Thursday, 18 October, 2018 | ৩ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
Advertisement

জাতীয় ঐক্য: কার হাতে থাকবে নেতৃত্ব?

দৈনিকসিলেটডেস্ক:‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’র আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও এর নেতৃত্বে কে থাকবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রক্রিয়ার শুরুতে ‘নেতৃত্ব’ নিয়ে যে মতপার্থক্য ছিল, তা আরও বেড়েছে। বিএনপির ভেতরেও এ নিয়ে কয়েকটি মত রয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর ঐক্য প্রক্রিয়ার দলগুলোকে একমঞ্চে দেখা গেলেও নেতা নির্বাচন নিয়ে মতদ্বৈধ থেকেই গেছে। ঐক্য প্রক্রিয়ার দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

এ অবস্থার মধ্যেই সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের জন্য সব দলের সমন্বয়ে স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের দিকে এগোচ্ছে। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত দলগুলো আন্দোলনে যাওয়ার আগেই এ কমিটি গঠন করা হবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। নেতৃত্ব নিয়ে ড. কামাল হোসেন এবং ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মধ্যেই ‘ইগো’ সমস্যা আছে। ড. কামালের ঘনিষ্ঠরা মনে করেন, রাজনীতিতে তিনি অনেক সিনিয়র, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি বেশি। আর বদরুদ্দোজা চৌধুরীর অনুসারীদের মতে, তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। বয়সেও বড়।

সূত্রে জানা যায়, বিএনপির হাইকমান্ড একক নেতৃত্বের বিষয়ে ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে আস্থায় নিতে পারছেন না। কারণ বিএনপির কাছে খবর আছে, তার ছেলে মাহি বি. চৌধুরীর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, তাদের সঙ্গে তার ব্যবসাও রয়েছে। এ ছাড়া মাহি বি. চৌধুরীর নানা কথাবার্তায়ও সন্দেহ দেখছে দলটি। সর্বোপরি বি. চৌধুরীর ওপর তার ছেলে মাহির প্রভাবও রয়েছে।

এ অবস্থায় ড. কামাল হোসেনের ওপরই বিএনপির আস্থা। তবে কিছু নেতা সমস্যা সমাধানে ড. কামাল, বি. চৌধুরী, ফখরুলের যৌথ নেতৃত্বে সমাধান খুঁজছেন। এ অবস্থায় আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য সব দলের সমন্বয়ে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের চিন্তা নিয়ে এগোচ্ছে দলগুলো।

গত শনিবার জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত নাগরিক সমাবেশে বক্তব্যের শুরুতে গণতন্ত্রহীন জাতিকে নতুন পথ দেখাচ্ছেন ড. কামাল হোসেনÑ উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ধন্যবাদ জানাতে চাই ড. কামাল হোসেনকে, যিনি ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আজকে জাতির এ চরম দুর্দিনে যখন একটা পথ খুঁজছেন, তখন দিশারী হিসেবে জনগণকে সামনের দিকে নিয়ে আসছেন। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, তার (ড. কামাল) নেতৃত্বে এ ঐক্যকে অর্জন করে অতিদ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, সরকারের বাইরে দলগুলোর ঐক্য হয়ে গেছে। সবাই দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। অতএব দেশে এখন সরকার একা একদিকে, অন্য সব রাজনৈতিক দল অন্যদিকে। এখন সবার কথাই হচ্ছে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা তিন বিভাগীয় শহর রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহে সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ সভার মাধ্যমে ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা তাদের বক্তব্য সারা দেশের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেবেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, শনিবার মহানগর নাট্যমঞ্চে সমাবেশের পর ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে যান সমমনা দলগুলোর নেতারা। সেখানে বিকল্পধারা সভাপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীরকে আহ্বায়ক এবং ড. কামাল হোসেন ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে যুগ্ম আহ্বায়ক করার প্রস্তাব ওঠে। কিন্তু বিরোধিতা থাকার কারণে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ ড. কামালের নেতৃত্বেই জাতীয় ঐক্য চালানোর পক্ষে অনেকে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলের নেতাদের মধ্যেও এ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। অধিকাংশ নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে। তবে দলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা যৌথ নেতৃত্বের পক্ষে। এ ক্ষেত্রে তারা ড. কামাল, বি. চৌধুরী এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ঐক্যের পক্ষে। আবার বিএনপিতে সব দলের সমন্বয়ে একটি যৌথ নেতৃত্ব গড়ে তোলার পক্ষেও মত রয়েছে।

এদিকে ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকটি দল সমাবেশে না আসার বিষয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে। সিপিবি, বাসদসহ বাম গণতান্ত্রিক জোটের দলগুলো এ সমাবেশে না আসার সিদ্ধান্তের কথা আগেই জানায়। তারা জাতীয় ঐক্যের কর্মসূচির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করে। এ নিয়ে ড. কামাল হোসেন ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠক হয়।

তবে ২০ দলের শরিক কর্নেল (অব) অলি আহমদের এলডিপি, কল্যাণ পার্টি, এনডিপি ও বাংলাদেশ ন্যাপ সমাবেশে না যাওয়ায় জোটে মতবিরোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিপিবির সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের আন্দোলন হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে। আমরা এখনো সব অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। তার মানে এই নয়, বিএনপির কোনো প্লাটফর্মে আমরা অংশ নেব।

২০-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, যেখানে যুক্তফ্রন্টের নেতারা এখনই আসন ভাগাভাগিসহ ক্ষমতা চায়, সেখানে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের শঙ্কা রয়েছে। যদিও ২০-দলীয় জোটের বৈঠকে বিএনপিকে জাতীয় ঐক্য করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ড. কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয় আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। তা না হলে ১ অক্টোবর থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের পদত্যাগসহ পাঁচদফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সারাদেশের জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন-ওয়ার্ডে সব শ্রেণিপেশার নাগরিক নিয়ে কমিটি গঠনেরও ঘোষণা হয়।

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবে নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ গণজাগরণের কর্মসূচি অব্যাহত রাখারও ঘোষণা দেওয়া হয়। বিএনপি নেতারা বলছেন, এই সরকারকে সরাতে হলে দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐক্য ছাড়া সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে যে বাধা হবে, তাকে সরকারের লোক মনে করে তাদের বাদ দিয়েই সামনে এগোবে দলটি। দলটির একাধিক নেতা বলেন, সুষ্ঠু ও নির্বাচনের স্বার্থে তফসিল ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনের সময় ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার আগে সরকারের পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবিতে ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট এবং বিএনপি রাজপথে আন্দোলন করবে বলে একমত হয়। তাদের এই আন্দোলনের সঙ্গে সরকারের বাইরে থাকা ৮টি দলের সমন্বয়ে গঠিত বাম জোটের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানেও বিএনপি আশাবাদী। এ অবস্থায় দলটির হাইকমান্ড চাচ্ছে সরকারবিরোধী সব দলকে একমঞ্চে এনে দাবি আদায়ের পক্ষে একটি জাগরণ সৃষ্টি করতে।

কিন্তু জামায়াত ও আসন ভাগাভাগিসহ ক্ষমতার ভারসাম্য বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। এ অবস্থায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে আন্দোলনের জন্য স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের বিষয়। এই কমিটি আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়নসহ সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে। প্রতিটি দলের এক থেকে দুইজন নেতাকে এই স্টিয়ারিং কমিটিতে রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। জানতে চাইলে যুক্তফ্রন্টের অন্যতম নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, স্টিয়ারিং কমিটি নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আন্দোলন কীভাবে হবেÑ একমঞ্চে না যুগপৎ, এ বিষয়েও সবার সঙ্গে আলোচনা হতে হবে। তবে আন্দোলন যৌথ নেতৃত্বেও হতে পারে। পরবর্তী পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, এ নিয়ে পরে কথা হবে।-আমাদেরসময়




© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: