Wednesday, 22 August, 2018 | ৭ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

Advertisement

নিরাপদ গুজব চাই!

আহসান কবির: জিম্বাবুয়ের সাবেক রাষ্ট্রপতি রবার্ট মুগাবে একবার দুবাই সফরে গেলেন। জিম্বাবুয়েতে গুজব ছড়িয়ে পড়লো এমন—রবার্ট মুগাবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দুবাইয়ে চিকিৎসার জন্য গেছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন এমনাঙ্গাওয়া অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন। চারদিন পরে মুগাবে দেশে ফিরলে সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেন। মুগাবে সাংবাদিকদের বলেন, এটা ঠিক যে আমি মরে গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও বেঁচে উঠলাম বলে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। ২০১৫ সালের জুনে আমেরিকায় সমকামী বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। রবার্ট মুগাবে তখন বলেছিলেন, আমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আমি বারাক ওবামাকে বিয়ে করতে চাই। মুগাবের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গুজব আমার পিছু ছাড়ছে না। দয়া করে গুজবে কান দেবেন না!
আমিও গুজবে কান দিতে মানা করি। গুজব যদি ছড়াতেই হয়, তাহলে সে গুজব যেন নিরাপদ হয়। যেন সেটা ব্যক্তি বা সমষ্টির জন্য বিপদ ডেকে না আনে। কারণ, একেবারেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ কিংবা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়েছে গুজবের কারণেই। বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য এই যে তারা মানুষ বিচার করে ধর্ম দিয়ে আর যেকোনও আন্দোলনের বিচার করে বড় দুটি দলের দ্বন্দ্ব আর রেষারেষির ভেতর দিয়ে। এ কারণেই বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর টেলিফোন আলাপ ভাইরাল হয় এবং প্রধানমন্ত্রীও বলতে পারেন, যারা গাড়ি পোড়ায় আর মানুষ পুড়িয়ে মারে, তারা ঢুকে পড়েছে ছাত্রদের ভেতরে। স্কুলড্রেস আর ব্যাগ বিক্রি হচ্ছে দেদার। এদের হাত থেকে ছাত্রছাত্রীদের রক্ষা করতে হবে! তিনি অবশ্য এই ঘটনার জন্য তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনকেও দায়ী করেছেন। এই তৃতীয় পক্ষ বিএনপি নাকি অন্য কেউ, সেটা তিনি স্পষ্ট করে বলেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।

এদিকে, বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন (টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি) সাকিব আল হাসান ছাত্রছাত্রীদের স্কুল-কলেজে ফিরে যেতে আহ্বান জানিয়েছেন।

গুজব নিয়ে আগেও তিনবার লিখেছি। দুর্ভাগ্য আর গুজব নাকি মানুষের পিছু ছাড়ে না। ছাত্রদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এমন একটা গুজব হচ্ছে—ইলিয়াস কাঞ্চন আর নিরাপদ সড়ক চাইয়ের নেতৃত্বে থাকছেন না। নেতৃত্ব চলে যাচ্ছে কলেজপড়ুয়া দুই ছাত্রের হাতে! আবার কেউ কেউ এই মানুষটাকে সড়কমন্ত্রী বানানোরও আহ্বান জানিয়েছেন। তবে কাজী নওশাবা নামের এক অভিনেত্রী মোবাইল থেকে লাইভে এসে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলনের সময়ে জিগাতলায় একজনের চোখ তুলে নেওয়া হয়েছে আর দুইজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। আপনারা ছাত্রদের রক্ষা করুন।’ (ঘটনাটা ০৪ আগস্ট, ২০১৮ এর) নওশাবাকে সেই রাতেই গ্রেফতার করে র‌্যাব! গুজব ছড়ানোর কারণে এ পর্যন্ত কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছেন? কেউ কেউ ইনিয়ে-বিনিয়ে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছেন এই বলে যে নওশাবার এমন বলার কারণ কী? তিনি কার পারপাস সার্ভ করছেন? তিনি কি বিনিময়ে কিছু পেয়েছেন? গুজব ছড়ানোর শিকার হচ্ছেন নওশাবা নিজে, এমনকি সাকিব আল হাসানও। সাকিব আগামীতে নির্বাচন করছেন এমন তথ্যও ভাইরাল হয়েছে।

গুজব বিখ্যাতদের পিছু ছাড়ে না। হিটলারকে নিয়ে সবচেয়ে বড় গুজব ছিল হিটলার আত্মহত্যা করেননি। তিনি পালিয়ে আর্জেন্টিনা চলে যান এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পুরনো লেখার রেফারেন্স কখনও গুজব হয় না। তাই গুজব নিয়ে পুরনো কয়েক লাইন তুলে দেওয়া যায়:

গুজবকে শিল্পের অন্তর্ভুক্তি করার দাবি উঠতে পারে যখন-তখন। ইউরোপের দেশগুলোয় গুজবকে নিয়ে অনেক গবেষণা চলে। একবার ইংল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানী রবার্ট ন্যাপের নেতৃত্বে রিউমার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছিল। গুজবের ডালপালা বা পাখা সবচেয়ে গতিশীল। চার স্তম্ভ বা ভিত্তি না থাকলে নাকি বিভ্রান্তিমূলক গুজব প্রাণ পায় না। যেমন:

ক. গুজবটা মনে রাখার মতো হতে হবে।

খ. গুজবকে চলমান কোনও ষড়যন্ত্র বা আন্দোলনের অংশ হিসেবে জুড়ে দিলে ভালো হয়।

গ. কোনও ধর্ম, দল বা গোষ্ঠীর সেন্টিমেন্ট ধারণ করতে হবে গুজবকে।

ঘ. আপামর জনসাধারণের প্রচলিত বিশ্বাস বা সেন্টিমেন্টকে আঘাত করে উসকে দিতে পারে এমন জিনিস রটালে সেই গুজব ফল দেয়।

ছাত্রছাত্রীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়া গুজব কিন্তু ওপরের কথাগুলো প্রমাণ করে। ছাত্রছাত্রীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সর্বশেষ গুজব হচ্ছে— ছাত্রদের চোখ তুলে ফেলা হয়েছে। কমপক্ষে তিনজন মারা গেছে এবং তাদের লাশ গুম করা হয়েছে। নিহতদের বাবা-মা বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিচ্ছেন। আর চারজন মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তারা লজ্জায় মিডিয়ার সামনে আসতে পারছেন না। কেন যেন মানুষ সত্যটা বিশ্বাস করছে না, গুজবকেই সত্য বলে ধরে নিচ্ছে!

গুজবের স্থায়িত্ব কম কিন্তু এর বিস্তার ও প্রভাবিত করার ক্ষমতা অনেক। গুজব বাতাসের আগে ধায়। এই পৃথিবী যখন রাজা-সম্রাটরা শাসন করতো, তখন গুজবই ছিল অনেক ষড়যন্ত্রের চালিকাশক্তি। একটা চীনা প্রবাদ এমন—সব পাখির পাখা রঙিন না। কিন্তু গুজব চাইলেই তার পাখার রং পরিবর্তন করতে পারে। গুজবের পাখা পাখিদের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুতগামী! মোগল শাসনকে অনেক সময় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়। অমুসলমানদের চোখে মোগলরা নিষ্ঠুর এবং অমানবিক শাসনের প্রবর্তন করেছিল। আর মুসলমানরা ভাবেন, মোগলরা ভারতবর্ষের ত্রাণকর্তা ছিলেন। দুই পক্ষের বিচারেই সম্রাট আকবরকে গ্রেট ধরা হয়। আকবর বীরবলকে পছন্দ করতেন, যিনি সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। অন্যদিকে বীরবলকে ভালো চোখে দেখতেন না মোল্লা দোপিয়াজা। ১৫৮৬ আফগানদের সঙ্গে এক যুদ্ধে বীরবল নিহত হলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে বীরবল আসলে মারা যাননি। তিনি পালিয়ে গেছেন উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চল নাগরকোটে। সেখানে সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বীরবলের শোকে কাতর সম্রাট আকবর লোক পাঠালেন সেখানে। সেই লোক ফিরে এসে জানালো ঘটনা সত্য নয়, গুজব! বীরবল আসলেই মারা গেছেন!

ছড়িয়ে পড়া গুজবের ওপর ভিত্তি করে অনেকেই লাশ আর ধর্ষণের শিকার ছাত্রীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেউই প্রমাণ করতে পারেননি। হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধের রাতে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে গুজব ছড়ানো হয়েছিল। বাস্তবে তেমন ঘটেনি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন ব্যবহৃত হচ্ছে, গুজব ছড়ানোর মেশিন হিসেবে। কারও কারও সৃষ্টিশীলতা দেখে অবাক হতে হয়। নিজের বানানো সংবাদ প্রচারের জন্য খবরের টেলিভিশনের লোগো বা সংবাদপত্রের নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বিদেশি কোনও ছবি বা ভিডিও। আমরা গুজবের জাঁতাকলে আটকা পড়ে আছি। একটি টেলিভিশনের নাম জড়িয়ে গুজব ছড়ানোর কারণে ওই টেলিভিশন কলাবাগান থানায় জিডি করা হয়।

শেষমেশ ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরিণতি কী হবে? শাহবাগ আন্দোলনের মতো খুব তাড়াতাড়ি স্মৃতি হয়ে যাবে সব? গুজবের পাখায় ভাসিয়ে দিয়ে কিংবা বিএনপিকে দোষারোপ করে ক্ষমতাসীনরা কী আন্দোলনটাকে ধামাচাপা দিয়ে ফেলবে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে দোষারোপ করেছেন আবার তৃতীয় পক্ষের কথাও ইঙ্গিত করেছেন। এই তৃতীয় পক্ষ কারা?

গুজবের আড়াল থেকে তাদের খুঁজে বের করা জরুরি। যারা আমাদের কোমলমতি শিশু কিশোরদের স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছে তাদের খুঁজে বের করাও জরুরি। যারা শিশুদের মৃত্যুর পর দাঁতাল হাসি হাসে, আবার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়, তাদের ক্ষমতার বাইরে রাখাটাও জরুরি। সবচেয়ে বেশি জরুরি মায়ের মমতা নিয়ে পুরো আন্দোলনটাকে বুকে টেনে নেওয়া, ছাত্রছাত্রীদের স্বপ্নগুলোর পরিচর্যা করা। সবাই ঘরে নিয়ে যেতে পারে না। শুধু প্রধানমন্ত্রীই সেটা পারেন। তিনিই পারেন ছাত্রছাত্রীদের আবারও ক্লাসে ফিরিয়ে আনতে। গুজবের পাখা কেটে দিতে পারেন তিনি। আশা করি তিনি সবকিছুর সমাধান করবেন।

লেখক: রম্যলেখক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: