Saturday, 29 April, 2017 | ১৬ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
Advertisement

বিশ্বকে যে বার্তা দিয়ে গেলেন ওবামা

w1রায়হান আহমেদ তপাদার: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।এর মাধ্যমে দুই মেয়াদে থাকা বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ৮ বছরের সময়কালের পরিসমাপ্তি ঘটবে।প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিদায়ের ৯ দিন আগে মঙ্গলবার তিনি জাতির উদ্দেশে শিকাগোতে শেষ ভাষণ দেন।এ ভাষণে ওবামা তার সময়কার সাফল্য,যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি, গণতন্ত্র,ঐক্য ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথা বলেন।বিদায়ী ভাষণ দিতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হন ওবামা।যা বলা চলে,আগে কোনো ভাষণে দেখা যায়নি।আমেরিকানদের সতর্ক করলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মঙ্গলবার তিনি শেষ ভাষণ দেন।এতে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ ও জাতীয়তাবাদের বিষয়ে তিনি হুঁশিয়ার করে দিলেন মার্কিন ভোটারদের।এ সময় তিনি বর্তমান বিশ্বে যেসব জটিল সমস্যা রয়েছে সে দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বরাবরের মতোই তিনি এদিনও ছিলেন দৃপ্তকণ্ঠের বক্তা। আগামী ৮ই নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এতে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্প।তার নাম উল্লেখ না করেই তার বাণিজ্য,অভিবাসন,বহুত্ববাদ সহ তুলে ধরেন।নির্বাচনে যদি ‘আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘অশোধিত জনপ্রিয়তা’বিজয়ী হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য যে ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে তার একটি অন্ধকারময় চিত্র তুলে ধরেন বারাক ওবামা।ডনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় মেক্সিকো সীমান্তে যে দেয়াল নির্মাণের কথা বলেছেন, সীমান্ত নিরাপত্তার কথা বলেছেন সে বিষয় তুলে ধরেন তিনি।ট্রাম্পের ওই প্রস্তাবের সমালোচনা করে ওবামা বলেন,একটি জাতি যদি দেয়াল দিয়ে চারদিক থেকে নিজেকে আবৃত করে তাহলে তার মধ্য দিয়ে সে শুধু নিজেকেই বন্দি করবে।এ সময় বারাক ওবামা পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ে গোলার আহ্বান জানান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন,রাজনীতিবিদ রা মুসলিমদের কটাক্ষ করলে তা আমাদের নিরাপদ করে না।যখন একটি মসজিদে হামলা হয় বা কোনো শিশু নিপীড়নের শিকার হয় তখন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।’স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে জাতির উদ্দেশে শেষ ভাষণ (স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অ্যাড্রেস) দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসব কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন রাজনীতি পরিহার করতে হবে,যা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ধর্মকে আঘাত করে।এ বিষয়গুলোয় আসলে রাজনৈতিক সংস্কারের কোনো প্রয়োজন নেই।এগুলো বোঝার বিষয়।শান্তির কথা বলেন, যেমনটা তিনি এর আগে জাতিসংঘের ভাষণে বলেছিলেন। সময় এবং মানবজাতি এমন একটি পর্যায়ে এসেছে যেখানে বার বার যুদ্ধ ও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হয়তো এটাই আমাদের পরিণতি। ওই ভাষণে ওবামা ঘোষণা করেন ৫০ টি দেশ এ বছর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর ৩ লাখ ৬০ হাজার শরণার্থীকে নেয়ার অঙ্গীকার করেছে। তিনি আরও বলেন, জার্মানি, কানাডা সহ বিশ্ব নেতারা গত বছরের চেয়ে দ্বিগুন শরণার্থী নিতে চেয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে যুদ্ধ অথবা নির্মমতার শিকার হয়ে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়েছে। এর মধ্যে ৬ বছরের যুদ্ধকবলিত সিরিয়ারই রয়েছে ৯০ লাখ মানুষ। বাকিরা যুদ্ধকবলিত অন্য দেশগুলো থেকে পালিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বারাক ওবামা বলেন, আমরা আমাদের চোখ বন্ধ করে রাখতে পারি না। পারি না পিছু ফিরতে। এসব বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর জন্য যদি আমরা দরজা বন্ধ করে দিই তাহলে আমাদের গভীরে যে মূল্যবোধ রয়েছে তার সঙ্গে প্রতারণা করা হবে।২০১৭ আর্থিক বছরে নতুন এক লাখ ১০ হাজার শরণার্থী নিতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।এ প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে ১লা অক্টোবর থেকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন,সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন দিয়ে রাশিয়া কৌশলগত ভুল করেছে।সিরিয়ার এই যুদ্ধ তার ও পুতিনের মধ্যকার কোন প্রতিযোগিতার বিষয় নয়।সম্প্রতি সিরিয়া নিয়ে মার্কিন সিদ্ধান্তহীনতার যে অভিযোগ ওঠেছে তার জবাবে তিনি এ কথা বলেন বলে এএফপি জানিয়েছে।মঙ্গলবার ওবামা বলেন,এটা আমার ও পুতিনের মধ্যকার কোনো প্রতিযোগিতা নয়।’তিনি বলেন, রাশিয়াকে যে প্রশ্নটি করা উচিত তা হলো,তারা কি মনে করছে যে তারা একটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশে কয়েকশ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করে বিজয়ী পক্ষের মিত্র হিসেবে খুব বড় কিছু অর্জন করতে পারবে?তিনি আরো বলেন,‘পুতিন মনে করে থাকতে পারেন যে তিনি রুশ সৈন্যদের সহায়তায় সিরিয়াকে স্থায়ীভাবে দখল করার মতো প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।কিন্তু এর জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হবে।দেশটির তিন চতুর্থাংশ এলাকা আসাদের নিয়ন্ত্রণে নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।ওবামা বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত অস্ত্রবিরতি কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।এর জন্যে পুতিনই অনেকটা দায়ী।সিরিয়ায় এক সপ্তাহের মধ্যে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।প্রসঙ্গত,২০১৩ সালে সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল মার্কিন সিনেটের সমর্থন না পেয়ে শেষ মুহূর্তে এসে তা বাতিল করে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা।এ নিয়ে মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়া সম্মেলনে ফ্রান্স অভিযোগ করার পর আত্মপক্ষ সমর্থন করে এসব কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।আসলে বুধবার পর্যন্ত আমেরিকার শিকাগোতে বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস ছিল না।তবে শিকাগোতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেওয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে বারাক ওবামার বিদায়ী আবেগময় ভাষণে ওবামার পরিবার,উপস্থিত জনতা ও গোটা দেশের মানুষের চোখ দিয়ে অশ্রু বর্ষিত হচ্ছিল।বারাক ওবামা কেবল মিশেল শব্দটি উচ্চারণ করছিলেন;উপস্থিত জনসমুদ্র তাতে স্বতঃস্ফূর্ত জয়ধ্বনির মাধ্যমে ফার্স্ট লেডিকে অভিবাদন জানায়।
উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে ওবামা বলেন,‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আট বছর পার করেছি।আমি আমার দেশ এবং দেশের মানুষের উন্নয়নের কথাই সব সময় ভেবেছি।তিনি আরো বলেন,‘আমি সব সময় সব বিষয়ে ইতিবাচক ছিলাম, সবাই যেখানে ব্যর্থ ছিল সেখানে আমি আশার আলো জাগিয়েছি।আমি মার্কিনদের চাকরির ক্ষেত্রে প্রসার ঘটিয়েছি।দেশে বেকারের সংখ্যা হ্রাস করেছি।দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছি।আমি আশা করব শরণার্থী ইস্যুতে আমাদের যে অবস্থান রয়েছে তা ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে।২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘আমি জানি এটা নির্বাচনের মৌসুম।আর এটা প্রত্যাশার সময় যে ভবিষ্যত সময়ে আমরা কি পাবো।গত বছরের শেষের দিকে বাজেট এবং ট্যাক্স সংক্রান্ত কাজে গঠনমূলক পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য মাননীয় স্পিকার এবং অন্যান্য নেতাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি আশা করি আমরা সবাই মিলে সামনের সময়গুলোতেও একত্রে কাজ করতে পারব।তিনি আরো বলেন,‘আজ রাতে আমি সামনের দিনগুলোর জন্য সহজ কিছু প্রথাগত প্রস্তাবের তালিকা জানাতে চাই।চিন্তার কিছু নেই।আমি রোগীদের চিকিৎসার সুব্যবস্থার জন্য কম্পিউটার কোডকে পার্সোনালাইজ করে ব্যবহারের পদ্ধতি ছাত্রদের শিখতে সাহায্য করেছি এবং উন্নয়নের জন্য যেসব কাজ করা প্রয়োজন সেগুলো চালিয়ে যাব।অভিবাসন পদ্ধতির জন্য একটি নির্ধারিত পদ্ধতি, আমাদের শিশুদের বন্দুক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা,কাজ ও বেতনের মধ্যে সমতা, বেতনভোগী ছুটি,ন্যূনতম মজুরিসহ বিভিন্ন কঠিন কাজগুলো একত্রে সমাধান করতে হবে।আর এগুলোই এখনও সবার মৌলিক অধিকার বলে গুরুত্ব দিতে হবে।এই কাজগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি হাল ছাড়ছি না।ভাষণে ওবামা ভবিষ্যতের প্রতি জোর দিয়ে বলেছেন,‘কিন্তু আমার এই শেষ ভাষণে আমি শুধু সামনের বছরের কথা বলতে চাই না।বরং আমি পরবর্তী পাঁচ বছর,দশ বছর বা তারও পরের সময়ের প্রতি জোর দিতে চাই।
আসলে আমি ভবিষ্যতের ওপরই বেশি আলোকপাত করতে চাই।ভাষণের এক পর্যায়ে ওবামা বলেছেন, আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নয়। তিনি আরো বলেছেন,সন্ত্রাস এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে মার্কিনদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।তাদের ভবিষ্যত নিয়ে ভয় পাওয়া কিছু নেই।কেননা দেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।আর আমি আমার প্রচেষ্টায় বন্দুক আইনের ওপরও জোর দিয়েছি।আমি এদেশে বন্দুক সংক্রান্ত সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে চাই যেন সন্ত্রাসীরা অবাধে বন্দুক কেনা বেচা-কেনা করতে না পারে।ভাষণে ওবামা আরো বলেন,‘আইএস এবং আল কায়েদা জঙ্গি সংগঠনের জন্য আফগানিস্তান এবংপাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক দশক ধরে অস্থিরতা চলতেই থাকবে।নিজের শেষ ভাষণে ওই দুই জঙ্গি গোষ্ঠীকে সরাসরি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন ওবামা।তিনি বলেন,‘আইএস এবং আল কায়েদা উভয়ই বর্তমান বিশ্বে আমাদের লোকজনের জন্য হুমকি স্বরুপ।তাদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই।তারা নিজেদের জীবনেরও পরোয়া করে না।তারা বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করতে পারে।তারা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সহজ-সরল মানুষদের মনের ওপর প্রভাব খাটাচ্ছে। আর এদের দিয়ে মানুষ হত্যার মত জঘন্য কাজ করাচ্ছে।তিনি আরো বলেন,‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আইএস এবং আল কায়েদার হুমকির বিষয়টিকেও আলোকপাত করতে হবে।আইএস ও আল কায়েদার কারণে মধ্য প্রাচ্য, আফগানিস্তান,পাকিস্তান,মধ্য আমেরিকা,আফ্রিকা এবং এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই অস্থিরতা কয়েক দশক ধরে চলতে থাকবে।আর এ কারণে এসব স্থান সন্ত্রাসীদের জন্য নতুন নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতে পারে।
————–
রায়হান আহমেদ তপাদার
লেখক ও সাংবাদিক,যুক্তরাজ্য
raihan567@ yahoo.co.uk

Developed by: