Wednesday, 13 December, 2017 | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
সিলেটে যে অস্ত্রে কাবু রাজনীতিকরা  » «   শিবির তাড়িয়ে ওসমানী মেডিকেলে ছাত্রাবাসের কক্ষ দখলে নিল ছাত্রলীগ  » «   আমেরিকায় বন্ধ হচ্ছে পারিবারিক চেইন ভিসা!  » «   বিদ্যুতের খুটি পড়ে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু  » «   ঢাকাকে হারিয়ে বিপিএল চ্যাম্পিয়ন রংপুর  » «   ফেঞ্চুগঞ্জে ট্রান্সফর্মারে আগুনে ক্ষতি ৩০ কোটি টাকা, তদন্ত কমিটি  » «   রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী পালিত  » «   হবিগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২  » «   মহীয়সী নারী রাবেয়া খাতুন চৌধুরী  » «   হবিগঞ্জ থেকে ৫ জেএমবি সদস্য গ্রেফতার  » «   মানবাধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে: মেয়র  » «   ফেঞ্চুগঞ্জ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড  » «   সিলেটে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাহাত তরফদারের মামলা  » «   সিসিক নির্বাচনে কারা পাচ্ছেন দলীয় মনোনয়ন  » «   বিয়ানীবাজার জুড়ে চলছে ‘তীর খেলা’ পুলিশের লোক দেখানো অভিযান  » «  

Advertisement

‘কাসেম বিন আবুবাকারকে জাতীয় স্বীকৃতি দেয়া হোক’

জেসমিন চৌধুরী: ‘ফুটন্ত গোলাপ’ নন্দিত/নিন্দিত লেখক কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে গত কয়েকদিনে প্রিন্ট, অনলাইন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় যত লেখালেখি হয়েছে এর বাইরে বোধ হয় তার সম্পর্কে লেখার আর কিছু বাকি নেই, বিশেষ করে আমার মত অজ্ঞ পাঠকের পক্ষে তো নয়ই যেহেতু এক সপ্তাহ আগেও বাংলাদেশের ব্যাপক জনপ্রিয় এই লেখকের নামও আমি জানতাম না। কাজেই তার লেখার উপর আলোকপাত করার ধৃষ্টতা না দেখিয়ে বরং তার লেখার পাঠক প্রতিক্রিয়ার উপর আমার পুনপ্রতিক্রিয়াই আমি শুধু তুলে ধরতে পারি।

গত কয়েকদিনে এই মহান লেখকের লেখালেখির পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মতামত আমি পড়েছি যার কিছু তীব্রভাবে ব্যাঙ্গাত্মক, কিছু ঢালাও ভাবে সমালোচনামূলক অথবা প্রশংসাব্যাঞ্জক। তবে এই সবকিছুর উপরে যে সত্যটি সবচেয়ে অকাট্য তা হচ্ছে বাংলাদেশের পাঠকদের মধ্যে এই লেখকের বিপুল জনপ্রিয়তা যা কিংবদন্তীর পর্যায়ে পড়ে বলেই আমার মনে হয়।

ইদানিং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লেখক হিসেবে তার নাম উচ্চারিত হতে শুরু না হলে তাকে নিয়ে আমাদের দেশের মিডিয়ায় এই বিভিন্নমুখী আলোচনা বোধ হয় কখনোই হতো না। অনেকে বলছেন উনাকে নিয়ে এতো আলোচনার মাধ্যমে তার জনপ্রিয়তাকে আরো বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অনেকে বলছেন এই লেখকের পাঠক বেশিরভাগ গ্রামের কমশিক্ষিত লোক, পর্দানশিন মেয়েরা বা ইসলামী ছাত্র শিবিরের ছেলেরা। এই দাবীই বা কতটুকু সত্য, সে সম্পর্কেও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

যে সময়টাতে কাসেম সাহিত্য বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছিল, সেই সময়টাতেই বাংলাদেশের একটি গ্রামে আমি বড় হয়েছি কঠোর ইসলামী শাসন এবং ইসলামী সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে। পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল সীমাহীন।

ফলে, ঐ সময়টাতে আমি শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, মুজতবা আলী, বঙ্কিম, বিভূতিভূষন, সুনীল, রাশান সাহিত্যের অনুবাদ, এবং পাঠ্যপুস্তকে সংকলিত বিভিন্ন লেখকদের লেখা পড়েছি।  কাঁথার নিচে লুকিয়ে দস্যু বনহুর আর সেবা প্রকাশনীর বই পড়াও বাদ যায়নি। তারপর এসেছে  ‍হুমায়ূন আহমেদ।  সেই একই সময়ে স্কুলে কিছু শিক্ষকদের প্রভাবে পড়েছি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রচুর বইও।

অথচ এই বিশাল পাঠযজ্ঞে বাদ পড়ে গেছেন বাংলাদেশের ‘সর্বকালের সর্বাধিক’ জনপ্রিয় লেখক জনাব কাসেম। বেড়ে উঠার সময়টাতে যারা আমাকে বই পড়তে উৎসাহ যুগিয়েছেন, বিভিন্ন লেখকদের বই উপহার দিয়েছেন বা পড়তে বলেছেন, তারা কেউ আমাকে এই অসাধারণ লেখকের সাথে পরিচিত করে দেয়ার প্রয়োজনই বোধ করেননি।

স্কুলের সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় পাওয়া বইয়ের স্তুপেও এই লেখকের একখানা বইও কখনো স্থান পায়নি। আমার পরিচিতজনদের এবং আমার নিজের এই সীমাবদ্ধতা এবং অজ্ঞতার লজ্জা আমি রাখি কোথায়?

ইতিমধ্যে আমি নিজেও কিছু লেখালেখির ধৃষ্টতা দেখিয়েছি, একমাসের মধ্যে নিজের প্রথম প্রকাশিত বই ‘নিষিদ্ধ দিনলিপি’র দ্বিতীয় সংস্করণ বের হবার সাফল্যে আত্মহারা হয়েছি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখক হিসেবে কাসেম সাহেবের সাফল্য বিষয়ে মোটামুটি নিরীহ একটি স্ট্যাটাস লিখে আমি যে আক্রমণের শিকার হয়েছি এবং আমার অনেক ফেসবুক বন্ধু যেভাবে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তা থেকে লেখালেখি বা পড়াশোনা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অর্বাচীনতা আমার নিজের কাছেই স্পষ্টতর হয়ে উঠে আমাকে লজ্জায় অবনত করে দিয়েছে।

আমি লিখেছিলাম, ‘দেশে যদি কাসেম বিন আবুবাকারের পাঠক থাকে, যার সংখ্যা হুমায়ূন আহমেদের পাঠকের চেয়েও বেশি, তবে এই আমাদের বাস্তবতা, এই আমাদের আমরা। দুইদিন আগেও আমি ইনার নামই জানতাম না, বই পড়া তো দূরের কথা। এখন এও জানি যে, দেশের বেশির ভাগ পাঠকের সাথে, তাদের পাঠরুচির সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই। ফেসবুকে পাবলিসিটির ঝড় বইয়ে আমার বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ বেরিয়েছে বই মেলায়, তাই নিয়ে আমি খুশিতে আত্মহারা, অথচ এই লেখকের বইয়ের নাকি ত্রিশতম সংস্করণও বেরিয়েছে। উনার এই সাফল্য নিয়ে আমি ঈর্ষান্বিত হতে পারি, কিন্তু তার সাফল্যকে ছোট করে দেখতে পারি না।’

যাই হোক, এই বিষয়ে আমার পড়া সমস্ত আলোচনাকে দুই ভাগে বিভক্ত করলে এই দাঁড়ায়- কাসেম বিতৃষ্ণা এবং কাসেম ভক্তি।

যারা কাসেম সাহেবের সৃষ্টির প্রতি বিতৃষ্ণা প্রকাশ করেছেন, তাদের মতে ইসলামী উপন্যাস লেখার নাম করে তিনি যা লিখেছেন তা যৌন সুড়সুড়ানিমূলক ‘হালাল’ পর্ণ ছাড়া কিছুই নয়। উঠতি বয়সের মুসলিম যুবক যুবতীরা, যারা নিজেদের প্রেমাকাঙ্ক্ষা  নিয়ে অপরাধবোধে ভোগে, তাদেরকে সমঝোতার পথ দেখিয়েছেন তিনি।

ইসলামী বিশ্বাস বুকে নিয়ে ইসলামী সংস্কৃতি গায়ে মাখিয়ে মুখে আল্লাহর নাম নিয়ে প্রেমলীলায় কোন পাপ নেই, বরং এই হচ্ছে সামাজিক মুক্তির পথ। নিন্দুকেরা বলছেন জনাব কাসেম যেভাবে ইসলামী সংস্কৃতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তা ইসলামের পরিপন্থী।

এই মর্মে লেখা রিভিউগুলোতে কাসেম সাহেবের উপন্যাস থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়ে স্বপক্ষ সমর্থন করা হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রভাষ আমিনের ‘কাসেম বিন আবুবাকারের ‘হালাল’ সাহিত্য’ এবং ইয়ার্কিডটকম এ প্রকাশিত চরম উদাসের রিভিউটি পড়তে পারেন।

মধ্যপন্থী অনেকে কাসেম সাহেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এই মর্মে যে তাদের যৌবনে এই বইগুলো চটি বইয়ের চাহিদা পূর্ণ করেছে বিধায় তাদেরকে নোংরা ম্যাগাজিন পড়তে হয়নি, নোংরা ছবি দেখতে হয়নি। ‘তার বইয়ের গ্রাফিক বর্ণনা এতোটাই বাস্তব ছিল যে প্যাণ্ট ভেজাতে আর কিছুর প্রয়োজন ছিল না’। এই মন্তব্য আমার নয়, কাসেম সাহেবের একজন মুগ্ধ পাঠকের।

কাসেম-প্রেমীরা আবার অন্য কথা বলছেন। তাদের মতে ইনি একজন সুলেখক। তার বইতে তিনি সার্থকতার সাথে নস্টালজিয়া এবং ট্র্যাজেডির ব্যবহার করেছেন। অনেকে তাকে শরৎচন্দ্র এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও সমকক্ষ বলে দাবী করেছেন যদিও উদ্ধৃতির মাধ্যমে এই তুলনাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেননি তারা। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? একজন পাঠক যা অনুভব করে তাই-ই সত্য।

আজ কাসেম সাহেবের একটা ইন্টারভিউ পড়ে মনে হলো তাকে নিয়ে, তার লেখালেখি নিয়ে এতোসব আলোচনার বেশিরভাগ সম্পর্কেই তিনি অবহিত নন কারণ তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন না। তিনি একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এই বইগুলো লিখেছেন। তার লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, তিনি এতেই তৃপ্ত।

উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ তাকে চিঠি লিখে জানিয়েছে তাদের নিজেদের চরিত্র পরিশুদ্ধিতে তার বইয়ের অবদানের কথা। অনেকে তার লেখা পড়ে মদ্যপান ছেড়েছেন। অনেকে ইসলামের পথে ফিরেছেন। মেয়েরা নিজের রক্ত দিয়ে চিঠি লিখে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। তারপর অন্যরা কে কী বলল তাতে তার খুব একটা কিছু যায় আসে না।

আমি নিজে কিছুদিন ধরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে লেখালেখি করছি। নারী অধিকার, শিশুর সার্বিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, একটা অসাম্প্রদায়িক সম-অধিকার ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা- এই সব আমার লেখালেখির বিষয়বস্তু। কাসেম সাহেবের মত এপিক হারে না হলেও আমার কাছেও লেখা পড়ে অনেকে বার্তা পাঠান। অনেকে আমার সাহসের প্রশংসা করেন, বিশেষ করে নারীরা এই মর্মে ধন্যবাদ জানান যে আমার লেখা তাদেরকে সাহস যোগায়।

কিন্তু আজ পর্যন্ত একজন মানুষও আমাকে এই মর্মে বার্তা পাঠাননি যে আমার লেখা পড়ে তাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। একজন নারীবিদ্বেষী বার্তা দিয়ে বলেননি, আপনার লেখা পড়ে আমি নারী অধিকারের বিষয়টি বুঝতে পেরেছি। একজন শিশু নির্যাতক জানায়নি যে সে আর শিশু নির্যাতন করবে না।

একজন সাম্প্রদায়িকতাবাদী বলেনি আমার লেখা পড়ে সে অসাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। বরং সমালোচনা এবং হুমকী আসে ধর্ম এবং সমাজ বিরোধী ধ্যান ধারণা প্রচার করা বন্ধ করার দাবী জানিয়ে।

আমি বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কার পাওয়া সব লেখকদের সাথে কাসেম সাহেবের তুলনা করে কোন পক্ষের প্রতি অবিচার করার ঝুঁকি নিতে চাই না। তবে এটুকু বলব, যদিও লেখক হিসেবে আমি নিতান্তই শিশু, আমার নিজের ব্যর্থতার পাশাপাশি কাসেম বিন আবুবাকারের সাফল্যকে হীরার মত জ্বলজ্বল করতে দেখে আমি যা বুঝি তা হলো তিনি এদেশের মানুষকে চিনতে পেরেছেন, তাদের বোধকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাদের চাহিদার স্থানটি নির্ণয় করতে পেরেছেন এবং পূরণ করতে পেরেছেন। তিনি নিঃসন্দেহে এদেশের জাতীয় লেখকের সম্মান পাওয়ার যোগ্য।

আমি আমাদের দেশের মিডিয়াকে ধিক্কার দেই তাকে আরো আগে স্বীকৃতি না দেবার জন্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিন্দা জানাই কাসেম বিন আবুবাকারকে পুরস্কৃত না করার জন্য। আমাদের দেশের রত্নকে চিনলো বিদেশীরা, এটা কিছু হলো? আমাদের দেশে কি তবে জহুরী নেই?

জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক।
সুত্র:পরিবর্তন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: