। কার দস্তরখানে কত বেশি মেহমান তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা হয়। কারো মেহমানের সংখ্যা ২০০ আবার কারো ৫০০। মেহমান করার জন্য কতই না তোষামোদ। ‘আ যাইয়ে ভাই, বেঠ যাইয়ে হামারে ভাই’ ইত্যাদি বলে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে মেহমানকে নিজের দখলের আনার নিরন্তন চেষ্টা চালান তারা। তবে খেয়াল রাখেন কেউ যাতে বিরক্ত বোধ না করেন। মহিলাদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা থাকে ভেতরে ও বাইরে। ইফতারের সময় এত খাবার থাকে যে, কোনো মানুষের একার পক্ষে সেগুলো শেষ করা সম্ভব নয়। অনেককেই দেখা যায় ব্যাগ ভরে সেগুলো নিয়ে যেতে। খাওয়ানোর জন্য এত সমাদর বোধকরি আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

এ যেন স্মরণীয় মুহূর্ত
মসজিদে নববীর বাইরে ইফতার করতে বসে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে। মুহূর্তটি আমার জন্য স্মরণীয়। ১০ লক্ষাধিক মানুষ এক সাথে ইফতার করছেন। নানা দেশের নানা বর্ণের এসব রোজাদার বান্দার কাতারে আমি। ইফতারের ঠিক পূর্ব মুহূর্ত। অনেকেই ঘড়ির কাঁটা দেখছেন। চার দিকে নিস্তব্ধতা। পিন পতনের শব্দটুকু পর্যন্ত নেই। এমতাবস্থায় মসজিদে নববীর মাইকে ভেসে এলো ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি। দোয়া শেষে সবাই ইফতার শুরু করলেন। এর পরের কয়েক মিনিট সবাই শুধু ইফতারের কাজে ব্যস্ত। রোজাদারেরা পাশের জনকে নিজের ভাগ থেকে এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছেন। তারাও ফিরতি হিসেবে অন্যটা তুলে দিচ্ছেন। এ যেন এক অনন্য অনুভূতি। একেইতো বলে ভাতৃত্বের বন্ধন। কেউ কাউকে চিনেন না কিন্তু অন্যকে খাওয়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ইফতার শেষে ভাঙে মিলনমেলা। সবাই তখন দ্রুত প্রস্তুতি নেন নামাজের। সবকিছু পরিকল্পিত থাকায় মুহূর্তেই পলিথিনগুলো উচ্ছিষ্টসহ তুলে ফেলা হয়। শুরু হয় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সালাত আদায়।

লেখক : নগর সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: