Tuesday, 21 May, 2019 | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |
Advertisement

বাংলাদেশের রাজনীতি: আঁতাত, সমঝোতা ও গণতন্ত্রহীনতা

কাইয়ূম আব্দুল্লাহ, লণ্ডন থেকে: বাংলাদেশের রাজনীতিতে আঁতাত কিংবা সমঝোতার বিষয়টি নতুন নয়। গণতন্ত্রহীনতা, সেনাশাসন ও পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারের সাথে বিরোধীদল কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের আতাঁত অথবা সমঝোতার বিষয়টি অনেকবার অনেকভাবে আলোচিত হয়েছে। তম্মধ্যে বেশ আালোচিত ছিলো- এরশাদ-হাসিনা আতাঁত। ১৯৮৬ সালে জোটবদ্ধ আন্দোলনের মাঝ পথে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের সাথে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় আওয়ামী লীগ ভীষণভাবে সমালোচিত হয়। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক ধারা সূচনা হওয়ার পর বড় তিনটি দল আওয়ামী?লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত রাজনৈতিক সমঝোতা ও আঁতাত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জমায়াতের অবস্থান ও ভূমিকা মারাত“কভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক সুবিধা নেবার জন্য দলটির সাথে কখনো বিএনপি, কখনো আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করে। কারণ, জামায়াতের সাংগঠিক শক্তি ও ভিত্তিকে কারোরই অস্বীকারের উপায় ছিলো না। জামায়াতকে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার বানানোর জন্য বিএনপিকে দোষারূপ করার পাশাপাশি বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী?লীগের জোটবাধাকেও মানুষ মেনে নেয়নি।
ওয়ান ইলিভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেই নতুন রূপে আভির্ভূত হয় আওয়ামী?লীগ। ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ এককালের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতকে সবচেয়ে কঠিন সময়টি উপহার দেয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে একে একে দলটির ৭ জন শীর্ষ নেতাকে ফাঁসি এবং কাউকে সাজা এবং অনেককে কারাবান্দী করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকেও বলা যায় একেবারে কোণঠাসা করতে সক্ষম হয় তারা। দলটির চেয়ারপার্সন কারারুদ্ধ, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন বহুদিন থেকে বৃটেনে একরকম স্বেচ্ছানির্বাসিত।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সূচনা ঘটে। কিন্তু রাজনীতিকদের সদিচ্ছার অভাবে সেটি এখন বিপন্ন প্রায়। ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই সেই বহুলভাবে সমাধৃত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাও বিলুপ করার নানা চেষ্টা করে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রথমে নানাভাবে সেই চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় বিএনপি। বিএনপির সেই খায়েশ পূরণের সবচেয়ে বেশী বাধা হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামী?লীগ। অতঃপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাদের মধ্যেও সেই একই খায়েশ কাজ করে এবং শেষ পর্যন্ত তারা তা পূরণেও সক্ষম হয়। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী কারোর বাধাই আমলে নেয়নি আওয়ামী লীগ। সংবিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সংক্রান্ত আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে তা করতে সক্ষম হয় তারা। আদালতের রায়ে আরো দুই বা তিন টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার সুযোগ দেয়া হলেও সেদিকে যায়নি আওয়ামী?লীগ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী আদায়ে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট প্রতিবাদ স্বরূপ ২০১৪ সালে আওয়ামী?লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শতাধিক এমপি নির্বাচনের বিষয়টি দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ সমালোচিত হয়। পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়া আওয়ামী?লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হয় বিএনপি জোট। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কোনো উপায়ন্তর না করতে পেরে ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেয় তারা। সেই নির্বাচনেও মাত্র ৭টি আসন ব্যতিরেখে সবকটি নিজেদের করায়ত্বে নেয়ার পাশাপাশি ভোট সেন্টারে ভোটারের রেকর্ডসংখ্যক অনুপস্থিতি এবং দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় ভোট কারচুপির বিষয়টি ফলাও করে প্রকাশ পায়। ফলশ্রুতিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট সংসদে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এমপিদের শপথ না নিতে বলা হয়। কিন্তু সেটিতেও অনড় অবস্থানে থাকতে পারেনি ঐক্যফ্রন্ট কিংবা বিএনপি। একে একে প্রায় সবাই শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন।
সর্বশেষ শুধু মহাসচিব ছাড়া বাকী সব এমপিদের সংসদে যোগ দেয়ায় সরকার ও বিএনপির মধ্যকার সম্ভাব্য গোপন সমঝোতার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্দোলনে ব্যর্থ বিএনপি দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার প্যারোলে কিংবা জামিনে মুক্তির বিনিময়ে সরকারের সাথে সমঝোতায় পৌঁছেছে বেলে কউ কেউ মনে করছেন এবং সর্বত্র তা আলোচিত হচ্ছে। যদিও সাংগঠনিকভাবে প্রায় ভেঙ্গে পড়া বিএনপির সাথে সমঝোতার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই বলে কেউ কেউ মনে করতে পারেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দুর্নাম ঘুচাতে যে কোনকিছুর বিনিময়ে হলেও বিএনপির সাথে আওয়ামী?লীগের সমঝোতা হওয়ার বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ওঠে যাবার পর একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের জন্ম দিচ্ছে আওয়ামী?লীগ। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচনে ভোয়া ভোটের ছড়াছড়িসহ নির্বাচনে জালিয়াতি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় ব্যাপক শিরোনাম হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে নির্বাচনের প্রতি এক ধরনের অনীহা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের জনমনে। এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, মসজিদের মাইকে ডেকেও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়নি। এসব কারনে আওয়ামী?লীগের গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। দেশ এক দীর্ঘ গণতন্ত্রহীনতার দিকে এগোচ্ছে বলেও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন।
অপরদিকে, দলীয় শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি না করতে পারা এমনকি দলীয় নিবন্ধন বাতিল জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের বৃটেন সফরে আসা নিয়েও নতুন গুঞ্জন শুরু হয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, সবদিক থেকে কোনঠাসা জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বিদেশ সফরে সরকার অনুমতি দিলো কীভাবে। অনেকে মনে করছেন, বিএনপির সাথে গাঁটছাড়া এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড না করে নিস্ক্রীয় থাকার পাশাপাশি সরকার কিংবা আওয়ামী?লীগের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রচারণা না চালানোর শর্তেই হয়তো আওয়ামী?লীগ সরকার জামায়াতের এই নেতাকে বিদেশ সফরে অনুমতি দিয়েছে। সরকারের সাথে সত্যি এমন কোনো আঁতাত বা সমঝোতা হয়েছে কী না সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, মানুষ কে কী মনে করে সেটা তাদের বিষয় কিন্তু সরকারের সাথে আমাদের কোনো আঁতাতের প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া দলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সংস্কারপন্থীদের নতুন দল গঠনের ব্যাপারে কোনো কথাই বলতে চাননি তিনি। প্রায় দুই সপ্তাহ খুবই গোপনীয়তার সাথে বৃটেন সফর করে গেলেন জামায়াতের এই নেতা। বুধবার সুরমার পক্ষ থেকে তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে কোনো বিষয়েই কোনো কথা বলতে রাজী না হলেও অনেক পীড়াপীড়িতে সংক্ষেপে উপরোক্ত মন্তব্য করেন এবং এদিনই দেশে চলে যাচ্ছেন বলে জানান এবং তা একান্ত ব্যক্তিগত সফর বলে উল্লেখ করেন।

সর্বশেষ সংবাদ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: