12

Thursday, 23 February, 2017 | ১১ ফাল্গুন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
সুস্থ খাদিজা এখন বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়  » «   বিএনপি সন্ত্রাসী সংগঠন: কানাডার আদালত  » «   ডিজিটালের ছোয়া লাগেনি সিলেট সাবরেজিস্ট্রি অফিসে  » «   নিরাপত্তা হেফাজতে সিলেটের আবিদা  » «   বাংলাদেশ উন্নতির মহাসড়কে এগিয়ে চলেছে:অর্থমন্ত্রী  » «   নিবন্ধন নিয়ে সিলেটে বনপার জরুরী সভা  » «   সৌদি থেকে ফিরলেন নবীগঞ্জের সেই ‘গৃহকর্মী’  » «   বিআরটিএ অফিসে দুদক আতঙ্ক!  » «   যুক্তরাষ্ট্রে যেতে দেওয়া হলো না বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিককে  » «   সিলেটে দশদিনব্যাপী বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসব শুরু হচ্ছে আজ  » «   চুরি হতে পারে আপনার আঙুলের ছাপ!  » «   এ কেমন শ্রদ্ধা?  » «   আরিফুল হক চৌধুরীকে নিয়ে সিসিক কাউন্সিলরদের শ্রদ্ধা নিবেদন  » «   কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন  » «   বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানুষের ঢল  » «  





রাশিয়া-তুরস্ক বৈরী সম্পর্ক

w1রায়হান আহমেদ তপাদার: সাম্প্রতিক তুরস্কে রাশিয়ান কূটনীতিককে হত্যা নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বেশ চটেছেন তুরস্কের ওপর।তবে কোনো দেশের কূটনীতিক হত্যার মতো ন্যক্কারজনক কাজ আর হতে পারে না।প্রকৃতপক্ষে-রাশিয়া তুরস্ক তাদের ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে পরস্পর বৈরী প্রতিবেশি।শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দুদেশ নিজেদের আঞ্চলিক প্রাধান্য বজায় রাখতে তৎপর রয়েছে।তবে এক্ষেত্রে একটি বৃহৎ পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়ার প্রাধান্য বজায় থাকলেও মাঝে মধ্যে তুরস্কও রাশিয়াকে চরমভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে।তুরস্ক ন্যাটোভুক্ত দেশ বলেই ব্যাপারটি অনেক সময় আমেরিকা-রাশিয়া পর্যন্ত গড়িয়েছে।এর মধ্যে যে সময়টা ব্যতিক্রম ছিল সেটি হলো গত আড়াই দশককাল।এ সময় স্নায়ুযুদ্ধ না থাকায় দুই প্রতিবেশি পরস্পরের স্বার্থে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছে একে অন্যের কাছাকাছি আসার।এতে দু’দেশের মধ্যে গড়ে ওঠেছে ব্যাপক বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্পর্ক।এক দেশের নাগরিকরা অন্যদেশে যেতে পারতো কোনো ভিসা ছাড়া।কিন্তু এ সম্পর্কে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপে।সিরিয়ায় রাশিয়ান সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থ যেমন রয়েছে তেমনি পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে তুরস্কেরও রয়েছে কৌশলগত স্বার্থ।তবে দু স্বার্থের মধ্যে নানা কারণে সংঘাত ও বিপরীতমুখিতা আস্থার সম্পর্কে কালোছায়া বিস্তার করে।এ অবস্থার বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে কিছুদিন আগে তুর্কী আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে তুরস্কের রুশ বিমান-ভূপাতিত করার ঘটনা।এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন।অবশ্য পরবর্তীতে তুরস্ক এমন ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিল।তখন তুরস্কের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের সম্ভাবনা রুশ নেতারা নাকচ করে দিলেও অর্থনৈতিক খাতে যে সঙ্ঘাত শুরু হয়েছে,তাতে সামরিক সংঘাত বাধার পথে বড় কোনো রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বাধা নাও দাঁড়াতে পারে।

তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যকার এ উত্তেজনা কিন্তু শিগগিরই প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।যদিও দুই পক্ষই বলছে,কূটনৈতিক সমাধানের জন্য কাজ করতে চান তারা।মনে রাখতে হবে,এর পাশাপাশি কিন্তু সামরিক পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে সমানতালে। এরই মধ্যে সিরিয়ায় থাকা সামরিক ঘাঁটিতে নিজেদের সবচেয়ে উন্নত মিসাইল ব্যবস্থা এস-৪০০ মোতায়েন করেছে রাশিয়া।এতে আকাশসীমায় নজরদারি ও হামলা করা এখন রুশ বাহিনীর জন্য অনেক সহজ হবে।এছাড়া বাশার আল-আসাদের বিদ্রোহীদের ওপর রুশ বিমান হামলাও আরো জোরদার হবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।অন্যদিকে ন্যাটো ও পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় তুরস্কও জবাব দিতে প্রস্তুত।প্রকৃতপক্ষে এটি এখন হয়ে উঠেছে দুই দেশের পেশি শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র।যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো অনেক বিশ্বশক্তির নানা স্বার্থের সমীকরণ অন্যদিকে ইরাক সীমান্তে ট্যাংক এবংআর্টিলারি মোতায়েন করে তুরস্ক।সীমান্তে তুর্কি সেনাবাহিনীর ট্যাংক মোতায়েন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে তুরস্ক ও ইরাক।মঙ্গলবার তুরস্ককে রীতিমতো যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি।বুধবার এর কড়া জবাব দিয়েছেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসোগলু।জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের ঘাঁটি ইরাকি শহর মসুল উদ্ধার অভিযান ঘিরে দেশ দুটির মধ্যে এ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।অভিযানের অংশ হিসেবে তুরস্ক দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সিরনাক’র সিলোপলি জেলার ইরাক সীমান্তে ট্যাংক এবং আর্টিলারি মোতায়েন করে।মসুল উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে এটা করা হয়েছে বলে দাবি তুরস্কের।কিন্তু তুরস্কের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে বাগদাদ। তারা মসুল শহরের কাছে মোতায়েন করা সেনা প্রত্যাহারের জন্য বার বার দাবি জানিয়ে আসছে।হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী বলেন,’ইরাকে আগ্রাসন তুরস্ককে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। তবে আমরা তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ চাই না, সংঘাত চাই না।

তিনি আরও বলেন,’সংঘাত সৃষ্টি হলে আমরা এর জন্য প্রস্তুত রয়েছি।আমরা তুরস্ককে শত্রু মনে করি এবংশত্রু হিসেবেই বোঝাপড়া করবো।ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন,তুরস্কের চেয়ে ইরাকিদের এমন শক্তিশালী কোনো সমর্থক নেই, যে ইরাকের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা সুরক্ষা করতে চায়।নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় ইরাকের সামর্থ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যদি তোমার (ইরাক) সামর্থ থাকে,তাহলে শুরুতেই সন্ত্রাসী সংগঠনের হাতে মসুল রেখে কেন পালিয়েছ? পিকেকে সন্ত্রাসীরা কিভাবে বছরের পর বছর তোমার ভূমি দখল করে রেখেছে?’তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা আগেই তুর্কি কর্মকর্তারা বলেছিলেন।এখন সেই ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে।এর আগে ইরাকে মোতায়েনকৃত তুর্কি সেনাদের প্রত্যাহার নিয়ে বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইয়িপ এরদোগান এবং ইরাকি প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি।অপরদিকে থার্টি ফাস্ট নাইটে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে নাইটক্লাবে হামলার ঘটনায় প্রধান সন্দেহ ভাজনকে আটক করা হয়েছে। আটক হওয়া ৩৪ বছর বয়সী আবদুলকাদির মাশারিপভ একজন উজবেক নাগরিক।মঙ্গলবার বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে তাতে দেখা যাছে ধূসর রঙের টি-শার্ট একটি লোকের প্রচণ্ড মার খাওয়া মুখ।কেউ একজন তার গলা সামনের দিক থেকে ধরে আছে।আশঙ্কা করা হচ্ছিল এই বন্দুকধারী ব্যক্তি তুরস্কের আশেপাশে কথিত ইসলামিক স্টেট নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পালিয়ে যেতে পারে।নাইটক্লাবের ঐ হামলায় ৩৯ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হয়েছিল।ইসলামিক স্টেট ঐ হামলার দায় নিয়েছিল।পুলিশ বলছে,আবদুলকাদির নামে ব্যক্তিকে তার চার বছর বয়সী ছেলের সাথে পায় তারা।কিরগিজ এক বন্ধুর বাড়িতে আবদুল কাদির সে সময় ছিল।পুলিশ তার ঐ কিরগিজ বন্ধুর সাথে আরো তিনজন নারীকে আটক করেছে।

এই অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রয়োগের ব্যাপারে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ধারণা তুর্কি পণ্য ও অবকাশ যাপনের ওপর মস্কোর অবরোধ আরোপ রুশ পর্যটকদের কাছ থেকে বছরে সাড়ে ছয় বিলিয়ন ডলার আয়কারী তুরস্কের অর্থনীতিতে বেশ বড় ধরনের প্রভাবই ফেলবে।তবে প্রশ্ন হলো, সেটাই রুশ বিমান ভূপাতিত করার ফলে ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে সৃষ্ট ক্রোধ প্রশমনের জন্য যথেষ্ট কি না,নাকি এর পথ ধরে রাশিয়া তুরস্কের বিরুদ্ধে আরে কঠিন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।ইতিমধ্যে রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞরা তুরস্কের এমন আচরণ নিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের কথাও বলছেন।এ আশংকা আরো বদ্ধমূল হয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট যখন বলছেন তিনি বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করবেন না।প্রকৃতপক্ষে সিরিয়ায় পুতিনের সরাসরি জড়িয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ ছিল আসাদ সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা।তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার যে আইএসের কথা বলছেন তাদের দমানো যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারেনি,রাশিয়ার এমন হস্তক্ষেপের ফলে আমরা সিরিয়া থেকে এক ব্যাপক সংখ্যক আইএস যোদ্ধাদের পালিয়ে যেতে দেখেছি অপরদিকে আসাদও এখনও সিরিয়ায় টিকে আছেন।
বিষয়টি তুরস্ক সরকার ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি।কারণ তুরস্কের এরদোগান সরকার আমেরিকাপন্থি,অবশ্য তুরস্কে সাম্প্রতিক সামরিক বিদ্রোহের পর এরদোগান সরকার ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন যে এ বিদ্রোহের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল।তবুও ন্যাটোভুক্ত দেশ হওয়ায় তুরস্ক আমেরিকার বলয় থেকে সহজে বের হতে পারছে না। খুব সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই তুরস্ক রাশিয়ার সাথে বছরের পর বছর ধরে সাপে-নেউলে সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে।মূলত তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে কেবল দীর্ঘ বৈরী সম্পর্কই নয়,একই সাথে সীমান্ত, প্রক্সি,গোপন ও রাজনৈতিক সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।সপ্তদশ শতকে ককেসাসের খান ও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ,১৮ শতকে পোল্যন্ড নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং২০ শতক পর্যন্ত গড়ানো বলকান অঞ্চলে সাংস্কৃতিক ধর্মীয় সংঘাতে দেশ দু’টির মধ্যে প্রক্সিযুদ্ধ হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কয়েক দশক সময় ছিল দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সম্পর্ক গড়ার সময়।এ সম্পর্কের জন্য ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ইউক্রেন ইস্যুতে আঙ্কারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধে শামিল হয়নি।বর্তমানে রাজনীতি,গুপ্তচরবৃত্তি এমনকি অপরাধমূলক সম্পদরাজিকে একত্রে ব্যবহার করে বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করার ক্ষমতা মস্কোর আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে তা কোনো ভাবেই সোভিয়েত আমলের সে পর্যায়ে নেই।তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার আগের যে কোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশ জনপ্রিয় এবং তীব্র মেধাবী, তার সময়েই মূলত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।এখন রাশিয়া চাইছে বিশ্বব্যবস্থায় তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ ফলে পুতিন বিশ্বের যে কোনো ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।এ বিষয়টি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করছেনা ফলে তারা ভেতরে ভেতরে তুরস্ককে ন্যাটোর মাধ্যমে রাশিয়ার বিরুদ্ধাচরণে সহযোগিতা করছে।এদিকে রাশিয়া তুরস্ক ন্যাটোভুক্ত দেশ হওয়ায় তাদেরকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছে।কিন্তু বর্তমানে রাশিয়ার কূটনীতিক হত্যাকাণ্ডের মতো যে ঘটনা ঘটলো তাতে করে রাশিয়ার পদক্ষেপ কি হবে তা এই মুহূর্তে বলা বেশ কঠিন।কারণ পুতিন ইতিমধ্যে বলে দিয়েছেন রাষ্ট্রদূত হত্যার জন্য তুরস্ককে কঠিন মূল্য দিতে হবে।

রায়হান আহমেদ তপাদার :লেখক ও কলামিস্ট,

raihan567@ yahoo.com

সংবাদটি শেয়ার করুন:

Developed by: