বাজেট নিয়ে ড. মোমেন যা বললেন

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এমপি জাতীয় বাজেট নিয়ে তার মতামত তোলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, জাতীয় বাজেট শুধু বার্ষিক আয়-ব্যায়ের হিসাব নয়, বরং বর্তমান প্রেক্ষিতে বাজেট দেশের জনগণের আস্তা এবং বিশ্বাস অর্জনের হাতিয়ার। সরকারের ভিশন ও লক্ষ্য অর্জনে বাজেট শুধু দিক নির্দেশনার মধ্যেই সীমিত নয়, বরং সরকার দেশের প্রবৃত্তি অর্জনে, সম্পদ আহরণে, বা অন্যবিধ সমস্যা সমাধানে কি কি উদ্যোগ নিচ্ছেন বা নিবেন, এবং দেশবাসীর প্রত্যাশা কিভাবে পূরণ করছেন বা করবেন তার দিক নির্দেশনা থাকবে। এবারে বাজেট পেশের পর পরই বাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা হচ্ছে যার অর্থ সরকারি কর্মচারীরা যে বাজেট তৈরী করেছেন তা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বা আস্থা অর্জনে সফলকাম এখনও হয়নি। বরং সৎপথে যারা অর্থ উপার্জন করবে তাদের উপর টেক্স ধার্য হয়েছে শতকরা ৩০% ভাগ এবং যারা অসৎ উপায়ে বা ঘুষ-চুরি করে উপার্জন করবে তাদের টেক্স হচ্ছে ১৫% বা অর্ধেক। জনগণ মনে করে এর মাধ্যমে দূর্নীতি আরো বাড়বে, টাকা পাচার ও আরো বাড়বে। কালো টাকার একটি অংশ হচ্ছে মার্কেট দাম এবং সরকারি নির্ধারিত দামের ক্ষেত্রে বিরাট ফারাক। সুতরাং জমি বিক্রি, বাড়িঘর বিক্রি ইত্যাদির ক্ষেত্রে market price এ বিক্রি করে আয়কর নির্ধারণে একই price গ্রহণ করলে কালো টাকার এত বাড়াবাড়ি বা দৌরাত্ম্য হতো না।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান প্রতিকূল পরিবেশে বাজেট তৈরী করা মোটেই সহজ নয়। দেশে বড় বড় সমস্যা যেমন (১) মুদ্রাস্পীতি কমানো, (২) অধিকতর কর্ম সংস্থান বৃদ্ধি, (৩) রাজস্ব বৃদ্ধি, (৪) ব্যাঙ্ক ঋণ কমানো যাতে crowding-out effect না দেখা দেয়, অর্থাৎ সরকার ব্যাঙ্ক থেকে সব ঋন নিয়ে নিলে ব্যবসায়ীরা কোনও ঋন পাবে না এবং তারাই তো বিনিয়োগ করে কর্মসংস্থান বাড়ায় তা পারবে না, (৫) প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা বা বাড়ানো, (৬) বিনিয়োগ বাড়ানো, (৭) ব্যাঙ্ক ব্যবস্থায় আস্তা ফিরানো, (৮) মানুষের প্রত্যাশা পূরণ, ইত্যাদি। এবারের বাজেটে এগুলো আলোচনায় এসেছে, তবে বাস্তব ভিত্তিক পদক্ষেপ নেই যারফলে জনমনে এত নিরাশা।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত অনেকগুলো বাজেট দিয়েছেন এবং তাঁর বাজেটগুলোতে লক্ষ্য, দিক নির্দেশণা এবং বিভিন্ন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া তাতে নতুন নতুন ইনোভেশন বা চমক ছিল। যেমন, জেন্ডার বাজেটটিং, জেলা বাজেট, শিশুদের বাজেট, Public-Private Partnership, decentralization of budget, ইত্যাদি। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা চান, অর্থাৎ জনগণকে এসব চেলেঞ্জ মোকাবিলায় সম্পৃক্ত করা তা তার বাজেটে ছিল। তিনি একাধিক গৌস্টির সাথে আলাপ আলোচনা করে তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজেট প্রস্তূত করতেন। এবারের বাজেট প্রস্তাবনায় তা লক্ষিত হয়নি । এই প্রতিকূল পরিবেশেও কোনও চমক নেই বা আশার দিকনির্দেশণা নেই।

ড. মোমেন বলেন, গেল দেড় বছর ধরে দ্রব্যমূল্য কমানোর জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু তা সত্বেও দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে পারছে না আর আগামী ছয় মাসে তা ৯.৭% থেকে ৬.৫% নেমে আসবে তা জনগণ বিশ্বাস করতে পারছে না। তাছাড়া রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন দরকার তা এবাজেটে অনুপস্থিত। প্রচলিত নিয়মে যারা আয়কর দেয় তাদের উপর আরো অধিকতর করের ভোজা আরোপিত হবে এবং দেশের বৃহত্তর জনগণ এবাজেটে করের আওতামুক্ত থাকবে এটা দেশের জন্য মঙ্গলকর নয়। করজালের পরিধি এবং রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন যারাই জাতীয় পরিচয় পত্র (NID) আছে তাকেই টেক্স রিটার্ন দাখিল করা এবং বর্তমান TIN নম্বর কোম্পানিরগুলোর জন্য বরাদ্দ করা। ডিজিটাল বাংলাদেশে এনিয়ম চালু হলে টেক্স বেইস কয়েকগুণ বাড়বে এবং রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ও অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে বৈ কি। তাহলে সরকারকে অধিকতর ঋণের ভোজা বহন করতে হবে না। প্রাক্কালন অনুযায়ী বর্তমান নিয়মে আয়ের শতকরা ২৩% ভাগই ঋণের সুদ বাবদ ব্যয়িত হবে যা দেশের জন্য সুখকর নয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন