গল্প: জবাই করা মেষ

মূল: রোয়াল্ড ডাল।। অনুবাদ: ফারুক মঈনউদ্দীন
একাধারে কথাশিল্পী, কবি এবং চিত্রনাট্য লেখক রোয়াল্ড ডাল (১৯১৬-১৯৯০) ইংল্যান্ডে অভিবাসী এক নরওয়েজীয় দম্পতির সন্তান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান চালক ডাল লেখক হিসেবে আবির্ভূত হন উনিশশ’ চল্লিশের দশকে। ২০০৮ সালে টাইমস পত্রিকা তাঁকে ‘১৯৪৫ সাল থেকে পঞ্চাশজন ব্রিটিশ লেখক’ তালিকার ১৬ নম্বরে স্থান দিয়েছিল। অনূদিত এই গল্পটির নাম ‘ল্যাম্ব টু দ্য স্লটার।’

ঘরটা গরম, পর্দাগুলো নামানো ছিল, টেবিল ল্যাম্প দুটোই জ্বালানো। পেছনের কাবার্ডের ওপর দুটো গ্লাস আর কিছু ড্রিংকস রাখা। স্বামীর কাজ থেকে ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছিল মেরি ম্যালোনি। কিছুক্ষণ পরপর ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল ও, তবে উদ্বেগ ছিল না: ও কেবল তৃপ্ত হতে চাইছিল যে পেরিয়ে যাওয়া প্রতিটা মিনিট ওর ঘরে ফিরে আসার সময়টার কাছে নিয়ে যাচ্ছে ওকে। সেলাই কাজের ওপর ঝুঁকে পড়ছিল যখন, অদ্ভুত রকম শান্ত ছিল ও। বাচ্চা হবে ওর, ছয় মাস চলছে এখন। মুখ-চোখ আর ওর শান্ত চাহনি আগের চেয়ে বড় ও গভীর মনে হচ্ছিল।

পাঁচটা বাজার আগে কান পাতে ও, কয়েক মুহূর্ত পর সবসময়ের মতো ঠিক সময়ে বাইরে রাস্তার পাথরের ওপর গাড়ির চাকার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। উঠে দাঁড়িয়ে ঘরে ঢোকার সময় চুমু খাওয়ার জন্য এগিয়ে যায় ও।

‘হ্যালো ডার্লিং’।

‘হ্যালো।’

স্বামীর গায়ের কোটটা খুলে নিয়ে ঝুলিয়ে রেখে ড্রিংকস তৈরি করে দুটো, একটা কড়া আর নিজেরটা হালকা, তারপর চেয়ারে বসে সেলাইর কাজে লেগে যায় আবার। ওর স্বামী অন্য চেয়ারে বসে লম্বা গ্লাসটা হাতে নিয়ে এমন মৃদুভাবে দোলায় যেন বরফের টুকরোগুলো কাচের গায়ে লেগে সংগীতের ধ্বনি তোলে।

দিনের এই সময়টুকু বড়ই মধুর। ও জানে ড্রিংকসের প্রথম প্রস্থ শেষ না হলে বেশি কথা বলতে চায় না লোকটা। দীর্ঘ সময় ঘরে একা থাকার পর স্বামীসঙ্গ উপভোগ করে চুপচাপ বসে থাকাতেই ওর তৃপ্তি। দুজন একসাথে একা থাকার সময় লোকটার ভেতর থেকে বের হয়ে আসা উষ্ণতাটা ওর ভালো লাগে। ভালো লাগে ওর মুখের গড়ন, বিশেষ করে ক্লান্ত হয়েও অভিযোগ না করাটা।

‘টায়ার্ড, ডার্লিং?’

‘হ্যাঁ’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও। ‘একেবারে শেষ হয়ে গেছি।’

কথা বলতে বলতে একটা অস্বাভাবিক কাজ করে ও। গ্লাসের অর্ধেক বাকি থাকা অবস্থায় এক ঢোকে গিলে ফেলে সবটুকু। তারপর ধীরে-সুস্থে উঠে আরেকটা ড্রিংকস বানানোর জন্য যায়।

ও লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে বলে, ‘আরে, আমি দিচ্ছি, তুমি বসো।’

ড্রিংকটা নিয়ে ফিরে এলে ও লক্ষ্য করে, এবারেরটা অনেক বেশি কড়া। ওটাতে চুমুক দিতে শুরু করলে দেখতে থাকে ও।

ও বলে, ‘খুবই লজ্জার কথা, তুমি যত বছর ধরে পুুলিশে কাজ করছ, তাকে সারাদিন এতখানি হাঁটতে হয়!’ কোনো কথা বলে না সে। ও বলতে থাকে, ‘ডার্লিং শোনো, যেমন ভেবেছিলাম আজ রাতে বরং বাইরে খেতে না যাই, খুব ক্লান্ত তুমি, তোমার জন্য অন্য কিছু বানাতে পারি। ফ্রিজে মাংস ছাড়াও অনেক কিছু আছে।’

ওর চোখ একটা কিছু চাইছিল, একটু হাসি, একটু সম্মতি, কিন্তু কোনো ইঙ্গিত আসে না ওর কাছ থেকে।

তবু বলে, ‘তাহলে তোমাকে পাউরুটি আর চিজ দিই?’

‘লাগবে না’, বলে ও।

কিছুটা অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসে ও। ‘কিন্তু তোমার তো রাতে কিছু খেতে হবে। তোমার জন্য কিছু তৈরি করে দিই? বানিয়ে দেবো? ল্যাম্ব খেতে পারি আমরা। তুমি যা-ই চাও। ফ্রিজে আছে সবকিছু।’

‘বাদ দাও তো।’

‘কিন্তু তোমাকে তো কিছু খেতে হবে। আমি বানিয়ে দিচ্ছি। ইচ্ছে হলে খাবে, তোমার যা ইচ্ছে।’

সেলাইর কাজগুলো টেবিলের বাতির পাশে রেখে উঠে দাঁড়ায় ও।

ও বলে, ‘বসো, এক মিনিট বসো।’

এতক্ষণ পর্যন্ত ভয় পাচ্ছিল না ও।

ও বলে, ‘শোনো, বসো।’

চেয়ারে বসার জন্য নিচু হয় ও, বড় বড় বিস্মিত চোখ দিয়ে সে দেখছিল ওকে। ড্রিংকটা শেষ করে গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকে ও।

তারপর বলে, ‘শোন, তোমাকে কিছু কথা বলার আছে।’

‘কী কথা ডার্লিং? কী ব্যাপার?’

সম্পূর্ণ স্থির হয়ে যায় ও, মাথা নোয়ানো।

‘ভয় পাচ্ছি, তোমার জন্য বড় একটা আঘাত হবে এটা। এ ব্যাপারে অনেক ভেবেছি আমি, বুঝলাম, এখনই তোমাকে বিষয়টা জানানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই।’

তারপর ওকে বলে ব্যাপারটা। খুব বেশি সময় লাগে না, বড়জোর চার থেকে পাঁচ মিনিট, পুরোটা সময় চুপচাপ বসে থেকে ভীতি-বিহ্বল চোখে দেখতে থাকে ওকে।

কথা শেষ করে বলে, ‘এটাই হচ্ছে কথা। জানি তোমাকে বলার জন্য সময়টা খারাপ, কিন্তু আসলে আর কোনো উপায় ছিল না। তবে, তোমাকে টাকা-পয়সা দেবো, দেখব যাতে ঠিকমতো তোমার দেখাশোনা করা হয়। কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যা-ই হোক, আশা করি হবে না। আমার জন্য এটা খুব ভালো হচ্ছে না জানি।’

ওর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, এসবের কিছুই বিশ্বাস না করা। মনে হয় সবকিছুই ওর নিজের কল্পনা যেন। মনে হয়, কিছুই শুনতে পায়নি এমন ভান করলে দেখতে পাবে কিছু ঘটেইনি আসলে।

ও ফিসফিস করে বলে, ‘কিছু খাবার তৈরি করি।’ ঘরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল যখন, মনে হয় ওর পা দুটো মেঝে স্পর্শ করছে না। সামান্য অসুস্থতা ছাড়া আর কিছূই অনুভব করছিল না ও। মাথার মধ্যে কিছুই কাজ করছিল না, তবু সব কাজ করে যাচ্ছিল। নিচতলায় নেমে ফ্রিজ খুলে হাতের কাছে যা পাওয়া যায় সেটাই তুলে নেয় ও। কাগজে মোড়ানো জিনিসটা, কাগজ সরিয়ে ওটার দিকে আবার তাকায়- একটা ভেড়ার পা।

ঠিক আছে, ওরা সাপারে আজ ভেড়ার মাংস খাবে। সরু অংশটা দু’হাতে ধরে ওপরতলায় যায় ও। লিভিং রুমে ঢুকে দেখে ওর দিকে পেছন ফিরে জানালার সামনে দাঁড়ানো লোকটা। একটু থামে ও।

সে অবস্থায় লোকটা বলে, ‘তোমাকে তো বললাম, আমার জন্য খাবার তৈরি করতে হবে না। বাইরে যাচ্ছি আমি।’

ঠিক সেসময় মেরি ম্যালনি লোকটার পেছন পর্যন্ত হেঁটে যায়, একটু থামে, তারপর জমে বরফ হয়ে থাকা ভেড়ার পা-টা উপরে তুলে যতখাািন সম্ভব জোরে ওর মাথার পেছনে মারে। একটা লোহার দণ্ড দিয়েও এভাবে মারতে পারত ও।

কয়েক পা পিছিয়ে আসে ও, অবাক ব্যাপার চার থেকে পাঁচ সেকেন্ড একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে লোকটা। তারপর কার্পেটের ওপর পড়ে যায়।

ভেঙে পড়ার হিংস্‌্রতা, শব্দ, ছোট টেবিলটা উল্টে পড়া- সবকিছু যেন আচমকা আঘাতটা থেকে বের করে আনে ওকে। ঠান্ডা মেরে গিয়ে বিস্ময়ে ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পায় ও, শরীরটার দিকে তাকিয়ে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে, মাংসের টুকরোটা তখনও দু’হাতে শক্তভাবে ধরা।

তারপর আপন মনেই বলে, ঠিক আছে, ওকে খুন করেছি আমি।

হঠাৎ করে ওর মনের মধ্যে সবকিছু যেভাবে পরিস্কার হয়ে ওঠে, সেটা অস্বাভাবিক। খুব দ্রুত ভাবতে শুরু করে ও। একজন গোয়েন্দার স্ত্রী হিসেবে ওর জানা আছে শাস্তি কী হতে পারে। তবে তাতে কোনো পরিবর্তন হয় না ওর ভেতর। আসলে এটা একধরনের স্বস্তি। তাহলে বাচ্চাটার কী হবে? অনাগত সন্তানসহ খুনিদের ব্যাপারে আইন কী বলে? ওরা কি মা-সন্তান দুজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেয়? নাকি বাচ্চাটার জন্ম হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে? কী করে ওরা? জবাবটা মেরি ম্যালনির জানা নেই, তবে কোনো সুযোগ নিতে চায় না।

মাংসের টুকরোটা নিয়ে রান্নাঘরে যায় ও, একটা হাঁড়িতে রেখে ওভেনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় ওটা, চালু করে দেয় ওভেন। তারপর হাত ধুয়ে দৌড়ে ওপরতলায় যায়, আয়নার সামনে বসে সাজগোজ ঠিক করে, একটু হাসার চেষ্টা করে। হাসিটা অদ্ভুত দেখায়। আবারও চেষ্টা করে। শব্দ করে হাসিমুখে বলে, ‘হ্যালো স্যাম’। গলার স্বরটাও অদ্ভুত শোনায়। ‘কিছু আলু দাওতো স্যাম। আর হ্যাঁ, এক টিন শিমও দাও।’ এটা বেশ ভালো হয়েছে। হাসি আর গলার স্বরটা এখন আগের চেয়ে ভালো। আরও কয়েকবার মকশ করে। তারপর দৌড়ে নিচে নামে, কোটটা গায়ে চড়িয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বাগান পেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে ওঠে।

তখনও ছয়টা বাজেনি, পাড়ার দোকানটার আলো দেখা যাচ্ছে। দোকানের লোকটাকে হাসিমুখে বলে, ‘হ্যালো স্যাম’।

‘গুড ইভিনিং, মিসেস ম্যালনি। কেমন আছেন?’

‘কিছু আলু দরকার আমার প্লিজ স্যাম। আর হ্যাঁ, এক টিন শিমও লাগবে। প্যাট্রিক বলছে, ও খুব টায়ার্ড, বাইরে খেতে যেতে চাইছে না আজ। আপনি জানেন, বৃহস্পতিবারগুলোতে আমরা সাধারণত বাইরেই খাই, তাই ঘরে কোনো শাকসবজি নেই।’

দোকানি বলে, ‘তাহলে কিছু মাংসও নেবেন?’

‘না, থ্যাংকস, মাংস ঘরে আছে। ফ্রিজে একটা ভেড়ার পা ছিল।’

‘এই আলু চলবে তো মিসেস ম্যালনি?’

‘হ্যাঁ, চলবে। দুই পাউন্ড প্লিজ।’

দোকানি ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে চেয়ে বলে, ‘আর কিছু লাগবে? একটু ডেসার্ট নেবেন নাকি? কী ডেজার্ট দেবেন ওঁকে? একটা ভালো কেক কেমন হয়? জানি, কেক পছন্দ করেন উনি।’

ও বলে, ‘একদম ঠিক, সে পছন্দ করে।’

সবকিছু কেনাকাটা করে দাম মেটানোর পর সবচেয়ে সুন্দর হাসিটা দেয় ও, ‘ধন্যবাদ স্যাম, শুভরাত্রি।’

দ্রুত হেঁটে ফিরে আসতে আসতে আপন মনে বলে, স্বামীর কাছে ফিরে যাচ্ছে ও, সাপারের জন্য অপেক্ষা করছে লোকটা। খুব ভালো করে রান্না করতে হবে, যতখানি সম্ভব স্বাদ হয় যাতে, বেচারা খুব ক্লান্ত। ঘরে ফেরার পর অস্বাভাবিক বা ভয়ঙ্কর কিছু যদি দেখে, একটা বড় আঘাত পাবে ও, তখন দুঃখ আর ভয়ের প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। তবে ঘরে কিছুই অস্বাভাবিক দেখবে বলে মনে করছে না ও। স্বামীর জন্য ডিনার তৈরি করার জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জিনিসপাতি কিনে ঘরে ফিরে যাচ্ছে।

নিজের মনে বলে, এটাই উপায়। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে করতে হবে। অভিনয় করার কোনো দরকার নেই, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখতে হবে সব। পেছনের দরজা দিয়ে রান্নাঘরে ঢোকার সময় আপন মনে গুনগুন করে গান গায় ও।

জোরে ডাক দেয়, ‘প্যাট্রিক, কী খবর ডার্লিং?’

ঠোঙাগুলো টেবিলের ওপর রেখে লিভিং রুমে ঢোকে ও; লোকটাকে মেঝের ওপর পড়ে থাকতে দেখে সত্যি সত্যি আঘাত পায়। লোকটার জন্য সকল ভালোবাসা যেন ফিরে আসে, ছুটে গিয়ে শরীরটার পাশে বসে পড়ে, তারপর চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। খুব সহজ হলো কাজটা, কোনো অভিনয় করতে হয়নি।

কয়েক মিনিট পর উঠে গিয়ে ফোনের কাছে যায় ও। থানার নম্বরটা জানা ছিল, ওপাশের লোকটা ফোন উঠিয়ে জবাব দিলে কেঁদে উঠে বলে, ‘জলদি, জলদি আসুন, প্যাট্রিক মারা গেছে।’

‘কে কথা বলছেন?’

‘মিসেস ম্যালনি। মিসেস প্যাট্রিক ম্যালনি।’

‘আপনি বলছেন, প্যাট্রিক মারা গেছে?’

কেঁদে ওঠে ও, ‘আমার মনে হয়। মেঝেতে পড়ে আছে, মনে হয় মারা গেছে।’

‘ঠিক আছে, এক্ষুনি আসছি,’ লোকটা বলে।

খুব দ্রুতই গাড়িটা আসে। সামনের দরজা খুললে দু’জন পুলিশ ভেতরে আসে। দু’জনই চেনা। থানার প্রায় সবাইকে ও চেনে। কান্না সামলাতে না পেরে জ্যাক নুনানের হাতের ওপর গিয়ে পড়ে ও। জ্যাক ওকে ধরে সাবধানে চেয়ারে বসিয়ে দেয়।

চিৎকার করে বলে, ‘ও কি মারা গেছে?’

‘মনে হচ্ছে তা-ই। কী হয়েছিল?’

কয়েক কথায় দোকানে গিয়ে ফিরে আসার গল্পটা বলে ও, এসে ওকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে। কেঁদে কেঁদে যখন কথা বলছিল ও, তখন লাশের মাথায় শুকনো রক্ত দেখতে পায় নুনান। প্রায় দৌড়ে ফোনের কাছে যায় সে। তারপর আরও অনেকেই আসতে শুরু করে- একজন ডাক্তার, দুজন গোয়েন্দা, পুলিশের ফটোগ্রাফার, আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞ। গোয়েন্দারা একের পর এক প্রশ্ন করছিল। তবে খুব সদয় ব্যবহার করে ওরা। ওদের বলে মাংসটা কীভাবে ওভেনে ঢুকিয়েছিল, ‘এখনও ওটা আছে ওখানে’, তারপর কীভাবে পাড়ার দোকানে গিয়ে সদাইপাতি কিনে আনে, ফিরে এসে দেখে কীভাবে লোকটা পড়ে আছে মেঝেতে।

গোয়েন্দা দুজন অস্বাভাবিক চমৎকার ব্যবহার করে। এর মধ্যে বাড়িটায় তল্লাশি চালায় ওরা। জ্যাক নুনানও খুব ভদ্রভাবে দু-চারটা কথা বলে ওর সাথে। সে বলে, মাথার পেছনে কিছু দিয়ে আঘাত করে খুন করা হয়েছে ওর স্বামীকে। অস্ত্রটা খুঁজছিল ওরা। খুনি ওটা সাথে করে নিয়ে যেতে পারে, অথবা কোথাও ফেলে গেছে কিংবা লুকিয়ে রেখেছে। নুনান বলে, ‘সেই পুরোনো কাহিনি, অস্ত্রটা খুঁজে পেলে খুনিকেও পাওয়া যাবে।’

শেষে একজন গোয়েন্দা ওর পাশে এসে বসে জিজ্ঞেস করে, ও কি জানে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যতে পারে এমন কিছু ঘরে আছে কিনা? ও কি একটু উঠে খুঁজে দেখবে কিছু হারিয়েছে কিনা।

খোঁজ চলতেই থাকে। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে ততক্ষণে, প্রায় ৯টা বাজে। ঘরগুলো তল্লাশি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে লোকগুলো। ও বলে, ‘জ্যাক, একটু ড্রিংক দেবো? আপনারা যথেষ্ট ক্লান্ত নিশ্চয়ই।’

জ্যাক বলে, ‘ঠিক আছে, পুলিশের নিয়মে পড়ে না এটা, তবে আপনারা নেহাৎ বন্ধু বলে চলবে।’

গ্লাস হাতে দাঁড়ায় ওরা। গোয়েন্দা দুজন ওর কাছে অস্বস্তিতে পড়ে যায়, মন ভালো করার মতো কিছু বলতে চাইছিল যেন। জ্যাক নুনান একবার রান্নাঘরে ঢুকে দ্রুত বেরিয়ে এসে বলে, ‘মিসেস ম্যালনি, আপনার ওভেন এখনও জ্বলছে, মাংসটা ভেতরে।’

ও বলে, ‘ও হ্যাঁ, তাই তো। আমি ওটা বন্ধ করে দিচ্ছি বরং।’ অশ্রুভেজা চোখে ফিরে আসে ও। বলে- ‘একটা উপকার করবেন? আপনারা সবাই আছেন এখানে, সবাই প্যাট্রিকের বন্ধু, খুনিকে ধরার জন্য সাহায্য করছেন যথেষ্ট। আপনাদের খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই, সাপারের সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। আপনাদের কিছু খেতে দিইনি জানতে পারলে প্যাট্রিক কখনোই ক্ষমা করবে না আমাকে। ওভেনে চাপানো ভেড়ার মাংসটা আপনারা খেয়ে ফেলতে পারেন।’

নুনান বলে, ‘এটা স্বপ্নেও ভাবতে পারছি না।’

কাতর হয়ে ও বলে, ‘প্লিজ, আমি কিছুই মুখে তুলতে পারব না, আপনারা ওটা খেয়ে নিলে আমার সাহায্য হয়। তারপর আবার কাজ শুরু করতে পারেন।

গোয়েন্দা দুজন ইতস্তত করছিল, কিন্তু খিদেও পেয়েছিল ওদের। শেষ পর্যন্ত কিচেনে ঢুকে নিজেরাই খাবার নিয়ে নেয়। মহিলা যেখানে বসা সেখানেই ছিল। খোলা দরজা দিয়ে ওদের কথাবার্তা কানে আসছিল ওর। নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল ওরা, মুখের মধ্যে মাংস থাকায় গলা ভারি।

‘আরেকটু নাও চার্লি।’

‘না, সবটুকু শেষ করা উচিত হবে না।’

‘উনি চাইছেন আমরা শেষ করি এটা। তিনি বলেছেন সবটুকু যাতে খেয়ে ফেলি।’

‘বেচারা প্যাট্রিককে মারার জন্য বড়সড় একটা কিছু ব্যবহার করেছে খুনি। ডাক্তার বলছে ওর মাথার পেছনটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙেছে।’

‘এজন্যই অস্ত্রটা খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।’

‘আমারও একই কথা।’

‘যে-ই খুনটা করে থাকুক, এত বড় অস্ত্রটা সাথে করে নিয়ে যেতে পারেনি সে।’

‘আমার মনে হয়, বাড়ির কাছাকাছি কোথাও পাওয়া যাবে।’

‘হয়তো আমাদের ঠিক নাকের ডগাতেই আছে ওটা। তোমার কি মনে হয় জ্যাক?’

অন্য ঘরে বসে মেরি ম্যালনি হাসতে শুরু করে তখন।

 

সমকাল

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন