
‘মিথ্যে হাসি রাইখা মুখে থাকি গলুই ধারে, কেউ বুঝেনা কেউ খোঁজেনা, বাঁচি কেমন করে!’ গানটি নৌকার মাঝিদের। গানের সুরে তারা তুলে ধরেন তাদের জীবনকথা। সুরের তালে উঠে আসে সুখ-দুঃখের কথা। তবে বর্তমান সময়ে নৌকার মাঝিদের মুখে শোনা যায় না এই ভাটিয়ালি, সারিগান। তাদের মুখে এখন শুধু চিন্তার ছাপ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিই এর কারণ।
সারা দেশে বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ ‘সাদাপাথর’। ভোলাগঞ্জ নৌকা ঘাট থেকে সাদা পাথরে যাতায়াত করার একমাত্র উপায় ইঞ্জিন চালিত নৌকা।
সাদা পাথর পর্যটন কেন্দ্রকে ঘিরে প্রায় দেড়শত নৌকা পর্যটক পারাপারের কাজ করেন। একটি নৌকাতে দুইজন মাঝি থাকেন। প্রতিদিন নৌকা প্রতি ২/৩ টিপ দিতে পারেন। সরকারি ছুটির দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি টিপ হয়।
আয় নির্ভর করে পর্যটক আসার উপরে। পর্যটক আসা যাওয়া করলেই পরিবারে চুলায় জ্বলে আগুন। তবে এ কাজটা এখন কঠিনপ্রায়। স্বল্প আয়ের বিপরীতে সকল দ্রব্যের চড়া দাম!
সাদাপাথর নৌকা ঘাটের মাঝিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশে একের পর এক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে স্বল্প আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। দিন আনা দিন খাওয়া এই মাঝিদের কাছে প্রতিটি দিনই যেন যুদ্ধের নামান্তর। টিপ প্রতি পর্যটকদের কাছ থেকে ইজারাদার বা খাস কালেকশনে যারা দায়িত্বে থাকেন তারা আদায় করেন আটশত টাকা। সেই টাকা থেকে মাঝিদের দেওয়া হয় টিপ প্রতি তিনশট টাকা। একটি নৌকায় দুইজন মানুষের খাটুনি, দুপুরের খাওয়া, ইঞ্জিনের ডিজেল খরচ বাদ দিয়ে কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা তাদের।
অন্যান্য সময়ে পর্যটক বেশি আসতো কোন রকম পুষিয়ে নিলেও, গেলো কয়দিন আগে সিলেটে টানা তিনবারের বন্যা এবং বর্তমানে ছাত্র আন্দোলনের কারণে পর্যটক আসেন না। ফলে কমেছে আয়।
সাদা পাথর পর্যটন ইঞ্জিন চালিত নৌকার মাঝি যুব সমিতি (রেজিঃ যুব/০১০০) এর পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনের কাছে নৌকার ট্রিপ প্রতি তিনশত টাকা থেকে বৃদ্ধি করে চারশত টাকা করার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করে আবেদন করলেও মেলেনি কোন প্রত্যাশা। আজ (২১ আগস্ট) সকাল ৯ টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌকার মাঝিরা ধর্মঘটের ডাক দেয়৷ যার ফলে ভোগান্তিতে পড়েন পর্যটকরা। দুপুর দেড়টায় সাদা পাথরে আসা পর্যটকরা নৌকার মাঝিদের নিয়ে উপজেলা পরিষদে আসেন৷ দুপুর ৩টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করে সাময়িক ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নৌকার মাঝিরা।
নৌকার মাঝিরা জানান, ঘাট কর্তৃপক্ষ নৌকার টিপপ্রতি পর্যটকদের কাছ থেকে নেন ৮০০ টাকা। তা থেকে মাঝিদের দেওয়া হয় ৩০০ টাকা। এ ৩০০ টাকার মধ্যে তাদের তৈল ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। এজন্য মাঝিরা ৩০০ টাকা বাড়িয়ে ৪০০ টাকা করার দাবি জানান। এ দাবি নিয়ে সোমবার আবেদন নিয়ে গেলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হরলাল বাবু ফিরিয়ে দেন। পরদিন মঙ্গলবার সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গেলেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের কোনো সাড়া না পাওয়ায় ধর্মঘট ডাকেন তাঁরা।
সাদাপাথর পর্যটন ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাঝি যুব সমিতির সাধারণ সম্পাদক মইন উদ্দীন বলেন, ইউএনওর আশ্বাসে সাময়িক সময়ের জন্য আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছি। আমাদের জন্য সুপারিশ করতে সাথে অনেক পর্যটক ছিলেন, দুইজন’কে আটকে রাখা হয়েছিলো। পরে অবরুদ্ধ দুই পর্যটককে সন্ধ্যায় ছেড়ে দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবিদা সুলতানা বলেন, আলোচনা করে সমস্যার সমাধান হয়েছে।