ইতিহাসের বুকে নারীর অবদানের কথা উচ্চারণ করতে গেলে প্রথম সারিতেই ভেসে ওঠে এক পবিত্র দলিলের নাম—উম্মুল মুমিনীনগণ। তাঁরা শুধু মহানবী (সা.)-এর গৃহিণী ছিলেন না; বরং ইসলামী সভ্যতা নির্মাণে, রাষ্ট্রচিন্তায়, নৈতিক শিক্ষায় ও জাতীয় রাজনীতিতে তাঁদের অবদান ইতিহাসকে সমুজ্জ্বল করেছে। একদিকে তাঁরা ছিলেন পরিবারের অভ্যন্তরে নবীজির মিশনের সহযাত্রী, অপরদিকে পালন করে গিয়েছেন রাষ্ট্র ও সমাজে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভূমিকা। তাঁদের অবদান অনুধাবন করলে আজকের নারীর দায়িত্ব ও সম্ভাবনার দিগন্তও উন্মোচিত হয়ে যায়।
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদাহ আয়েশা (রা.) ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি কেবল হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং উঠে এসেছেন রাজনৈতিক আলোচনারও কেন্দ্রবিন্দুতে। জঙ্গে জামাল বা উষ্ট্রীর যুদ্ধের ঘটনা ইতিহাসের এক গুরুতর অধ্যায়, যেখানে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক মতাদর্শে সক্রিয় অংশ নেন। যদিও সেই যুদ্ধ নিয়ে মুসলিম ইতিহাসে ভিন্নতর অনেক কথা রয়েছে, সেগুলো আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় নয়।
কাজেই সে দিকে আলোকপাত করতে চাই না। তবে সেখানে তাঁর উপস্থিতি ও যুদ্ধের নেতৃত্ব নারীর রাজনৈতিক সচেতনতার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। শুধু অংশগ্রহণই নয়, বরং তিনি পর্দার বিধান অটুট রেখে রাজনৈতিক বিষয়ে পুরুষ সাহাবিদের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করতেন এবং জনমতের নেতৃত্ব দিতেন। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদাহ উম্মে সালামা (রা.) ছিলেন রাষ্ট্রনীতির এক সূক্ষ্ম পরামর্শদাত্রী।
ইতিহাস বলে নবীপত্নীগণের মধ্যে আয়েশা (রা.)-এর পর সবচেয়ে বিচক্ষণ ও প্রাজ্ঞ নারী ছিলেন সাইয়্যিদাহ উম্মে সালমা (রা.)। এই মহীয়সী নারী চতুর্থ হিজরিতে মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী হয়ে আসার পর থেকে বিভিন্ন সময় জাতীয় জীবনের জটিল সমস্যা সমাধানে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। যার কারণে ইতিহাস তাঁকে রাষ্ট্র প্রধানের রাজনৈতিক উপদেষ্টার মর্যাদায় স্মরণ করে থাকে। ষষ্ঠ হিজরিতে মহানবী (সা.) মক্কা অভিযানের উদ্দেশ্যে ১৪০০ সাহাবির বিরাট বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে তিনি কোরাইশদের বাধার সম্মুখীন হন।
নানা ঘটনাচক্রের পর মুসলিম শিবির থেকে মক্কার ধনাঢ্য ব্যক্তি উসমান ইবনে আফফান (রা.) ও কোরাইশ শিবির থেকে সুহাইল ইবনে আমরের দুতিয়ালিতে একটি শান্তির চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। হোদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদনের পর মহানবী (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন, তোমরা কোরবানির পশু জবাই করো। মাথার চুল ছেঁটে ফেলো। ইহরাম খুলে স্বাভাবিক হয়ে যাও। কিন্তু আশ্চর্য যে যারা নিজের জান বাজি রেখে তাঁর নির্দেশে প্রাণ দিতে হুদাইবিয়া প্রান্তর পর্যন্ত এসেছেন, তাঁরা এখন আদেশ পালনে তৎপর হচ্ছেন না। মহানবী (সা.) আদেশটি তিনবার ঘোষণা করলেন। কিন্তু কেউ আদেশ পালনে অগ্রসর হলো না। এ অবস্থা দেখে তিনি বিষন্ন মনে তাঁবুতে ঢুকে উম্মে সালামাকে লোকদের অবস্থার কথা জানালেন। নেতৃত্বের আনুগত্য ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর চেয়ে গভীর ও জটিল সংকট আর কিছু হতে পারে না।
এই সংকট সমাধানে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে এলেন উম্মে সালামা (রা.)। তিনি বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি কি চান যে তারা আপনার আদেশ পালন করুক। তাহলে আপনি তাদের কারো সঙ্গে একটি কথাও বলবেন না। শুধু সবার সামনে গিয়ে আপনার উটনীটি নহর (জবাই) করুন। তারপর আপনার মাথা মুণ্ডানোর ব্যবস্থা করুন। এই পরামর্শ পেয়ে তিনি তাঁবু হতে বের হলেন এবং কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে নিজের উটনী নহর করে মাথা মুণ্ডন করলেন। লোকেরা যখন এই দৃশ্য দেখল, সবাই তাদের কোরবানির পশু নহর করল। একজন আরেকজনের মাথা মুণ্ডন শুরু করল। এতক্ষণ তারা ভাবছিল যে মুশরিকদের সঙ্গে দৃশ্যত অবমাননাকর চুক্তি হয়তো পুনর্বিবেচনা হবে, তাই তারা আদেশ পালনে গরিমসি করছিল। কিন্তু যখন প্রমাণিত হলো যে নবী (সা.) তাঁর সিদ্ধান্ত ও আদেশের ব্যাপারে অবিচল। তখন তারা সেই আদেশ পালনে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। বস্তুত জাতীয় জীবনের সমস্যা সমাধানে উম্মে সালমার এই বিচক্ষণতা ও ভূমিকা মুসলিম মহিলাদের জন্য সমাজ ও জাতীয় জীবনের সমস্যা সমাধানে অবদান রাখতে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদাহ হাফসা (রা.) ছিলেন কোরআনের সংরক্ষক। দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা.)–এর কন্যা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় বিষয়ে বিশেষ নজরদারি করতেন। হযরত আবু বকর (রা.) ও পরবর্তীতে উসমান (রা.) কোরআনের কপি প্রণয়নের কাজ তাঁর সংরক্ষিত পান্ডুলিপির ওপর নির্ভর করেই সম্পন্ন করেন। এক অর্থে বলা যায়, ইসলামী রাষ্ট্রের আইনসংহিতা হিসেবে কোরআন সংরক্ষণের পেছনে তাঁর ভূমিকাই ছিল ঐতিহাসিক ভিত্তি।
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদাহ জয়নাব, হযরত সাওদা কিংবা সাইয়্যিদা মায়মুনা রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না। তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন জনসেবামূলক কাজ ও দানশীলতার প্রতীক। তাঁদের উদারতা শুধু পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমাজে অসহায় মানুষের কল্যাণে তাঁরা রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তিকে দৃঢ় করেছেন। তাঁদের জীবন থেকে স্পষ্ট হয়, জাতীয় রাজনীতি কেবল যুদ্ধ–চুক্তি বা শাসনব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের মন ও সমাজকে নির্মাণের মধ্য দিয়েও রাজনীতি বিকশিত হয়।
উম্মুল মুমিনীনগণের অবদান থেকে আজকের সমাজ ও রাষ্ট্র অনেক কিছু শিখতে পারে। তাঁরা দেখিয়েছেন, নারী কেবল গৃহের রক্ষণাবেক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা রাষ্ট্রচিন্তা, আইন সংরক্ষণ, যুদ্ধ–শান্তি আলোচনা, নৈতিক দিকনির্দেশনা—প্রতিটি ক্ষেত্রে হিজাবের বিধান অটুট রেখেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রতিটি যুগের নারীদের সামনে উম্মুল মুমিনীনগণের জীবন এক মহাসড়কের মতো, যেখানে সমকালীন নারীরা নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে পেতে পারে।
জাতীয় রাজনীতির ইতিহাস তাই কেবল পুরুষের নয়, বরং নারী–পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠা এক মহৎ সেতু। উম্মুল মুমিনীনগণ সেই সেতুর অপরিহার্য স্তম্ভ। তাঁদের অবদানকে স্মরণ করা মানে কেবল অতীতের ইতিহাস পাঠ করা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য আলোর দিশা খোঁজা।
আল্লাহ আমার সকল বোনদের জীবনকে উম্মুল মুমিনীনগণের জীবনাদর্শের ভিত্তিতে পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমীন।
