Monday, 22 May, 2017 | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
বিয়ানীবাজার পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের শপথ গ্রহণ  » «   জাফংলয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মা ও ছেলে নিহত  » «   বিয়ানীবাজারে ধর্ষণে অভিযুক্ত প্রবাসীর স্ত্রী বললেন ভিন্ন কথা  » «   সিলেটে যেভাবে ধরা পড়লো ভয়ংকর প্রতারক চক্র  » «   বাহুবলে বাস উল্টে নিহত ১ জন আহত অন্তত ২০ জন  » «   বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের অগ্রগতি থামিয়ে দিচ্ছে : রিয়াজুল হক  » «   বিয়ানীবাজারে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে প্রবাসী আটক  » «   পুলিশী তল্লাশী ও ভাংচুর অপরাজনীতির বহিঃপ্রকাশ: কাহের শামীম  » «   সিলেটে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট স্থগিত  » «   শাবি ছাত্রলীগ সভাপতিসহ তিন জনকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ  » «   পবিত্র মাহে রমজান মাস উপলক্ষে সিসিকের মতবিনিময় সভা  » «   সিলেটে চলছে পরিবহন ধর্মঘট চরম দুর্ভোগে সাধারণ নাগরিক  » «   রবিবার থেকে সিলেটে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের ডাক  » «   জৈন্তাপুরের ওসিকে প্রত্যাহারের দাবীতে ৭২ ঘন্টার আল্টিমেটাম  » «   সিলেটে পড়তে আসবে ভারতের শিক্ষার্থীরা : মেয়র আরিফ  » «  
Advertisement
Advertisement

কওমীর স্বীকৃতি বনাম আলেম-এলেমের ভবিষ্যত

km

রাজু আহমেদ:বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় শক্তভাবে দু’টো ধারা বিদ্যমান  । প্রথমতঃ আলিয়া, দ্বিতীয়তঃ কওমী বা দ্বীনিয়া । আলিয়া লাইনের ফাযিল এবং কামিলকে যথাক্রমে ডিগ্রি এবং ‘এমএ’ শ্রেণীর  সমমান দেয়ার পর এখান থেকে আলেম বের হওয়ার বাস্তবতা ১০% এর নিচে নেমে এসেছে । কেননা ধর্মীয় বই-পুস্তকের সাথে সাধারন শিক্ষার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সিলেবাসভূক্ত করার পর সিলেবাসে যে ব্যাপকতা এসেছে তা রপ্ত করে কুলিয়ে উঠে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে । কেননা ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশের কারনে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যে পরিমান মেধার অধিকারী হয় তাতে ধর্মীয় শিক্ষার আরবি সাহিত্য এবং ব্যাকরণ, কোরআন-হাদীস এবং ধর্মীয় আইন বিষয়ক গ্রন্থ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করার সাথে সাথে সাধারণ শিক্ষার বাংলা ও বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজী ও ইংরেজী গ্রামার, গণিত, বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞানকে সমন্বয় করে একসাথে অর্জন করার ক্ষমতা রাখে না । যে কারণে আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থার হ-য-ব-র-ল ভাব আসায় এ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এলেমের চর্চা এবং আলেমের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হৃাস পেয়েছে । দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, বর্তমান সময়ের আলিয়া লাইনের শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করে এখান থেকে প্রকৃত আলেম বের হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূণ্যের কোঠায় ।

একদল কওমী শিক্ষার্থী ও মুরুব্বীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-দাবীর মুখে অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কওমী শিক্ষার টাইটেল তথা দাওরায়ে হাদিছ শ্রেণীকে মাষ্টার্সের সমমান দিয়েছে । আলিয়া শ্রেণীকে সাধারণ শিক্ষা ঘোষণার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের প্রথিতযশা যতো আলেমের আবির্ভাব ঘটেছে তার সিংহভাগ কওমী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এসেছে । কেননা ধর্মীয় বিষয়াদিতে পান্ডিত্যতা অর্জনের জন্য যে বিষয়গুলোর পাঠ অপরিহার্য সেগুলো এতোদিন কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচালকরা বাস্তবতার আঙ্গিকে তাদের ইচ্ছামত নির্ধারণ করতে পেরেছে । যেহেতু সর্বশেষ ঘোষণানুযায়ী, কওমী শিক্ষার্থীরা সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বীকৃতি এবং এ শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাধারণ শিক্ষার সমমান ঘোষণা করা হয়েছে সেহেতু কওমী সিলেবাসের পূর্বরূপে সংযোজন-বিয়োজন করে সরকার নির্ধারিত সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র । ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপক সিলেবাস শেষ করার সাথে সাথে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তৃত বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা সমন্বিত করে কতটুকু আয়ত্ব করতে পারবে তা দারুণভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ ?

সরকারি স্বীকৃতির অর্থই দেশের বিভিন্ন চাকুরীতে কওমী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনের সুযোগ । তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, স্বীকৃতি পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কিংবা যারা এখন কওমী শিক্ষা ব্যবস্থা মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষারত তাদের শিক্ষাজীবন কওমীর নিজস্ব ফর্মূলা অনুসরণ করে শেষ করেছে এবং বাকীরা শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাড় করে এসেছে । কাজেই তাদের সরকারি এবং জনপ্রিয় বেসরকারি চাকুরির পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহন করে চাকরি অর্জন করার সম্ভাবনা স্বচ্ছপথে খুব কম পরিমানেই সম্ভব । কেননা চাকুরির পরীক্ষায় বিস্তৃত সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে অর্জন করার বিষয়টি কোন অলৌকিক ব্যাপার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা নাই । কওমীর স্বীকৃতি পাওয়ার পর নতুন প্রজ্ঞাপনের যে শিক্ষা-সিলেবাস নির্ধারিত হবে তার পাঠ চুকিয়ে নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন চাকুরীর জন্য যোগ্য করে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারবে কিন্তু ততোদিনের এলেম চর্চার অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা সময়ের সিদ্ধান্তের ওপর অর্পিত রইলো ।

এতোদিন কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এককভাবে হেদায়া, কাফিয়া, মেশকাত, বোখারীর আওয়াল-ছানী কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় আইন সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিষদভাবে তাকরার, মুজাকারা-মুশাহাদা-মুতায়া’লা করতে পারতো এবং ধর্ম সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞানে সম্মৃদ্ধ হয়ে আলেম হিসেবে ফারেগ হতে পারতো । কিন্তু ধর্মীয় বিষয়গুলোর সাথে সাধারণ শিক্ষার বিষয়সমূহ যেমন বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান কিংবা আইটির মত জটিল বিষয়গুলো যখন যুক্ত হবে তখন এসব বিষয়ের চাপ কূলিয়ে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তারা কতোটুকু মনোযোগী হতে পারবে তা প্রশ্ন-সাপেক্ষ । কওমীকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবী-ই ছিলো যেহেতু তারা সরকারি কিংবা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি প্রাপ্তির যোগ্যতা অর্জন করতে পারে সেজন্য-কাজেই চাকুরি সংক্রান্ত পড়াশুনার চাপ কুলিয়ে উঠতে গিয়ে যে তারা ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না । কেননা অতীত অভিজ্ঞতা তথা আলিয়া মাদ্রাসার সনদকে সাধারণ শিক্ষার সমমান দেয়ারে পরেই মূলত এখন থেকে ধর্মীয় এলেমের চর্চার অনুপস্থিতি ঘটেছে কিংবা ঘটতে বাধ্য হয়েছে । কওমীও যে সে পথ অনুসরণ করবে না তার নিশ্চয়তা কোথায় ?

কওমীর মুরুব্বীরা নিঃসন্দেহে ধর্মীয় জ্ঞানে মহান পান্ডিত্যের অধিকারী কিন্তু তারা কতটুকু বাস্তবতাকে পরীক্ষা করে কওমীর স্বীকৃতি চাইলেন, তা একান্তভাবেই তাদের নিজস্ব স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যাপার কিন্তু কওমী শিক্ষার মূল যে উদ্দেশ্য এবং আদর্শ তা স্বীকৃতির সাথে সাথেই অবশ্যম্ভাবীভাবে বিলীন হবে । কেননা আমাদের এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ততোটা প্রগাঢ় মেধার ধারক-বাহক নয় যা দ্বারা তারা একই সাথে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলোকে যথাযথভাবে আয়ত্ব করতে পারবে ।

এদেশের শিক্ষার্থীদের এক বিপুল অংশ কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত । যেজন্য এ পর্যন্ত দেশে মানসম্মত আলেমের উপস্থিতি সন্তোষজনকভাবেই ছিলো । কওমীর স্বীকৃতি প্রাপ্তির পর ধর্মীয় এলেম ও আলেমদেরও আলিয়ার শিক্ষার্থীদের মত দুর্দশা আসবে নাকি তারা তাদের অবস্থান সমুন্নত রাখতে পারবে  তা প্রমানের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে হয়তো । তবে যেহেতু কওমী শিক্ষার সর্বোচ্চ শ্রেণীকে মাষ্টার্সের মান দেয়া হয়েছে সেহেতু সাধারণ শিক্ষায় মাষ্টার্স অর্জনকারীদের সাথে কওমী শিক্ষার্থীরা যাতে প্রতিযোগীতার মঞ্চে সমান্তরাল ধারায় চলতে পারে সে যোগ্যতাটুকু তাদেরকে অর্জন করতে হবে । আর এ পথে কওমীর শিক্ষার্থীো হাঁটতে গেলেই তারা তাদের আসল উদ্দেশ্য থেকে যে পিছলে গিয়ে হোঁচট খাবে তা প্রমানের জন্য খুব বেশি গবেষণার জ্ঞান ও  অপেক্ষার করার প্রয়োজন থাকছে না বোধহয় । আগামী ইতিহাসের বাকিটা সময়ের কাঁধেই চাপানো রইলো ।
…..
রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।
raju69alive@gmail.com

Developed by: