12

Sunday, 26 February, 2017 | ১৪ ফাল্গুন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
মহাজনপট্টি থেকে ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার  » «   ওসমানীনগরে নির্বাচনী সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৩০  » «   ফুলকলিতে মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্য, ২০ হাজার টাকা জরিমানা  » «   ‘আমার ফাঁসি হোক, ‘সুখী হও খাদিজা,  » «   সিলেটবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেন বেঙ্গলের লিটু  » «   বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ১ মার্চ  » «   বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে গেছেন খাদিজা  » «   লিবিয়ায় নির্যাতন ইমোতে দেখিয়ে পণ দাবি  » «   লেবানন গিয়ে নবীগঞ্জের এক যুবতি নিখোঁজ: গ্রেফতার ২  » «   বেঙ্গল চেয়ারম্যান লিটুর মন্তব্যে ক্ষুব্ধ সিলেটবাসী  » «   বেঙ্গল চেয়ারম্যান লিটুকে সিলেটবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান  » «   ড.মোমেনকে সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের অভিনন্দন  » «   প্রয়াত সুরঞ্জিতের আসনে জাসদের প্রার্থী আমিনুল  » «   চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন ড. অাব্দুল মোমেন  » «   খালেদা জিয়া জঙ্গিবাদীদের ইন্ধনদাতা : সিলেটে তথ্যমন্ত্রী  » «  





বঙ্গবন্ধুর নীতির আলোকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের এগিয়ে চলার ধারাবিবরণী

w1এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : সকল ফোরামে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব-কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিতে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কমিটি সমূহে বাংলাদেশের মতামত প্রাধান্য পাচ্ছে। নানা প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে সমগ্র জনগোষ্ঠিকে উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবিত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অনুকরণীয় উদাহরণে পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রায় সবগুলো ফোরামে। ইংরেজী নতুন বছরেও সে ধারা অব্যাহত থাকবে।
নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন এসব তথ্য উপস্থাপন করেন।
জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব এ্যান্তোনিও গুতেরেসকে বাংলাদেশ সফর করানোর পরিকল্পনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে স্থায়ী প্রতিনিধি মোমেন বলেন, ‘নতুন মহাসচিব বাংলাদেশ সম্পর্কে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ওয়াকিবহাল আছেন। তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক প্রধান হিসেবে এর আগে বাংলাদেশ সফর করেছেন। মহাসচিবকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বার্তার জবাবে তিনি চমৎকার উত্তর দিয়েছেন।’ তাঁকে বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে এবং এই লক্ষ্যে মিশন কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘকে ‘ক্লাব’ বলে অভিহিত করেন। এ ধরনের বক্তব্যে সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান কী-এমন এক প্রসঙ্গে মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্ধারিত নীতি আছে। এ নীতির ওপর ভর করে এগোব। বহুপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব অবস্থানে থাকবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই পথ দেখিয়ে গেছেন।’
রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভূমিকা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, ‘মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক তথা নিকট প্রতিবেশী সকল রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক অটুট রেখেই উদ্ভূত পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসী বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে।’
৪ জানুয়ারি বুধবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে ‘মিডিয়ার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়’র এ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (প্রেস) নূরএলাহি মিনা।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভূমিকার আলোকে মাঝেমধ্যেই মিডিয়ার সাথে মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে বছরের শুরুতেই তা করা হলো। প্রায় সবকটি মিডিয়ার প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন এ অনুষ্ঠানে।
গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের মধ্য দিয়ে সূচিত কূটনৈতিক তৎপরতার ধারাবাহিকতা হিসেবে গত ৩ মাসে বাংলাদেশের ভূমিকা সবিস্তারে উপস্থাপন করেন মিশনের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি তারেক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কন্সাল জেনারেল শামীম আহসানও শুভেচ্ছা বক্তব্যে জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশন ও কন্স্যুলেটের ভূমিকার আলোকপাত করেন। দেশ এবং প্রবাসীদের কল্যাণে পরস্পরের সহযোগী হয়ে কী কর্মযজ্ঞ চলছে তাও সবিস্তারে উপস্থাপন করেন স্বল্পভাষী এই কূটনীতিক।
এ সময় সেখানে আরো ছিলেন মিশনের কাউন্সিলর এ টি এম রকিবুল হক, কাউন্সিলর ফৈয়াজ মুরশিদ কাজী, কাউন্সিলর সঞ্চিতা হক।
কূটনৈতিক তৎপরতার আলোকে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বলেন, ‘একাত্তরতম সাধারণ অধিবেশনের শীর্ষ সম্মেলনসমূহে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের সাথে প্যানেলিস্ট অথবা সহ-আয়োজক হিসেবে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এর মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার বৈশ্বিক নেতৃত্বের স্পষ্ট একটি স্বীকৃতি ঘটেছে বলে সকলে মনে করছেন। এটি সকলেই জানি যে, নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য ইউএন উইমেন এর ‘প্ল্যানেট ফিফটি ফিফটি চ্যাম্পিয়ন’ এবং গ্লোবাল পার্টনারশীপ ফোরামের ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও অর্জন করেন ‘আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট এওয়ার্ড’। ডিজিটাল বাংলাদেশ ধ্যান-ধারনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবন-মানের সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটছে বলেই জয়কে এই সম্মানে ভূষিত করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।
উপস্থায়ী প্রতিনিধি তারেক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষতা ও উৎকর্ষের জন্য আমাদের ট্রুপস ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত। গত বছর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর সাইপ্রাসে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর ফোর্স কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমরা সাউথ সুদানে ৮৫০ জনের একটি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন এবং ২৬০ জনের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি প্রেরণ করতে যাচ্ছি। তাছাড়া মালিতে আমরা ১৮০ জনের পুলিশ ইউনিট পাঠাতে যাচ্ছি। এখন শান্তিরক্ষী প্রেরণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। তা সত্ত্বেও আমাদের কাছ থেকে আরও শান্তিরক্ষী নেয়ায় জাতিসংঘের এ আগ্রহ শান্তিরক্ষায় আমাদের ঈর্ষনীয় সাফল্যেরই স্বীকৃতি। তাছাড়া পীচ বিল্ডিং কমিশনে বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ দেশসমূহের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে জাতিসংঘের পীচবিল্ডিং আর্কিটেকচারে গঠনমূলক অবদান রাখছে।’
এ সময় জানানো হয়, গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের ‘শান্তির সংস্কৃতি’ শীর্ষক বার্ষিক রেজুলেশন-টি সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়ে আসছে। গত বছর বাংলাদেশ এই রেজুলেশনে ১০২ টি সদস্য রাষ্ট্রের কো-স্পন্সরশিপ সংগ্রহ করে, যা জাতিসংঘের প্রেক্ষাপটে কোন ইস্যুতে বৃহত্তর সহমত সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি বিরল নজির। এই ফ্ল্যাগশিপ রেজুলেশনের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করছে।’
সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ নির্মূলে প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে গৃহিত ব্যাপক সমন্বিত পদক্ষেপ জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সক্রিয় অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের সাথে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। নিরাপত্তা পরিষদের কাউন্টার টেররিজম এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরেটের সঙ্গেও বাংলাদেশ একযোগে কাজ করছে।
২০১৬ সালে নিরাপত্তা পরিষদে বিভিন্ন বিষয়ে মাসিক যে উন্মুক্ত সভা হয় তার প্রায় সবগুলোতেই বাংলাদেশ নিয়মিত অংশগ্রহণ ও বক্তব্য প্রদান করছে। বিশ্বশান্তি রক্ষার্থে জাতিসংঘে ‘আউস্ট্যান্ডিং পীচ’ নামে একটি নতুন কনসেপ্ট গৃহীত হয়েছে। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শরিক দেশসমূহের পক্ষ হতে বাংলাদেশ এটির নেগোসিয়েশনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।
এছাড়াও বাংলাদেশ বিভিন্ন নন-ট্রেডিশনাল এবং নতুন নতুন নিরাপত্তার ঝুঁকি যেমন, সাইবার সিকিউরিটি, স্প্যাস সিকিউরিটি, মেরিটাইম সিকিউরিটি, নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি বিষয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে বেশী করে সম্পৃক্ত হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘সদস্য না হলেও নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন সদস্য দেশসমূহের সহায়তায় বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক রেজুলেশন যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ নিহিত আছে যেমন, পীচকিপিং, কাউন্টার-টেররিজম, নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন সেগুলোতে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট ছিলাম। শান্তিরক্ষায় নিরাপত্তা পরিষদ ও ট্রুপ ও পুলিশ কন্ট্রিবিউটিং রাষ্ট্রসমূহের বিভিন্ন সভায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি।’
‘স্বল্পোন্নত দেশসমূহের সভাপতি হিসাবে এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জাতীয় স্বার্থকে মাথায় রেখে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রেজুলেশনে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং সেগুলোতে আমাদের প্রয়োজনীয় বিষয়াদির সন্নিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে’-উল্লেখ করেন উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সভাপতি হিসেবে টেকনোলজি ব্যাংক স্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এ ব্যাংক জাতিসংঘের সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশসমূহে টেকনোলজির ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ ধ্যান ধারণার আলোকে স্বল্পোন্নত দেশেও সে কার্যক্রম আরো জোরালোভাবে সম্প্রসারণ করার অভিপ্রায়ে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ফোরামে বাংলাদেশ নীতি-নির্দ্ধারণী ভূমিকায় ছিল বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ।
জানানো হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তার জন্য জাতিসংঘের একটি ডেভেলপমেন্ট সিস্টেম আছে। এ সিস্টেম রিভিউ এর জন্য প্রতি চার বছর অন্তর একটি রেজুলেশন গৃহীত হয়। এটি ‘চতুর্থ বার্ষিক কমপ্রিহেনসিভ পলিসি রিভিউ’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ এ বছর কিউসিপিআর রেজুলেশনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ ডেলিগেশন এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রেজুলেশনে অন্তর্ভূক্ত করেছে যাতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ জাতিসংঘের ডেভেলপমেন্ট সিস্টেম থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ সুবিধা পায়।
অভিবাসন ইস্যুতে জাতিসংঘে বাংলাদেশ অন্যতম প্রবক্তা। গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর চেয়ার হিসাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে সুষ্ঠু অভিবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ২০১৬ সালে নিউইয়র্কস্থ জাতিসংঘ সদর দপ্তরসহ জেনেভা এবং ব্যাংকক-এ বিভিন্ন থিমেটিক ওয়ার্কশপ এবং ডায়ালগ আয়োজন করে। তাছাড়া গত ১০-১২ ডিসেম্বর ঢাকায় নবম জিএফএমডি সামিট সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। সুষ্ঠু অভিবাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশী অভিবাসীদের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় উন্নয়নকে বেগবান করতে এ বছরই বাংলাদেশ জাতিসংঘে ‘গ্লোবাল কম্প্যাক্ট ফর মাইগ্রেশন’ এর ধারণাকে প্রথমবারের মত উত্থাপন করে। এই ধারণার সমর্থনে নেগোসিয়েশন চলছে এবং বাংলাদেশ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ।
এছাড়া বাংলাদেশের উদ্যোগে সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে নিয়ে নিউইয়র্ক ও জেনেভায় ‘ফ্রেন্ডস অব মাইগ্রেশন গ্রূপ’ তৈরী হয়েছে, যার মাধ্যমে এই মিশনের কর্মকর্তারা সারা বছরই সুষ্ঠু অভিবাসন নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে জানানো হয় এ সময়।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে অভিবাসন ও রিফিউজি বিষয়ে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের নিয়ে ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন’ গৃহীত হয়।
গত বছর এসডিজি সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আলোচনায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আসছে জুলাইতে অনুষ্ঠিত হবে এসডিজি বাস্তবায়নের উপরে ২য় বারের মত ‘ন্যাশনাল ভলান্টারি রিভিউ’ । এতেও বাংলাদেশ অংশ গ্রহণ করবে এবং জাতীয় পর্যায়ে এসডিজি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে যে সকল উদ্যোগ ও সমন্বয়-কর্মকান্ড চলমান রয়েছে সে বিষয়ে বিশ্বকে অবগত করবে। বাংলাদেশের এই অংশগ্রহণ জাতিসংঘের অনেক সদস্য রাষ্ট্রের জন্যই অনুকরণীয়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস প্রসঙ্গে জানানো হয়, ঐতিহাসিক প্যারিস এগ্রিমেন্ট র‌্যাটিফাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রথম সারির দেশ। গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ চুক্তিটির র‌্যাটিফাই করে এবং ২১ সেপ্টেম্বর ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব র‌্যাটিফিকেশন’ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ে সারা বছর জাতিসংঘে যে কার্যক্রম চলেছে, তাতে বাংলাদেশ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে বলেও উল্লেখ করেন উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি।
ব্লু ইকোনমি সম্পর্কে বলেন, ‘এটি বর্তমান সরকারের প্রাধিকারভূক্ত একটি খাত। সমুদ্র এবং সমুদ্রের সম্পদের সর্বাত্মক ব্যবহার নিয়ে জাতিসংঘে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। আমরা এতে আমাদের তথা উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছি।’
মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন সভা ও ইভেন্টেও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সকলের দৃষ্টি কেড়েছে বলে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতিসংঘে ৯ ডিসেম্বর “দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস” উদযাপনে আমরা অংশগ্রহণ করি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে গণহত্যা এবং মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, বিশ্বে এর পুনরাবৃত্তি রোধে আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সংক্রান্ত জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমর্থন প্রদান করে আসছি।’
‘নারীর ক্ষমতায়ন, মানব পাচার, শিশু ও যুবকদের কল্যাণে বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকার ও অর্জিত সাফল্যের ভিত্তিতে আমরা জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা রাখছি। নারীর ক্ষমতায়নের উপর আমরা বিশেষভাবে কাজ করছি। অন্যান্য মিশন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা আমাদের অভিজ্ঞতা জানতে আমাদেরকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়, যা আমাদের ভাবমূর্তি উন্নয়নে বিশেষ কার্যকর ছিল। জাতিসংঘে গতবছর অভিবাসীদের পাশাপাশি শরণার্থিদের নিয়েও অনেক কাজ হয়েছে এবং আমরা এতে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছি’-বলেন রাষ্ট্রদূত।
প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল, যিনি বাংলাদেশে অটিজম সম্পর্কিত জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারপারসন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত উপদেষ্টা মন্ডলীর অন্যতম সদস্য, গত বছর ১ এপ্রিল জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস-২০১৬’ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ও কাতারের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চ পর্যায়ের ইভেন্টে মূল বক্তা ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া ইভেন্ট-টি কো-স্পন্সর করে। তাছাড়া গত ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আরো ১০টি দেশের সাথে জাতিসংঘে প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এগুলো অটিজম ও ডিজঅ্যাবিলিটি বান্ধব ব্যবস্থা বিনির্মানে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় অঙ্গিকারের পরিচয় বহন করে। এছাড়াও বাংলাদেশ এইচআইভি/এইডস, এন্টি-মাইক্রোবাইয়াল, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল অসুখ নিয়ে জাতিসংঘের পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমে ঘনিষ্ঠভাবে অংশগ্রহন করেছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়। উচ্চপদে নির্বাচিত হবার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতার পরিচয় বহণ করে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে (ক) ৭১তম সাধারণ পরিষদের ভাইস-প্রেসিডেন্ট, (খ) প্রেসিডেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল সী বেড অথরিটি, (গ) ইন্টারন্যাশনাল সিভিল সার্ভিস কমিশনের মেম্বার বাংলাদেশের মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন (বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাবেক গভর্ণর এ পদে নির্বাচিত হন), (ঘ) ইউএন পেনশন কমিটি। এছাড়া, বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য। ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নেরও সভাপতি। বাংলাদেশ জাতিসংঘের বিভিন্ন অংগ-সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছে। এর অন্যতম হচ্ছে, ইকসোক-এর কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কমিশন: সিএসডব্লিউ, কমিশন ফর সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট, সিপিডি।
জাতিসংঘের কতিপয় বিশেষায়িত সংস্থা যেমন, ইউনিসেফ, ইউনেস্কো, ইউএনহ্যাবিটেট, ওপিসিডব্লিউ, ডব্লিউএফপি, সিপিসিতেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে।
মানবাধিকার কমিশনের আওতাধীন কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় বিগত বছরে বাংলাদেশের ভূমিকা সমাদৃত হয়েছে। এর অন্যতম হচ্ছে সিডো এবং সিএমডব্লিউ, পোস্টাল অপারেশন কাউন্সিল, আইএমও, আইটিইউ, আইএলও এবং এসএসসি ।
গত বছর বাংলাদেশ কর্তৃক উত্থাপিত ‘ইন্টার‌্যাকশন বিটুইন দ্য ইউনাইটেড নেশন্স, ন্যাশনাল পার্লামেন্ট এ্যান্ড দ্য আইপিইউ’ শীর্ষক রেজ্যুলেশনটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুসংহত করতে আনীত এই রেজ্যুলেশন প্রায় ১০০টি সদস্য রাষ্ট্র কো-স্পন্সর করেছিল।
জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশ মিশন পেরু, গুয়াতেমালা এবং এল সালভাদরের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়েও দায়িত্বপ্রাপ্ত। এল-সালভাদর এর সাথে গত অক্টোবর হতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এছাড়া গুয়াতেমালায় একজন অনারারি কনসাল নিযুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানানো হয়।
জাতিসংঘে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবসমূহের প্রতি সদস্য-রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্যে বাংলাদেশকে সমন্বয়কারির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হতে হয় অধিকাংশ সময়েই। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের বিশেষ গুরুত্বের প্রকাশ ঘটে বলে কূটনীতিকরা উল্লেখ করেন। ‘যে কোন দেশের জন্য এটি একটি বিশেষ সম্মানের কাজ। এ বছর আমরা ইউএন মেডিটেশন ফাঙ্শন, সিয়েরা লিয়নে স্পেশাল কোর্ট স্থাপন এবং শান্তির সংস্কৃতি-এই তিনটি রেজ্যুলেশনের ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমরা এলডিসি রেজ্যুলেশনের সমন্বয়ক হিসাবেও কাজ করেছি’-জানান রাষ্ট্রদূত মাসুদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

Developed by: