Wednesday, 13 December, 2017 | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
সিলেটে যে অস্ত্রে কাবু রাজনীতিকরা  » «   শিবির তাড়িয়ে ওসমানী মেডিকেলে ছাত্রাবাসের কক্ষ দখলে নিল ছাত্রলীগ  » «   আমেরিকায় বন্ধ হচ্ছে পারিবারিক চেইন ভিসা!  » «   বিদ্যুতের খুটি পড়ে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু  » «   ঢাকাকে হারিয়ে বিপিএল চ্যাম্পিয়ন রংপুর  » «   ফেঞ্চুগঞ্জে ট্রান্সফর্মারে আগুনে ক্ষতি ৩০ কোটি টাকা, তদন্ত কমিটি  » «   রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী পালিত  » «   হবিগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২  » «   মহীয়সী নারী রাবেয়া খাতুন চৌধুরী  » «   হবিগঞ্জ থেকে ৫ জেএমবি সদস্য গ্রেফতার  » «   মানবাধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে: মেয়র  » «   ফেঞ্চুগঞ্জ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড  » «   সিলেটে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাহাত তরফদারের মামলা  » «   সিসিক নির্বাচনে কারা পাচ্ছেন দলীয় মনোনয়ন  » «   বিয়ানীবাজার জুড়ে চলছে ‘তীর খেলা’ পুলিশের লোক দেখানো অভিযান  » «  

Advertisement

কওমীর স্বীকৃতি বনাম আলেম-এলেমের ভবিষ্যত

km

রাজু আহমেদ:বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় শক্তভাবে দু’টো ধারা বিদ্যমান  । প্রথমতঃ আলিয়া, দ্বিতীয়তঃ কওমী বা দ্বীনিয়া । আলিয়া লাইনের ফাযিল এবং কামিলকে যথাক্রমে ডিগ্রি এবং ‘এমএ’ শ্রেণীর  সমমান দেয়ার পর এখান থেকে আলেম বের হওয়ার বাস্তবতা ১০% এর নিচে নেমে এসেছে । কেননা ধর্মীয় বই-পুস্তকের সাথে সাধারন শিক্ষার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সিলেবাসভূক্ত করার পর সিলেবাসে যে ব্যাপকতা এসেছে তা রপ্ত করে কুলিয়ে উঠে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে । কেননা ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশের কারনে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যে পরিমান মেধার অধিকারী হয় তাতে ধর্মীয় শিক্ষার আরবি সাহিত্য এবং ব্যাকরণ, কোরআন-হাদীস এবং ধর্মীয় আইন বিষয়ক গ্রন্থ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করার সাথে সাথে সাধারণ শিক্ষার বাংলা ও বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজী ও ইংরেজী গ্রামার, গণিত, বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞানকে সমন্বয় করে একসাথে অর্জন করার ক্ষমতা রাখে না । যে কারণে আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থার হ-য-ব-র-ল ভাব আসায় এ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এলেমের চর্চা এবং আলেমের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হৃাস পেয়েছে । দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, বর্তমান সময়ের আলিয়া লাইনের শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করে এখান থেকে প্রকৃত আলেম বের হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূণ্যের কোঠায় ।

একদল কওমী শিক্ষার্থী ও মুরুব্বীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-দাবীর মুখে অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কওমী শিক্ষার টাইটেল তথা দাওরায়ে হাদিছ শ্রেণীকে মাষ্টার্সের সমমান দিয়েছে । আলিয়া শ্রেণীকে সাধারণ শিক্ষা ঘোষণার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের প্রথিতযশা যতো আলেমের আবির্ভাব ঘটেছে তার সিংহভাগ কওমী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এসেছে । কেননা ধর্মীয় বিষয়াদিতে পান্ডিত্যতা অর্জনের জন্য যে বিষয়গুলোর পাঠ অপরিহার্য সেগুলো এতোদিন কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচালকরা বাস্তবতার আঙ্গিকে তাদের ইচ্ছামত নির্ধারণ করতে পেরেছে । যেহেতু সর্বশেষ ঘোষণানুযায়ী, কওমী শিক্ষার্থীরা সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বীকৃতি এবং এ শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাধারণ শিক্ষার সমমান ঘোষণা করা হয়েছে সেহেতু কওমী সিলেবাসের পূর্বরূপে সংযোজন-বিয়োজন করে সরকার নির্ধারিত সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র । ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপক সিলেবাস শেষ করার সাথে সাথে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তৃত বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা সমন্বিত করে কতটুকু আয়ত্ব করতে পারবে তা দারুণভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ ?

সরকারি স্বীকৃতির অর্থই দেশের বিভিন্ন চাকুরীতে কওমী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনের সুযোগ । তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, স্বীকৃতি পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কিংবা যারা এখন কওমী শিক্ষা ব্যবস্থা মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষারত তাদের শিক্ষাজীবন কওমীর নিজস্ব ফর্মূলা অনুসরণ করে শেষ করেছে এবং বাকীরা শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাড় করে এসেছে । কাজেই তাদের সরকারি এবং জনপ্রিয় বেসরকারি চাকুরির পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহন করে চাকরি অর্জন করার সম্ভাবনা স্বচ্ছপথে খুব কম পরিমানেই সম্ভব । কেননা চাকুরির পরীক্ষায় বিস্তৃত সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে অর্জন করার বিষয়টি কোন অলৌকিক ব্যাপার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা নাই । কওমীর স্বীকৃতি পাওয়ার পর নতুন প্রজ্ঞাপনের যে শিক্ষা-সিলেবাস নির্ধারিত হবে তার পাঠ চুকিয়ে নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন চাকুরীর জন্য যোগ্য করে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারবে কিন্তু ততোদিনের এলেম চর্চার অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা সময়ের সিদ্ধান্তের ওপর অর্পিত রইলো ।

এতোদিন কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এককভাবে হেদায়া, কাফিয়া, মেশকাত, বোখারীর আওয়াল-ছানী কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় আইন সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিষদভাবে তাকরার, মুজাকারা-মুশাহাদা-মুতায়া’লা করতে পারতো এবং ধর্ম সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞানে সম্মৃদ্ধ হয়ে আলেম হিসেবে ফারেগ হতে পারতো । কিন্তু ধর্মীয় বিষয়গুলোর সাথে সাধারণ শিক্ষার বিষয়সমূহ যেমন বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান কিংবা আইটির মত জটিল বিষয়গুলো যখন যুক্ত হবে তখন এসব বিষয়ের চাপ কূলিয়ে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তারা কতোটুকু মনোযোগী হতে পারবে তা প্রশ্ন-সাপেক্ষ । কওমীকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবী-ই ছিলো যেহেতু তারা সরকারি কিংবা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি প্রাপ্তির যোগ্যতা অর্জন করতে পারে সেজন্য-কাজেই চাকুরি সংক্রান্ত পড়াশুনার চাপ কুলিয়ে উঠতে গিয়ে যে তারা ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না । কেননা অতীত অভিজ্ঞতা তথা আলিয়া মাদ্রাসার সনদকে সাধারণ শিক্ষার সমমান দেয়ারে পরেই মূলত এখন থেকে ধর্মীয় এলেমের চর্চার অনুপস্থিতি ঘটেছে কিংবা ঘটতে বাধ্য হয়েছে । কওমীও যে সে পথ অনুসরণ করবে না তার নিশ্চয়তা কোথায় ?

কওমীর মুরুব্বীরা নিঃসন্দেহে ধর্মীয় জ্ঞানে মহান পান্ডিত্যের অধিকারী কিন্তু তারা কতটুকু বাস্তবতাকে পরীক্ষা করে কওমীর স্বীকৃতি চাইলেন, তা একান্তভাবেই তাদের নিজস্ব স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যাপার কিন্তু কওমী শিক্ষার মূল যে উদ্দেশ্য এবং আদর্শ তা স্বীকৃতির সাথে সাথেই অবশ্যম্ভাবীভাবে বিলীন হবে । কেননা আমাদের এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ততোটা প্রগাঢ় মেধার ধারক-বাহক নয় যা দ্বারা তারা একই সাথে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলোকে যথাযথভাবে আয়ত্ব করতে পারবে ।

এদেশের শিক্ষার্থীদের এক বিপুল অংশ কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত । যেজন্য এ পর্যন্ত দেশে মানসম্মত আলেমের উপস্থিতি সন্তোষজনকভাবেই ছিলো । কওমীর স্বীকৃতি প্রাপ্তির পর ধর্মীয় এলেম ও আলেমদেরও আলিয়ার শিক্ষার্থীদের মত দুর্দশা আসবে নাকি তারা তাদের অবস্থান সমুন্নত রাখতে পারবে  তা প্রমানের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে হয়তো । তবে যেহেতু কওমী শিক্ষার সর্বোচ্চ শ্রেণীকে মাষ্টার্সের মান দেয়া হয়েছে সেহেতু সাধারণ শিক্ষায় মাষ্টার্স অর্জনকারীদের সাথে কওমী শিক্ষার্থীরা যাতে প্রতিযোগীতার মঞ্চে সমান্তরাল ধারায় চলতে পারে সে যোগ্যতাটুকু তাদেরকে অর্জন করতে হবে । আর এ পথে কওমীর শিক্ষার্থীো হাঁটতে গেলেই তারা তাদের আসল উদ্দেশ্য থেকে যে পিছলে গিয়ে হোঁচট খাবে তা প্রমানের জন্য খুব বেশি গবেষণার জ্ঞান ও  অপেক্ষার করার প্রয়োজন থাকছে না বোধহয় । আগামী ইতিহাসের বাকিটা সময়ের কাঁধেই চাপানো রইলো ।
…..
রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।
raju69alive@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: