Thursday, 15 November, 2018 | ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
Advertisement

ইসলামের দৃষ্টিতে কবি ও কবিতা এবং সাহিত্যচর্চা

মোঃ আলতাফ হোসেন হৃদয় খান: ইসলাম মানবতার কল্যাণে নিবেদিত একটি পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যমূলক জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনের প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর সার্বিক বিষয়ে ইসলাম চমৎকার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। মানব সভ্যতার রূপায়ণে কবি ও কবিতা এক অবিচ্ছেদ অংশ। কবি ও কবিতা কালের মহান এক সাক্ষী। মানব মনন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।
ইসলামের দৃষ্টিতে কবিতা দু’ধরনের- একটি সত্য ও সুন্দরের পথপ্রদর্শক অপরটি মানব সভ্যাতার জন্য ধ্বংসাত্মক, অকল্যাণকর, কুরুচিপূর্ণ বিভ্রান্ত চিন্তার ধারক। ইসলাম একদিকে যেমন কল্যাণকর সাহিত্যের সৃষ্টিতে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছে ঠিক তেমনি সভ্যতার জন্য ক্ষতিকারক ও অশ্লীল সাহিত্য তৈরিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে কবিদের নামে সুনিপুণ বর্ণনা সমৃদ্ধ ‘আশ-শুয়ারা’ নামক পূর্ণাঙ্গ একটি সূরা রয়েছে। উক্ত সূরায় আল্লাহ বলেন:- এবং কবিদের যারা অনুসরণ করে তারা বিভ্রান্ত। আপনি কি দেখেন না যে তারা প্রতি ময়দানেই উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং এমন কথা বলে যা তারা করে না। তবে তাদের কথা ভিন্ন যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা অচিরেই জানিবে কোন স্থানে তারা ফিরে আসবে। (সূরা-আশশুয়ারা, আয়াত ২২৪-২২৭)
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর হযরত আব্দল্লাহ বিন রাওয়াহা, হাসসান বিন সাবিত, কা’ব ইবনে মালিক প্রমুখ সাহাবী কবি কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর খেদমতে হাজির হন এবং আরজ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তা’য়ালা এই আয়াত নাযিল করেছেন। আমরাও তো কবিতা রচনা করি, এখন আমাদের উপায় কী? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আয়াতের শেষাংশ পাঠ কর। এ আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, তোমাদের কবিতা যেন অনর্থক ও ভ্রান্ত উদ্দেশ্যে প্রণোদিত না হয়। কাজেই তোমরা আয়াতের শেষাংশে উল্লিখিত কবিদের শামিল। (ফতহুল বারী)
আলোচ্য আয়াতের একদিকে বিপথগামী মুশরিক কবিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অপরদিকে তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরের পতাকাবাহী ঈমানদার কবিদের শ্রেষ্ঠত্ব নিরুপণ করে তাদেরকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যারা কবি তারা প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা ভাবুক, কল্পনাপ্রবণ ও আবেগী। এটা তাদের স্বভাবধর্ম। এ কল্পনাপ্রবণ ও আবেগী না হলে কাব্য সৃষ্টি করা যায় না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কবিদের প্রতি বিশেষ এক নেয়ামত। যে কারণে সাধারণ মানুষ যা পারে না তারা পারেন, আর পারেন বলেই তারা কবি।
কবিদের এ ভাবের জগৎ থেকে, কল্পনাপ্রবণতা থেকে দূরে রাখা আল্লাহর ইচ্ছা নয়। তবে তারা যেন এ ভাবের জগতে বিচরণ করতে গিয়ে বিপথগামী না হয় এ জন্য আল্লাহ্ তা’য়ালা কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন: ১। একজন কবিকে ঈমানদার হতে হবে। ২। ঈমান আনার সাথে সাথে অসৎ কর্ম বর্জন করে সত্য ও সুন্দরের অনুসারী হতে হবে। ৩। এ ভাবপ্রবণতা ও আবেগী বিচরণ যাতে তাকে সৎ পথ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে সে জন্য আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে সদা সর্বদা তাঁর সাহায্য চাইতে হবে। ৪। আর যখনি মানবতা বিপন্ন হবে, নিপীড়িত, নির্যাতিত হবে তখনি কবি তার সর্ব শক্তি নিয়োগ করে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করবেন। মানুষকে তার প্রাপ্য অধিকার সচেতন করে তোলার জন্য, নিপীড়ন ও নির্যাতনের ব্যপারে জনগণকে একত্র করার জন্য, কিসে এবং কিভাবে মানবতা বিপন্ন হচ্ছে তা স্পষ্ট করার জন্য সভ্যতার স্বপক্ষে বিপ্লবের বাণী উচ্চকিত করার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে কবিদের।
কবি ও কবিতার এক উর্বর জনপদে জন্মগ্রহণ করে ছিলেন রাসূলে আরাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। নবুয়াত প্রাপ্তির আগেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মধ্যে আরবী ভাষা ও সাহিত্যর উপর একটি অসাধারণ দখল এসে গিয়েছিল প্রকৃতিগত ভাবে একজন আরব হবার কারণে। এছাড়া কবি ও কবিতার প্রতি তার একটি স্বভাবসুলভ আগ্রহ ও কৌতূহল ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে যেমন কবিতা শুনতে ভালবাসতেন ঠিক তেমনি অন্যদের ও তিনি কবিতার প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্যে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বলেছেন ‘যে দু’টো মনোরম আবরণে আল্লাহতা’য়ালা বিশ্বকে সাজিয়ে থাকেন, কবিতা তার একটি।’ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন, ‘নিঃসন্দেহে কোন কোন কবিতায় রয়েছে প্রকৃতি জ্ঞানের কথা।’ তিনি সাহাবীদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তনদেরকে কবিতা শেখাও, এতে তার কথা মিষ্টি ও সুরেলা হবে।’ হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) আরো বর্ণনা করেন- ‘মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন- তোমরা কাফির, মুশরিকদের নিন্দা করে কাব্য লড়াইয়ে নেমে পড়। তীরের ফলার চেয়েও তা তাদেরকে বেশী আহত করবে।’ ইবনে রাওয়াহাকে পাঠানো হল। সম্পূর্ণ মুগ্ধ হতে পারলেন না নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। কা’ব বিন মালিককেও পাঠানো হলো। অবশেষে যখন হাস্সান এলেন, তিনি বললেন, ‘সবশেষে তোমরা ওকে পাঠালে? ও তো লেজের আঘাতে সংহারকারী তেজোদীপ্ত সিংহ শাবক।’ কথা শুনে হাস্সান (রাঃ) আনন্দে জিভ নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘সেই মহান সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্যবাণী সহকারে পাঠিয়েছেন। এ জিভ দিয়ে তাদের চামড়া ছুলে ফেলার মত গাত্রদাহ সৃষ্টি করেই ছাড়ব।’
এ দিন থেকেই আনসারদের মধ্যে তিনজন ইসলামী কবি হাস্সান বিন সাবিত, কা’ব বিন মালিক এবং আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা কাফিরদের বিরুদ্ধে কাব্য লড়াইয়ে নেমে পড়লেন। একবার রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দীর্ঘ সফরে বের হয়েছেন। জনমানবহীন প্রান্তরে মরুপথে উটের পিঠে অবস্থান করছেন। রাতও হয়েছে বেশ, বললেন, হাস্সান কোথায়?’ হযরত হাস্সান (রাঃ) এগিয়ে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ এই তো আমি।’ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আমাদের কিছু “হুদা” শোনাও তো? শুরু করলেন কবি। ওদিকে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন দিয়ে শুনছেন এবং উট চলছে অধিকতর ক্ষিপ্রতায়। উটের দ্রুত চলার কারণে মনে হচ্ছে হাওদা যেন পিছন দিকে ভেঙে পড়ে যাবে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাস্সানকে থামতে বলে মন্তব্য করলেন, ‘কবিতাকে এ জন্যই বলা হয় বিদ্যুতের চেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং এর আঘাত শেলের আঘাতের চেয়েও ক্ষিপ্র ও ভয়ানক।’
রাসূল (সাঃ)-এর উৎসাহ ও প্রেরণায় সাহাবীদের মধ্যে যাদের কাব্যচর্চার প্রতিভা ছিল তারা প্রায় সকলেই কাব্যচর্চা করতেন। সাহাবী কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- হাস্সান বিন সাবিত (রাঃ), কা’ব বিন মালিক (রাঃ), আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ), আলী ইবনে আবু তালিব, আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), উমর ফারুক (রাঃ), লবীদ বিন রাবিয়াহ (রাঃ), কাৎব ইবনে যুহাযের (রাঃ), আব্বাস বিন মিরদাস (রাঃ), যুহায়ের বিন জুনাব (রাঃ), সুহায়েম (রাঃ) ও আবু লায়লা (রাঃ) প্রমুখ।
রাসূলে আরাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবী কবিদের মধ্যে থেকে কবি হাস্সান বিন সাবিতকে সভাকবির মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাকে বলা হতো শায়েরুর রাসূল বা রাসূলের কবি। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায় কবি হাস্সান বিন সাবিত কবিতা আবৃত্তি শুরু করলে কবিকে উৎসাহিত করার জন্য কখনো কখনো নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবাইকে শুনিয়ে বলতেন, ‘হাস্সানের জিব যতদিন রাসূলের পক্ষ হয়ে কবিতার বাণী শুনিয়ে যাবে, ততদিন তার সাথে জিব্রাইল (আলাইহিস সালাম) থাকবেন।’ কবিতা লেখার পুরস্কার হিসাবে কবি হাস্সান বিন সাবিত (রাঃ) জীবিত অবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। হাস্সান বিন সাবিতের কবিতা শুনে রাসূলে আরাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা দিয়েছিলেন- ‘হে হাস্সান, আল্লাহ কাছ থেকে তোমার জন্য পুরস্কার রয়েছে জান্নাত।’
কাব্যে অশ্লীলতা বর্জনের ব্যাপারে আল্লাহ নবীর কঠোর নির্দেশ ছিল। তিনি বলেছেন ‘ইসলাম গ্রহণের পরও যে অশ্লীল কবিতা ছাড়তে পারলো না, সে যেন তার জিবটাই নষ্ট করে ফেলল।’ রাসূল মাকবুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন, ‘কারো পেট বা হৃদয় যদি পুঁজপূর্ণ হয়ে পঁচে যায়, তবুও সেই পেট বা হৃদয় অশ্লীল কবিতার চেয়ে উত্তম।’ প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দরবারে একবার কবিদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনাক্রমে জাহেলী যুগের অশ্লীল কবিতার জনক ইমরাউল কায়েসের প্রসঙ্গ এলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সম্পর্কে বললেন, ‘দুনিয়ায় তিনি খ্যাতনামা হলেও আখিরাতে তার নাম নেবার কেউ থাকবে না। কবিদের যে বাহিনী জাহান্নামের দিকে যাবে সে থাকবে তার পতাকাবাহী।’
কবি ও কবিতা সর্ম্পকে রাসূলে আরবী (সাঃ) এর মনোমুগ্ধকর চিত্তাকর্ষক, সুনিপুণ মূল্যায়ন আজকের শ্রেষ্ঠ কাব্য সমালোচকদের মন্তব্যকেও হার মানায়। তিনি বলেছেনÑ ‘নিশ্চইয় কবিতা হচ্ছে সুসংবদ্ধ কথামালা, কাজেই যে কবিতা সত্য আশ্রিত সে কবিতা সুন্দর। আর যে কবিতা সত্য বিবর্জিত সে কবিতার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। উট থামাতে পারে তার সুকরুণ ক্রন্দন। কিন্তু আরবরা থামাতে পারে না তাদের কবিতার সুর। নিশ্চয়ই কবিতা বিদ্যুতের চেয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং তীরের ফলার চেয়েও ক্ষিপ্র ও ভয়ানক। আরবদের সুসংবদ্ধ কথা হলো তাদের কবিতা। কবিতার ভাষায় কিছু চাইলে তারা মন ভরে দান করে। তাদের ক্রোধের আগুন নিভিয়ে ফেলে কাব্যের অন্তঃসলিল প্রবাহ। সাহিত্যের আসরে কবিতাই হলো তাদের মনকাড়া শ্রেষ্ঠ উপহার।’

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: