Thursday, 15 November, 2018 | ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
Advertisement

নির্বাচনকালীন সরকারের একটি নতুন ফর্মুলা

মুহিত চেীধুরী: দেশের বর্তমান সংকট নিরসনে সরকার এবং মাঠের বিরোধীদলগুলোর আন্তরিকতায় দেশের মানুষ অনেকটা মুগ্ধ। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে সরকার ইতোমধ্যে দু’বার সংলাপ করেছে। সংলাপে চূড়ান্ত সফলতা না আসলেও বরফ গলেছে। উভয়পক্ষই এই সমস্যা সমাধানে আন্তরিক তাই অচীরেই একটি সমাধান আসবে বলে জাতি আশা করছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনকালীন সরকারের একটা রূপরেখা দিয়েছে। এই রূপরেখায় চারটি পয়েন্টে তৈরি করা হয়েছে । পয়েন্টগুলো হচ্ছে- নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনের সমতল ভূমি ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন।
সরকার তাদের এই দাবীগুলোকে মেনে নেয়নি। দ্বিতীয় দফা সংলাপেও সংকটের তেমন কোন সমাধান না আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি দেশবাসীও অনেকটা হতাশ।এই হতাশা দূর করার লক্ষে সকল পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত এবং দলীয় স্বার্থকে ত্যাগ করে দেশের স্বার্থকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে।
আমি মনে করি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরকার প্রধান রেখেও একটি  নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব।

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনে রূপরেখায় ১০ উপ-দফাবিশিষ্ট ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার’ পয়েন্টে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বলেছে,

১. প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, প্রেসিডেন্ট সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য এবং কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা তার অঙ্গ সংগঠনের সদস্য কিংবা দল অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না এমন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন।

২. প্রেসিডেন্ট প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, প্রেসিডেন্ট সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য এবং কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা তার অঙ্গ সংগঠনের সদস্য কিংবা দল অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না- এমন ব্যক্তিকে উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন।

৩. প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে এবং অপর ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠিত হবে।

৪. এভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা সংবিধান প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। উপদেষ্টারা মন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং সংবিধান প্রদত্ত মন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।

৫. প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে নিজ হাতে লিখিত ও নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বা যেকোনো উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে পারবেন।

৬. নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার সংবিধানের ১২৩ (৩) (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ ভাঙিয়া দেয়ার অনধিক ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবে।

৭. নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার নির্বাচনকালে কেবলমাত্র রাষ্ট্রের দৈনন্দিন রুটিন কার্যাবলী সম্পাদন করবে এবং অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করবে।

৮. নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার কোনোরূপ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না।

৯. সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদের ৪ দফার (খ) উপ-দফায় ‘প্রধান উপদেষ্টা’ এবং (ঘ) উপ-দফায় ‘উপদেষ্টা’ যুক্ত হবে। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের ১ দফায়- ‘উপদেষ্টা’ অর্থ নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীন উক্ত পদে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি এবং ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ এই অভিব্যক্তির সংজ্ঞার পর প্রধান উপদেষ্টা অর্থ নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীন উক্ত পদে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি যুক্ত হবে।

১০. নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী যে তারিখে তার পদের কার্যভার গ্রহণ করেন সে তারিখে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার বিলুপ্ত হবে। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়ার পয়েন্টে সংবিধানের ব্যাখ্যা তুলে ধরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বলেছে, সংসদ ভেঙে দেয়া সংক্রান্ত পরিস্থিতি ও বিধানগুলো সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বিবৃত আছে। এ ছাড়া আমাদের এবং বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক প্রথায়ও সংসদের মেয়াদপূর্তির আগে সংসদ ভেঙে দেয়ার প্রচুর নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়াদপূর্তির আগেই সংসদে ভেঙে দেয়া হয়েছিল। বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধান ও প্রথার আলোকে এবং বিশেষত ১২৩ (৩) (খ)-এর আলোকে প্রধানমন্ত্রী নভেম্বরের শেষে বা ডিসেম্বর মাসে প্রেসিডেন্টকে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেয়ার পরামর্শ দিতে পারেন এবং সে অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেয়া সম্পূর্ণ সংবিধানসম্মত হবে। অনুচ্ছেদ ১২৩ (৩) (খ) অনুযায়ী উপরে উল্লিখিত পন্থায় সংসদ ভেঙে দেয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ১১তম সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করবে। সেক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে দেয়ার তারিখ অনুযায়ী ১১তম সংসদ নির্বাচন ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে বা মার্চে অনুষ্ঠিত হতে পারে। বিভিন্ন দেশের সাংবিধানিক রীতি অনুসারে সংসদ ভেঙে দেয়া ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৪৫ দিন ব্যবধান থাকা বাঞ্ছনীয়। উল্লিখিত মতে, সংসদ ভেঙে দিলে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল ও প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের একটি বড় শর্ত পূরণ হবে।

আমার নতুন ফর্মুলা:
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনকালীন সরকারের যে রূপরেখা দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে একটি অর্নিবাচিত সরকারের হাতে দেশের শাসনভার তোলে দিতে হবে। তাই আমি মনে করি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরকার প্রধান রেখে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে।যে সরকার রুটিন ওর্য়াক করবে এবং নির্বাচন কমিশনকে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে সবধরনের সহায়তা করবে।

নির্বাচনকালীন সরকারের সরকার প্রধান হবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। বাকী ১০ সদস্য সরকারীদল এবং মাঠের বিরোধীদল ও জোট নির্বাচন করবে।
এক্ষেত্রে বিরোধীদল তাদের দৃষ্টিতে ১০ জন ক্লিন ইমেজের দল নিরপেক্ষ অরাজনৈতিক ব্যক্তির নামের তালিকা সরকারের কাছে পাঠাবে। সরকার এই তালিকা থেকে তাদের পছন্দের ৫ জনকে বাছাই করবে।
অন্যদিকে সরকারও ১০ জন ক্লিন ইমেজের দল নিরপেক্ষ অরাজনৈতিক ব্যক্তির নামের তালিকা বিরোধীদলের কাছে পাঠাবে। বিরোধীদল এই তালিকা থেকে তাদের পছন্দের ৫ জনকে বাছাই করবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সংসদ না ভেঙ্গেও এই পদ্ধতিতে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে।
সরকার প্রধান নির্বাচনে অংশ নিতে পারলেও অন্য ১০ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচনের মাঠে বা কাজে সরকার প্রধান নির্ধারিত প্রটোকলের বাইরে অন্য কোন সুযোগ সুবিধা পাবেন না।

খালেদা জিয়া প্রসঙ্গ:
বেগম খালেদা জিয়ার মামলা সত্য-মিথ্যা যাই হোক দেশের বেশিরভাগ মানুষ এটিকে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখছে। এর অন্যতম কারণ দেশের শেয়ার বাজার এবং ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠপাটকারীদের আইনের আওতায় আনা হয়নি এবং তাদের বিচার এখনও হয়নি। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অংশগ্রহন করার সুযোগ সরকারকেই করে দিতে হবে।
অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান মেনে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।

আমি রাজনীতিক কিংবা সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। তাই বাকী বিষয়গুলো সংবিধান অনুযায়ী রাজনৈতিক নেতারা নির্ধারণ করবেন। আমার বিশ্বাস আমরা সকলে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে এলে দেশের সকল সমস্যা সমাধান করা এক মুহূর্তের ব্যাপার।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক, সভাপতি সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: