Monday, 10 December, 2018 | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
Advertisement

মৌলভীবাজার গেলে নিজেকে খুঁজে পাই: সুনির্মল কুমার দেব মীন

ওয়েছ খছরু:‘সাময়িক’ আটকের ঘটনায় বদলে যায় গতিপথ। রাজনীতির অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে জড়িয়ে পড়েন সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায়। অসংখ্য সিলেটি নাটক রচনা করে পেয়েছেন খ্যাতি। প্রকাশিত তিনটি বই তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। আশির দশকে সিলেট ও মৌলভীবাজারে সাংবাদিকতার অঙ্গনে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। পড়ন্ত বেলায়ও বসে নেই। বঙ্গাব্দের ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত রয়েছেন।

আলোকিত এই মানুষ হলেন প্রফেসর সুনির্মল কুমার দেব মীন।
সিলেট ও মৌলভীবাজারের মানুষের এক পরিচিত মুখ। সিলেটের শিক্ষাক্ষেত্রে রয়েছে তার বিশাল অবদান। শিক্ষাবিদ হিসেবে সবার সমাদরের পাত্র তিনি। কিন্তু বহুমাত্রিক জীবনের অধিকারী এই মানুষটি সাহিত্যে বিচরণ করেছেন অবিরাম। ১৯৭৭ সালে লিখেছেন প্রথম বই ‘মুজতবা প্রসঙ্গ’।

প্রথম বইয়েই তিনি সাড়া ফেলেন পাঠক সমাজে। গুণীজনদের কাছে এই বইয়ের কদর দিন দিন বাড়তে থাকে। আর প্রথম বই রচনায় বাজিমাত করে ঠিক দুই বছর পর রচনা করেন ‘হিজরী সনের ইতিকথা’ বইটি। এই বই দুই বাংলার পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তথ্যভিত্তিক লেখনির এই বইটি অনেকেই সংগ্রহে রেখেছেন। তৃতীয় বই প্রকাশ হয় ২০০২ সালে। ‘একুশই বিশ্ব মাতৃভাষা’ নামের ওই বইটি নতুন প্রজন্মের কাছে অনেক তথ্যবহুল প্রকাশনা।

তিনটি বইয়ে যেমন আছে সাহিত্যরস তেমনি আছে গবেষণার অফুরন্ত ভাণ্ডার। প্রফেসর সুনির্মল কুমার দেব মীনের জন্ম মৌলভীবাজার শহরের শান্তিভাগ গ্রামের সম্ভ্রান্ত উকিল পরিবারে। ১৯৪২ সালের ৩১শে মে জন্ম নেয়া সুনির্মল কুমার দেব মীনের শৈশব কেটেছে মৌলভীবাজার শহরেই। তার পিতা ছিলেন উকিল প্রমোদ রঞ্জন দেব। মৌলভীবাজার শহরের বাংলা স্কুলে পাঠশালা কেটেছে। এরপর ভর্তি হন মৌলভীবাজার গভর্নমেন্ট স্কুলে। সেখান থেকে ১৯৫৯ সালে এসএসসি পাস করেন।

এরপর ভর্তি হন মৌলভীবাজার কলেজে। হাইস্কুল থেকেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতেন। মাঝেমধ্যে আন্দোলনেও অংশ নিতেন। কিন্তু কলেজে পড়ার সময় তুখোড় ছাত্রনেতা হয়ে উঠেন। বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। এরই মধ্যে আসে ইস্যু। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন। এই কমিশনের বিরুদ্ধে তখন অনেকেই আন্দোলনে। ছাত্র ইউনিয়নের তুখোড় নেতা হিসেবে আন্দোলনের অগ্রভাগে সুনির্মল কুমার দেব মীন।

প্রশাসন কঠোর হয় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনকালেই রাজপথে ধরা পড়েন তিনি। পিতা মৌলভীবাজারের বড় উকিল। আটকের পর সমীহ করলেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পিতাকে ডাকলেন। কী করা যায় ছেলেকে। রাজনীতির পোকা মাথায় ঢুকে যাচ্ছে। বিব্রত হন উকিল পিতাও। পরে প্রশাসনের এক কর্মকর্তার বদৌলতে মৌলভীবাজার থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ময়মনসিংহে। একই সঙ্গে সড়ক ও জনপথ বিভাগে ৯০ টাকা বেতনের একটি চাকরিও দেয়া হয়।

জীবনের গতিপথ পাল্টে গেল সুনির্মল কুমার দেব মীনের। ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে ভর্তি হলেন। চাকরিও পেলেন। কয়েক মাস যেতে না যেতেই আর রাজনীতি নয় জড়িয়ে গেলেন সংস্কৃতি অঙ্গনে। নাটক, আবৃত্তি, সাহিত্য এসব নিয়ে ব্যস্ত হতে লাগলেন। এ কারণে তিনি ওই কলেজের তখনকার শিক্ষক রাহাত খান (সিনিয়র সাংবাদিক), যতীন সরকারের স্নেহ পেলেন। পাল্টে যাওয়া জীবন নিয়ে ১৯৬৩ সালে আইএ পাস করলেন। একই কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে বিএ পাস করলেন।

প্রায় ৪ বছরের কলেজ জমানায় অনেক কিছুই শিখলেন সুনির্মল কুমার দেব মীন। এই শিক্ষা তাকে ভিন্ন মানুষে রূপান্তর করে। ময়মনসিংহে পড়ালেখা শেষ করে চলে যান রাজধানী ঢাকায়। উদ্দেশ্য এমএ পাস করা। বাংলায় ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৮ সালে এমএ পাস করেন। ঢাকায় ফিরে আর ছাত্র ইউনিয়ন নয়, ন্যাপের রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলেন। আদর্শিকতার টানেই ন্যাপ করতেন। তবে, পদ-পদবিতে ছিলেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তখনকার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একটি নাটকে অভিনয় করেন। নাটক লেখা, অভিনয় করা এমনকি পরিচালনার প্রতি তার আকর্ষণ বাড়ে।

জড়িয়ে পড়েন নাটকে। সেই থেকে এখনো নাটক লিখছেন তিনি। সিলেট বেতারের তিনি একজন নিয়মিত নাট্যকার, নাট্যাভিনেতা ও নাট্য পরিচালকও। এখনো নিয়মিত তার লেখা নাটক প্রচারিত হয় সিলেট বেতারে। উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে- ইকান হাছানি, ইতা মাতো কিতা ও ইরে বাইসরে। এছাড়া সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্প অবলম্বনে তার নাট্যরূপে ‘পণ্ডিত মশাই’ নাটকটি দেশ-বিদেশেও প্রশংসিত হয়। এমএ পাসের আগে পিতা মারা যাওয়ার পর বাড়িতে ডাক পড়ে সুনির্মল কুমার দেব মীনের। মা বাড়িতে থাকেন। এমএ পড়াকালীন সময়ে ঢাকার মতিঝিলে একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন।

পিতার মৃত্যুর পর তিনি ওই চাকরি ছেড়ে চলে আসেন নিজ শহর মৌলভীবাজারে। তখন সিলেট বিভাগে পত্রিকা বলতে যুগভেরী। প্রখ্যাত সাংবাদিক আমিনুর রশীদ চৌধুরী তাকে বিশ্বাস করতেন বলেই মৌলভীবাজারে তার হাতে তুলে দেন পত্রিকার দায়িত্ব। রিপোর্টিং করতেন, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতেন, পাশাপাশি পত্রিকা বিক্রিতেও জড়িয়ে পড়েন। একসঙ্গে তিনটি শাখায় বিচরণ করেন সুনির্মল কুমার দেব মীন। মৌলভীবাজারের মানুষের কাছে তিনি খুব সহজেই প্রিয় মানুষে পরিণত হন।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হয়। সত্তর সালে মায়ের সঙ্গে মৌলভীবাজারের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যান ভারতের আসামের হাইলাকান্দিতে। সেখানে লালা রুরেল কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর থেকে শুরু হয় তার অধ্যাপনা জীবন। তবে- সাহিত্যের প্রতি টান তার কমেনি। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলন নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখতেন হাইলাকান্দি থেকে প্রকাশিত ধলেশ্বরী পত্রিকায়। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি নিয়মিত লেখালেখি করে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করে রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মৌলভীবাজারে না ফিরে সিলেটে ফিরেন প্রফেসর সুনির্মল কুমার দেব মীন।

১৯৭২ সালে সিলেটে এসে ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ কলেজে কয়েক মাস অধ্যাপনা করেন। এরপর ছাতকে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলে চলে যান সেখানে। তিনি ছাতক ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক। তার সঙ্গে ওই সময় ছাতকে শিক্ষকতা করেছেন মৌলভীবাজারের প্রফেসর সিদ্দিকুর রহমান ও প্রফেসর বীরেন্দ্র কুমার দাশ। ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি ছাতক কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে ছাতকের মানুষের কাছে তিনি এখনো আইডল।

এক নামে ‘মীন স্যার’কে চিনেন ছাতকের মানুষ। তিনি ছাতক কলেজে শিক্ষকতা করলেও বসবাস করছেন সিলেটে। সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা যুগভেরীতে নিয়মিত কলাম লিখতেন ‘বেত্তমিজের হালখাতা’। তার এই কলাম সিলেটের পাঠক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। রম্য লেখক হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। তিনি মর্নিং সান পত্রিকায় সিলেটের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেছেন। ওই সময় তিনি সিলেট প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটের ডাক পত্রিকার প্রকাশনার শুরু থেকে তিনি কাজ করেছেন। তখন তিনি ছিলেন ওই পত্রিকার সহ-সম্পাদক।

এরপর থেকে তিনি সিলেটের ডাকে নিয়মিত কলাম লিখতেন। কয়েক বছর ধরে আর লেখেন না। সিলেটের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তার লেখা পাঠক মহলে সমাদৃত রয়েছে। বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের আজীবন সদস্য তিনি। প্রফেসর সুনির্মল কুমার দেব মীন বিয়ে করেছেন সিলেটের ওসমানীনগরের ঐতিহ্যবাহী বুরুঙ্গা গ্রামে। তার স্ত্রী সুনীতি বালা দেব। ১৯৭১ সালে তার শ্বশুর বুরুঙ্গা পাক বাহিনীর হাতে গণহত্যায় নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। তিন মেয়ে বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। বড় মেয়ে ড. দেবযানী দেব আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসোসিয়েট প্রফেসর। মেজো মেয়ে সারিকা দেব এমবিএ আমেরিকা প্রবাসী। ছোট মেয়ে ড. সুচি সিগ্ধ দেব আমেরিকায় গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন।

তিন মেয়েই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন। স্ত্রী মারা গেছেন। মেয়েরা প্রবাসে থাকেন। বছরের অর্ধেকটা সময় দেশের টানে দেশে আর মেয়েদের টানে আমেরিকায় কাটে প্রফেসর সুনির্মল কুমার মীনের। পড়ন্ত বেলায় এসেও তার সাহিত্য চর্চায় থেমে নেই। ‘বঙ্গাব্দের ইতিহাস’ নামের নতুন একটি তথ্যবহুল বই লেখার কাজ শেষ করেছেন। এই বইয়ের তথ্য এখন থেকে নয়, কলেজ জীবন থেকে সংগ্রহ করছেন। গবেষণাধর্মী এই বইটি আগামী ফেব্রুয়ারিতে গ্রন্থমেলায় প্রকাশ করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন প্রফেসর সুনির্মল কুমার দেব মীন।

এই বইতে বাংলা সন নিয়ে তার একটি আলাদা অধ্যায় রয়েছে। সাহিত্যের মৌলিকতা আঁকড়ে চলা এই সাহিত্যিক মানবজমিনকে জানালেন, এখন অনেকেই লাইব্রেরিতে যায় না, কেউ চর্চা করে না, অনুশীলন নেই। গবেষণা করার সময় নেই। এসব যারা করে তাদের লেখনির কিংবা লেখার স্থায়িত্ব নেই। ইতিহাস জেনে লিখতে হয়। ইতিহাসের বাস্তবতা কেউ কোনোদিন ঢেকে রাখতে পারেনি, পারবেও না। সত্য সব সময় ভেসে উঠে।’ এখনো শেকড়কে ভুলতে পারেননি তিনি। সুযোগ পেলেই প্রিয় শহর মৌলভীবাজারে ছুটে যান। জানালেন- ‘জীবনে যা পেয়েছি অবিশ্বাস্য। অনেক বর্ণাঢ্য জীবন পেয়েছি। এতে আমি সন্তুষ্ট। শেকড়কে আমি ভুলতে পারবো না। মৌলভীবাজার আমার প্রিয় শহর। মৌলভীবাজারই আমার সব। সেই শহরে গেলে আমি আমার নিজেকে খুঁজে পাই।মানবজমিন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: