Wednesday, 18 October, 2017 | ৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোসহ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী  » «   সিলেটে এনআরবি গ্লোবাল কনভেনশন উদ্বোধন ২১ অক্টোবর  » «   সিলেটে পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার  » «   কামরান এবং আরিফ দুই জন দুই দলে জনপ্রিয়  » «   মৌলভীবাজারে শোকের মাতম চলছে  » «   নগরবাসীকে সব ধরণের সেবা দিতে সিসিক অঙ্গীকারবদ্ধ: আরিফ  » «   জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সফলতা  » «   পরোয়ানা থাকলেই খালেদাকে গ্রেপ্তার করা হবে এটা ঠিক নয়: আইজিপি  » «   সিলেটে বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট  » «   মিয়াদ খুনের ঘটনায় সিলেটে ছাত্রলীগের চারদিনের কর্মসূচি  » «   মিয়াদের লাশ নিয়ে ছাত্রলীগের মিছিল, চৌহাট্টায় সড়ক অবরোধ  » «   ‘আমার মেয়ের মতো ইন্টারনেট আসক্ত যেন কেউ না হয়’  » «   সিলেটে ছাত্রলীগের গ্রুপিং: আর কত লাশ পড়বে?  » «   মুখে কৈ মাছ আটকে যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু  » «   কুয়েতে অগ্নিকাণ্ডে ৫ সিলেটির মৃত্যু  » «  
Advertisement
Advertisement

জঙ্গি-সন্ত্রাসের সঙ্গে মৌলবাদ জুড়ে দেয়া সঙ্গত নয়

নূরে আলম সিদ্দিকী:এবারের মধ্যপ্রাচ্য সফরে রিয়াদে পৃথিবীর প্রায় সকল মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের একটা অভূতপূর্ব সমাবেশে সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের আমন্ত্রণে উপস্থিত হয়ে রিয়াদের বাদশাহ্‌ আবদুল আজিজ সম্মেলন কেন্দ্র থেকে সারা বিশ্বকে হতচকিত করে দিয়ে মুসলিম-বিদ্বেষী অবস্থান থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অনেকটাই সরে এসেছেন।
নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং পরে বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটন বারংবার তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছিলেন গোটা মুসলিম বিশ্বকে সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত বা সম্বোধন না করতে। বরং জঙ্গি-সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভ্রান্ত মুসলমানদের বিরুদ্ধে সার্বজনীন জনমত গড়ে তুলে এর বিরুদ্ধে মুসলমানসহ সারা বিশ্বের সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে একযোগে লড়াই করার উদাত্ত আহ্বান রাখার জন্য ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন তারা। ডনাল্ড ট্রাম্পের শিরায় শিরায়, নাড়ির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, অনুভূতির পরতে পরতে মুসলিম-বিদ্বেষ, বর্ণ-বিদ্বেষ ও নারী-বিদ্বেষ সমুদ্রের ঊর্মিমালার মতো প্রবহমান। রাজনৈতিক শালীনতা-বিবর্জিত ডনাল্ড ট্রাম্প কখনোই শালীন, পরিমার্জিত ভাষায় এই তিন প্রশ্নে কথা বলেননি। আমেরিকার রাজনীতিকদের বিরুদ্ধেও অনেক কৌতুক, ঠাট্টা-তামাশা ও বিদ্রূপ করেছেন এবং তার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে রিপাবলিকান কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অধিষ্ঠিত হতে পারেননি।
এরই মধ্যে ডনাল্ড ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধুচন্দ্রিমার মাহেন্দ্রক্ষণ অতিবাহিত করেছেন। আমেরিকার ২৪০ বছরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সবচাইতে বিতর্কিত তার মনোনয়ন লাভ এবং নির্বাচনের প্রশ্নেও নানাবিধ কারচুপি এবং অভূতপূর্ব বিভিন্ন প্রশ্নে সমালোচিত ছিল তার পুরো নির্বাচনটি। অসংলগ্ন, বাস্তবতা-বিবর্জিত এবং মানবতাবিরোধী নানা অপ্রাসঙ্গিক কথায় তিনি নিজেকে তো প্রশ্নবিদ্ধ করেছেনই, বরং মানবতাবাদী বিশ্ব-জনগোষ্ঠীকে আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার ঘনঘোর অমানিশার মধ্যে এমন নিষ্ঠুরভাবে নিক্ষেপ করেছিলেন যে, বিশ্বের শান্তিকামী প্রান্তিক জনতা কম্পমান বক্ষে এক নব্য হিটলারের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেন। পপুলার ভোটের হিসেবে এমনিতেই তিনি ৩২ লাখেরও অধিক ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারির চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। ইলেক্টোরাল ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে বহুদিন পর্যন্ত আমেরিকার প্রায় ৫৮ ভাগ নাগরিক, সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহলের প্রতিনিধিত্বে যারা ছিলেন, তারা তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বীকারই করতেন না। নির্বাচনটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে এমনকি ইলেক্টোরাল পদ্ধতি আমেরিকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম কি-না, আমেরিকানদের মধ্যে এ প্রশ্নও জোরালোভাবে উঠেছিল। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো নির্বাচনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রভাব ও কেজিবি’র হ্যাকিং-এর প্রশ্নটি আমেরিকাবাসীদের শুধু বিপর্যস্তই করে নাই, তাদের ২৪০ বছরের গণতন্ত্রের অনুশীলন, প্রত্যয় ও প্রতীতীর উপর নির্মম সিডরের মতো আঘাত হেনেছিল। আমেরিকার বিশাল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ারও আওয়াজ তুলেছিল। আমেরিকার মতো রাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মতো উগ্রবাদী ব্যক্তির রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠান সারা বিশ্বের কাছে শুধু বিস্ময়করই নয়, অগ্রহণযোগ্য, অকল্পনীয় এবং একটি মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে প্রতিভাত হয়। আমেরিকার অভ্যন্তরে অনেক এলাকায় নির্বাচন-উত্তরকালে ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ একটি নজিরবিহীন ঘটনা। বিশ্বজোড়া আমেরিকার আগ্রাসননীতি সর্বজনবিদিত বলেই মুসলিম-বিদ্বেষী ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর মুসলমানবিরোধী কথাবার্তার প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্যালেস্টাইনের ৪ হাজারেরও অধিক ইহুদি অভিবাসীকে স্থায়ীভাবে জেরুজালেমে অধিষ্ঠিত করেন। জেরুজালেমের পবিত্র আল আকসা মসজিদটিও বন্ধ করে দেয়ার স্পর্ধিত পাঁয়তারা করা হয়।
আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচাইতে বয়োজ্যেষ্ঠ, রাজনীতির অঙ্গন-বিবর্জিত নিছক ব্যবসায়ী ডনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই তার কার্যকলাপ, নিজের পারিবারিক ব্যক্তিবর্গকে হোয়াইট হাউসের কর্তৃত্বে আনার নির্লজ্জ পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে ইতিমধ্যেই তিনি আমেরিকার রাষ্ট্রপতির ইতিহাসে একগুঁয়েমির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইসরাইল সফরের প্রাক্কালেও তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনের অভিলাষ ব্যক্ত করেন। তবে ইহুদিদের পবিত্র পীঠস্থান ও উপাসনালয়ের দেয়ালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনিই প্রথম তার মন্তব্য খচিত করেন।
সৌদি আরবের বাদশাহ্‌ সালমান বিন আ্বদুল আজিজের আমন্ত্রণে রিয়াদে গিয়ে তিনি যে ভাষণটি দিয়েছেন, সন্দেহাতীতভাবে সেটি পরিশীলিত, পরিমার্জিত এবং মুসলিম-বিদ্বেষ থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিতবহ। চতুর ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যবসায়ী ডনাল্ড ট্রাম্প মুসলমানদের প্রতি কতটুকু সহানুভূতিশীল হয়েছেন বা হবেন- তার এসব উক্তি আদৌ এর নিশ্চয়তা বিধান করে না। কারণ ব্যবসায়ী রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ১১০ বিলিয়ন ইউএস ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করেছেন সৌদি বাদশাহ্‌র সাথে। এখানে একটি প্রশ্নে সকলে বিদগ্ধ চিত্তে সুতীব্র যন্ত্রণামিশ্রিত হয়ে জ্বলজ্বল করে জ্বলে ওঠে, সৌদি বাদশা বিপুল অঙ্কের অস্ত্র কিনে ট্রাম্পকে কিছুটা নিবৃত্ত করলেন? মুসলিম-বিদ্বেষী মননশীলতা থেকে কিছুটা সরিয়ে আনলেন, না ব্যবসায়িক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ১১০ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রির কৌশলী প্রক্রিয়ায় সফল হলেন? বিশেষজ্ঞ না হয়েও বলা যায়, ডনাল্ড ট্রাম্প এক্ষেত্রে তার বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলী ব্যবসায়িক প্রজ্ঞাকে অতি সূক্ষ্ণভাবে ব্যবহার করেছেন। ইসরাইলেও তিনি প্যালেস্টাইনে শান্তির যে আহ্বান রেখেছেন, তাও তার সুচতুর রাজনৈতিক কৌশলের একটি অবিভাজ্য আঙ্গিক। অন্তত এখন আমেরিকাবাসী তার ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার কিছুটা হলেও প্রশংসা করবেন, এটা নির্দ্বিধায় বলা চলে। অস্ত্রগুলির সবগুলিই ইয়েমেনের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে এটিই চুক্তির মূল শর্ত।
মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত হলেও বাইরে থেকে দেখলে পরিদৃষ্ট হবে যে, বাংলাদেশ ছিমছামভাবেই চলছে। হলি আর্টিজানে জঙ্গিহামলার ঘটনাটির পর র‌্যাব ও পুলিশের সুতীক্ষ্ণ নজরদারিতে বড় কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বাংলাদেশে ঘটেনি। এটি একটি স্বস্তিদায়ক বিষয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও বাংলাদেশ বিশ্বজনমতের ইতিবাচক দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ১২ মণ দুধে এক ফোঁটা গো-চনার মতো ভারতের সঙ্গে আমাদের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সম্মানজনক সমাধানের ব্যর্থতা বাংলাদেশের মানুষকে শুধু উদ্বিগ্নই করছে না, বরং দুশ্চিন্তার আবর্তে নিক্ষেপ করছে। ভারত কি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে পানিসমস্যা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক সমুদ্রসীমার যে যৌক্তিক সমাধান এসেছে, তাকে উদার চিত্তে গ্রহণ করবে না? অনেক দেরীতে হলেও এই অভাজনের কথাটাই তো সত্য প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। ভারতবর্ষ নরেন্দ্র মোদি, যোগী আদিত্যনাথদের উগ্র হিন্দুত্ববাদের কষাঘাতে আজ জর্জরিত। ভারতের মুসলমানরা আজ অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যে নথুরাম গড্‌স মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করেছিল, হত্যাস্থলে তার প্রতিকৃতি নির্মাণ সার্বিকভাবে ভারতের স্বাধীনতার প্রতি একটি নির্মম কটাক্ষ ও উপহাস বৈ কিছু নয়।
এর আগের নিবন্ধেও আমি এ বিষয়টি নিয়ে লিখেছি। ফলে কেউ কেউ না বুঝে আমাকে ভারত-বিদ্বেষী বলতেও সংকোচ করেন না। এই প্রেক্ষাপটে আমি সকলকেই বিনম্র চিত্তে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিস্তীর্ণ ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমার চিত্তকে উদ্বেলিত করে, উচ্ছ্বসিত করে। ভারতকে আমি সবসময়ই বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে দেখতে চাই, প্রভু হিসেবে কখনোই নয়। বিস্তীর্ণ ভারতের কোটি কোটি নাগরিক অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতান্ত্রিক মননশীলতার উদার চিত্তের অধিকারী। ভারতের বিশাল প্রান্ত জুড়ে অনেক রাষ্ট্রে অসাম্প্রদায়িকতার প্রদীপ্ত সূর্য আলো ছড়ায়। কিন্তু বিজেপি’র নেতৃত্বের একটি অংশ ভারতকে হিন্দুস্তানে পরিণত করার যে হুংকার ছাড়েন, তা শুধু বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ক্ষতবিক্ষত করে না; ভারতবর্ষের অসংখ্য গণতান্ত্রিক মননশীলতার মানুষও তাতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং প্রতিবাদ করে।
মুক্তিযুদ্ধের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ততার কারণে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, যখন অবলোকন করি, এদেশে সুশীল সমাজের একটি খণ্ডিত অংশ ভারতের প্রভুত্ব তো বটেই, বাংলাদেশ ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হলেও যেন তারা বর্তে যান। এরা তাদের কথোপকথন, লেখালেখি ও আলোচনা-পর্যালোচনায় নিজেদেরকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাহির করলেও অসাম্প্রদায়িকতার নামে এমন সূক্ষ্ণ প্রচারণা চালান, যেটি কোন অবস্থাতেই জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। জঙ্গি-সন্ত্রাস হারাম, গুপ্তহত্যা হারাম- এটা ইসলামের শাশ্বত সত্য। এটা না মানা মানে ইসলামকেই অস্বীকার করা। জঙ্গি-সন্ত্রাসের যত কঠোর বিরোধিতাই করা হোক, ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে সমর্থন করি। জঙ্গিবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু যখন জঙ্গি-সন্ত্রাসের বিরোধিতা করতে গিয়ে জঙ্গি-সন্ত্রাসের সাথে তারা মৌলবাদী শব্দটি সম্পৃক্ত করে দেন (মৌলবাদ ও জঙ্গি-সন্ত্রাস রুখতে হবে) তখনই আমার আপত্তি। কারণ ধর্মের মূল প্রতিবাদ্য বিষয় অনুসরণ করাই হলো মৌলবাদ। সন্ত্রাসের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলার মানসিকতা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সংকীর্ণতার বহিঃপ্রকাশ। ইসলামের মূল আদর্শ হলো- শান্তি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপূর্ণ স্বীকৃতি। অথচ তরুণ প্রজন্মের একটি অতি উৎসাহী অংশকে মগজধোলাই করে জঙ্গি-সন্ত্রাসের মতো ন্যক্কারজনক কাজে লাগানো হচ্ছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তো বন্ধ হবেই না, বরং আশঙ্কা রয়েছে গোটা ইসলামটাই সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার। রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, সংবাদকর্মী, শিক্ষক, এমনকি প্রতিটি পরিবারের সদস্যের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই কূপমণ্ডুকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা তা পারবো ইনশাআল্লাহ্‌।
জঙ্গি-সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা ইসলামে একান্তই হারাম। কোনো যুক্তিতেই গুপ্তহত্যা, জঙ্গি আক্রমণকে কোনো মুসলমান সমর্থন করতে পারেন না। আল্লাহ্‌র বিধান ও রাসূল (সাঃ)-এর জীবনাদর্শ (হাদীস) একে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ধর্মযুদ্ধ ব্যতিরেকে যে কোনো অবস্থায় যেকোন ধর্মের মানুষ হত্যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষেধ। এমনকি ধর্মকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করারও বিধিনিষেধ রয়েছে ইসলামে। আইএস, আল-কায়েদা, তালেবান- এরা কোনো যুক্তিতেই হত্যা, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকে ইসলামিক কর্মকাণ্ডের আবর্তে আনতে পারবে না। আমি প্রত্যয়দৃঢ়ভাবে পুনরুল্লেখ করতে চাই, পূর্বঘোষিত জেহাদ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই মানুষ হত্যার কোনো অধিকার ইসলামে নেই। পৃথিবীজোড়া এদের দৌরাত্ম্য ইসলামের শান্তির ললিতবাণীকে কেবল পরিহাসই করছে না, বরং তাদের জঙ্গি-সন্ত্রাস ও মানবতা-বিরোধী কার্যকলাপ ইসলামকে বিকৃত করছে। মুসলমানদের সমন্ধে ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করছে। আইএস, আল-কায়েদা, তালেবানের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো মূলত আমেরিকার সিআইএ ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সৃষ্টি। অথচ তাদের সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ভার এসে বর্তায় মুসলমানদের উপর।
আমি অত্যন্ত গুনাহ্‌গার একজন মুসলমান (আল্লাহ্‌ রিয়ার গুনাহ্‌ মাফ করুন), প্রতিনিয়ত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ি এবং পৃথিবীর সর্বত্রই জঙ্গি-সন্ত্রাসের হাত থেকে সারা বিশ্বের, বিশেষ করে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে ফরিয়াদ করি। বর্তমানে বাংলাদেশে আরেকটি বর্ণচোরা শত্রু মুরতাদ। নাম-ধাম ও বংশ পরিচয়ে তারা রমরমা মুসলমান কিন্তু মননশীলতায় তাদের ইসলামের মূল শিক্ষা তো নাই-ই, বরং একটা নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। জ্ঞানে-অজ্ঞানে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এরা প্রায়শই এমন সব উক্তি করেন, যা শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, ধর্মপ্রাণ নিরীহ মানুষের হৃদয়ে একটা নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। অনেক অনৈতিকতার মধ্যে আজকে তারা ভাস্কর্যের নামে মূর্তি প্রতিষ্ঠার অপকর্মে ব্যাপৃত। আশ্চর্যান্বিত ও বিস্ময়াভিভূত হয়ে অবহিত হলাম যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে গ্রিক দেবী থেমিসের মূর্তি স্থাপনের বিষয়ে স্বয়ং সরকারপ্রধানও অবহিত ছিলেন না! এটা কিসের ইঙ্গিত বহন করে? রাজধানীর কোনো অলি-গলিতে নয়, রাষ্ট্রের প্রধান বিচারালয়ে চুপিসারে এই মূর্তি কারা প্রতিস্থাপিত করল, তা আশু তদন্তের আওতায় আসা একান্তই বাঞ্ছনীয়। আমাদের দেশে স্বাধীনতা-বিরোধী একটি শক্তি সর্বদাই ঘাপটি মেরে রয়েছে। যে কোনো ছল-ছুতোয় একটা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ নিতে সার্বক্ষণিক সচেষ্ট থাকে তারা।
আমাদের পূর্বসূরিরা যারা শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতি সৌধ গড়েছেন, এর মধ্যে অন্তর্নিহিত দেশপ্রেম রয়েছে যেটা প্রতীকী। সেখানে মূর্তির কোনো অবস্থান নাই। একটি নতুন স্লোগান এসেছে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এই উৎসবের প্রশ্নে আমি পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি বা নজরুল, রবীন্দ্র জয়ন্তীকে মনে করি। কোনো অবস্থাতেই কোনো ধর্মীয় উৎসব সার্বজনীন নয়। সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সার্বজনীন উৎসবের মধ্যেও পরিশীলিত, পরিমার্জিত এবং পূতপবিত্র চিত্তের পরিস্ফূটন ঘটুক। এর সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতা-বিবর্জিত অশ্লীল ও কদর্য যে কোনো কর্মকাণ্ডই সমাজকে অনৈতিকতার দিকেই বারবার টেনে নিয়ে যাবে। যা শুধু নতুন প্রজন্মকে অন্ধকার অমানিশার মধ্যেই ঠেলে দেবে। সকল কূপমণ্ডুকতার আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে পবিত্র ও আলোকস্নাত নতুন প্রজন্ম শুধু আলোর পথেই হাঁটবে; জঙ্গি-সন্ত্রাস সৃষ্টির আশঙ্কাও ক্রমান্বয়ে দূরীভূত হবে।

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

উপদেষ্টা: ড.এ কে আব্দুল মোমেন
সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: