৪ হাজার কোটির প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ শাবিপ্রবি শিক্ষকদের

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে হাইয়ার এডুকেশন অ্যাকসেলেরেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার গবেষণা অনুদান বাছাই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পক্ষপাত, যোগ্যতা বিবেচনায় ঘাটতি ও ব্লাইন্ড রিভিউয়ের নামে প্রহসনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

এ প্রকল্পের গবেষণা প্রস্তাব বাছাই প্রক্রিয়ায় নন-এক্সপার্টদের দিয়ে গবেষণা প্রস্তাবনা রিভিউ করা ও প্রেজেন্টেশন নেওয়া, রিভিউয়ারদের মতামত ও স্কোর উপেক্ষা করা, গবেষণা সাইটেশন ও সম্পকির্ত ফিণ্ডে এক্সাপার্টদের মূল্যায়ন না করা, উচ্চপ্রোফাইল গবেষকদের বাদ দিয়ে নিম্নপ্রোফাইল আবেদনকারীদের ফান্ড বরাদ্দ দেওয়া, সময়সীমা অবৈধভাবে বাড়ানো এবং প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রকল্প পাওয়া গবেষকদের কাছে বাজেটের নির্দিষ্ট অংশ কাটমানি আকারে দাবি করার মতো অভিযোগ তুলে এই প্রকল্পের পূর্ণ মূল্যায়ন ও তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান তারা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বিক্ষুব্ধ শিক্ষক সমাজের ব্যানারে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ তুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞ গবেষক।

উচ্চশিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন, দেশীয় গবেষণা উন্নয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং বৃদ্ধির লক্ষ্যে হিট প্রকল্পের নামে বিশ্বব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের এ অর্থ ঋণ নেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।

লিখিত বক্তব্যে রিভিউ প্রক্রিয়ার অসঙ্গতি নিয়ে পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, “হিট প্রকল্পের রিভিউ বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া ছিল গোপনীয় ও অস্বচ্ছ। কারা রিভিউয়ার ছিলেন, কীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বা তাদের যোগ্যতা কী? এসব প্রকাশ করা হয়নি। এ প্রকল্পে অনেক আবেদন নিজ বিভাগের সহকর্মীদের প্রজেক্ট রিভিউ করেছেন, যা স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব।”

“এছাড়া অনেক রিভিউয়ার পিএইচডি ডিগ্রিধারী নন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় যুক্ত নন। রিভিউ রুব্রিকসে প্রোজেক্টের প্রটোকল ও মেথডোলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উপেক্ষিত ছিল। রিভিউয়ে শক্তি-দুর্বলতা নিরূপণ, পরামর্শমূলক মন্তব্য বা সংশোধনের পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ ছিল না, যা প্রকল্প মূল্যায়নের ন্যূনতম মানদণ্ড। রিভিউয়ারদের অনেকে আমাদের বলেছেন ৮০+ নম্বর পাওয়া প্রজেক্ট বাদ পড়েছে অথচ ৫৫-৬৫ স্কোর পাওয়া প্রজেক্ট ফান্ড পেয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ”

তিনি বলেন, “ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান দাবি করেছেন এ হিট প্রজেক্টে ব্লাইন্ড পিয়ার রিভিউ করা হয়েছে । কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি আবেদনেই আবেদনকারীর নাম, বায়োডাটা ও গবেষণা প্রকাশনা সংযুক্ত ছিল, যা রিভিউয়াররা দেখতে পেয়েছেন। ফলে এটি কোনোভাবেই ব্লাইন্ড রিভিউ ছিল না। তাছাড়া রিভিউয়ার কার প্রজেক্টে কত স্কোর দিয়েছেন এবং কেন দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। যা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”

প্রেজেন্টেশন মূল্যায়ন প্রসঙ্গে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, “ হিট প্রকল্পের অপারেশন ম্যানুয়াল ৪.৬.১১ অনুযায়ী শুধু ইউন্ডো ৩ সাব-প্রজেক্টের ক্ষেত্রে প্রেজেন্টেশন গ্রহণযোগ্য ছিল, কিন্তু অন্যান্য উইন্ডোতেও প্রেজেন্টেশন নেয়া হয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত। রুব্রিকে প্রেজেন্টেশনের মূল্যায়ন বা স্কোরিংয়ের কোনো নির্দেশনা ছিল না, তবুও অনেক মানসম্পন্ন প্রজেক্ট শুধুমাত্র প্রেজেন্টেশনভিত্তিক বাদ পড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা উপস্থাপিত গবেষণার বিষয়ে অনভিজ্ঞ ছিলেন। তাঁরা প্রাসঙ্গিক নয় এমন প্রশ্ন করে গবেষকদের বিভ্রান্ত ও বিব্রত করেছেন।”

বিভাগভিত্তিক বৈষম্য প্রসঙ্গে শাবিপ্রবির রসায়ন বিভাগের বিজ্ঞ গবেষক অধ্যাপক মো. আবুল হাসনাত বলেন, একই বিভাগের একাধিক প্রকল্প প্রাথমিকভাবে সিলেক্টেড হলেও একটিকে অনুমোদন ও অন্যগুলোকে অকারণেই বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও সেগুলোর মান ছিল উত্তম। অথচ আবেদনকারীদের এই নীতির বিষয়ে আগে কিছুই জানানো হয়নি।”

তিনি বলেন, “হিট প্রকল্পে অনেক নিম্ন-প্রোফাইল আবেদনকারী ও গবেষককে প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছে, যাদের উল্লেখযোগ্য গবেষণা বা আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা নেই। অনেকেরই পিএইচডি নেই, আবার যারা রিভিউ করেছেন, তাঁদের অনেকের প্রোফাইলও যাচাইযোগ্য নয়। গবেষণার মান যাচাইয়ে স্কোপাস,ডব্লিউওএস, অর্কিড ব্যবহার না করে শুধু গুগল স্কলারের ডাটা দেখা হয়েছে, যা অনির্ভরযোগ্য এবং ভুয়া সাইটেশন থাকার সম্ভাবনা থাকে।”

“অনেক প্রকল্পেই নতুনত্ব, গবেষণা সমস্যা বা বাস্তব অবদান নেই, এগুলো মূলত রুটিন কাজ মাত্র। অন্যদিকে, দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, বুয়েট) রসায়ন বিভাগের বিশ্বমানের গবেষকদের প্রকল্প বাদ পড়েছে, যাদের আইএসআই জার্নালে শতাধিক প্রকাশনা ও হাজার হাজার সাইটেশন রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বিপরীতে, একটি দুর্বল প্রোফাইল (মাত্র ৬টি জার্নাল, ৩১ সাইটেশন) থাকা গবেষককে রসায়নে প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি নিজেই প্রস্তাবিত বিষয়ের সঙ্গে জড়িত নন। এমনকি একজন নতুন গবেষক, যার আগে কোনো প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই, তাঁকেই ১০ কোটি টাকার প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে জনগণের টাকার অবিচার ও অপচয়।”

সংবাদ সম্মেলনে শাবিপ্রবির জৈব প্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “কিছু ইন্ডাস্ট্রি-কলাবোরেশন প্রজেক্ট ফান্ডিং পেয়েছে যেখানে কোনো ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারের সঙ্গে বাস্তবায়ন সংক্রান্ত চুক্তির ডকুমেন্ট ছিল না। পার্টনারের স্বাক্ষর ছাড়া নাম জমা দেওয়ায় এটি অনৈতিক ও বিভ্রান্তিকর। এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রেই প্রধান গবেষক হিসেবে এমন কেউ ছিলেন যিনি পূর্বে এ ধরনের কাজ করেননি।”

বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগভিত্তিক বৈষম্য তিনি বলেন, “অনেক বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি, যেমন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ভালো মানের গবেষক রয়েছেন। অন্যদিকে, ক্ষমতাহীন বা ইউজিসি নজরদারিতে থাকা কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অপ্রতুল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, যা যৌক্তিক ব্যাখ্যার বাইরে এবং সন্দেহজনক।

তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাংকের চলমান প্রকল্পের সামান্য পরিবর্তন করে পুনরায় জমা দিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, যা নৈতিক ও গবেষণা নীতির পরিপন্থী। এছাড়া প্রজেক্ট জমার শেষ সময় ছিল ১০ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু কোনো ঘোষণা ছাড়া ১১ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২ টা পর্যন্ত এ সময় বাড়ানো হয়েছে। এতে যারা সময়মতো জমা দিয়েছেন তারা প্রায় ১২ ঘণ্টা কম সময় পেয়েছেন, যা স্পষ্ট বৈষম্য এবং অনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।”

প্রকল্প বাছাই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি বলেন, “হিট প্রকল্প পরিচালনায় সাবেক মন্ত্রী নওফেলের নিয়োগ ও পরিচালকের রাজনৈতিক পক্ষপাত দৃশ্যমান। নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা প্রজেক্ট রিভিউ ও অনুমোদনে প্রাধান্য পেয়েছেন।”

“শর্টলিস্ট হওয়া প্রকল্পগুলোর প্রেজেন্টেশন সভায় বোর্ড সদস্যরা প্রাসঙ্গিক একাডেমিক প্রশ্ন না করে অবমাননাকর ও আক্রমণাত্মক আচরণ করেছেন। জাতীয় অজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে সম্মানিত শিক্ষক ও গবেষকদের সামনে অপমান করা হয়েছে।”

এ হিট প্রকল্পের রিভিউ ও ব্যবস্থাপনায় অর্থের অপচয়ের বিষয়ে অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বিভিন্ন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ভিত্তিক রিভিউয়ার নিয়োগ ও অনৈতিকভাবে একাধিক প্রজেক্ট রিভিউ হয়েছে। এখানে অনেক রিভিউয়ারকে পরিচিতজনের প্রজেক্ট রিভিউ করানোর মাধ্যমে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে। এছাড়া চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত প্রজেক্টগুলোর বাজেট থেকে ১০-১৫% অর্থ ইউজিসি কর্মীদের জন্য সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও প্রকিউরমেন্ট খাতে বাধ্যতামূলক রাখতে বলা হয়েছে। যা হিট প্রকল্পের ম্যানুয়ালে উল্লেখ ছিল না। এই নির্দেশনা এবং প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থের অনৈতিক অপচয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থসাধনের জন্য এই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে ।”

সম্মেলন শেষে শিক্ষকরা তিনটি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো- সুষ্ঠু প্রক্রিয়া অবলম্বন না করায় নির্বাচিত প্রজেক্টসমূহ বাতিল করতে হবে, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন, প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক আসাদুজ্জামান ও প্রকল্প পরামর্শক অধ্যাপক মোজাহার আলীকে জবাবদিহীতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাদের যথোপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুনকরে যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে রিভিউ করে প্রজেক্ট নির্বাচন করতে হবে।

এসময় শিক্ষকরা তাদের দাবিসমূহ না মানা হলে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন করবেন বলে জানান তারা।

এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন শাবিপ্রবির রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন ও পলিটিক্যাল স্টাডিজের বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক।

এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক তানজিম উদ্দিনকে একাধিক বার মুঠোফোনে কল দিলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন