ষাটোর্ধ্ব খলিল মিয়ার দিন শুরু হয় এক অদ্ভুত কসরত দিয়ে। দুই বগলে দুটি কাঁচা লাউ চেপে ধরে, থরথর করে কাঁপতে থাকা চার ইঞ্চি চওড়া এক ফালি বাঁশের ওপর পা ফেলেন তিনি।
নিচে কুচকুচে কালো, তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত নড়াই নদের পানি। একটু পা হড়কালেই অবধারিত মৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্ব। এটি কোনো দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের বা ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ শোর দৃশ্য নয়। খোদ রাজধানী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাস্তবতার এক ঝলক মাত্র।
খাতা-কলমে এই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা ‘মেগাসিটি’ ঢাকার অভিজাত ট্যাক্সপেয়ার নাগরিক! এখানকার ১২টি গ্রামের লাখো মানুষের ভাগ্য আজও ঝুলে আছে ডজনখানেক নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোতে। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্ব। অথচ এখানকার বাসিন্দারা যেন গত শতাব্দীর কোনো পাতায় আটকে আছে। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পরও এখানে যাতায়াতের প্রধান বাহন—বাঁশ!
উন্নয়নের মরীচিকায় বন্দি জীবন: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২০১৭ সালে এই এলাকাগুলোকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়া হয়।
তখন থেকেই তারা ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। এলাকাবাসী ভেবেছিল তাদের ভাগ্য বোধ হয় এবার বদলাবে। নাগরিক জীবনের সুবিধার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল প্রতিটি নির্বাচনী ইশতেহারে। স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এই ২০২৬ সালে এসেও যাতায়াতের এই চিত্র সেভাবে বদলায়নি। নড়াই ও দেব ধোলাই নদের ওপর এই বাঁশের সাঁকোগুলোর বয়স প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর।
বছরের পর বছর ধরে এক সাঁকো ভেঙে আরেক সাঁকো তোলা হয়। প্রতিটি সাঁকোর গড় দৈর্ঘ্য ১৫০ থেকে ৩০০ ফুট এবং প্রস্থ মাত্র আড়াই থেকে তিন ফুট।
সরেজমিনে গিয়ে ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সীমানাভুক্ত খিলগাঁও থানার অধীন এক বিশালঅঞ্চল আজ নগরসভ্যতার বাইরে। নড়াই ও দেব ধোলাই নদ মূলত বালু নদীর দুটি শাখা। এগুলো এই অঞ্চলের নাসিরাবাদ, গৌড়নগর, বাবুর জায়গা, জোরভিটা, লায়নহাটি, শেখের জায়গা, বালুরপাড়, ফকিরখালী, ইদেরকান্দি, দাসেরকান্দি এবং ত্রিমোহনীর প্রায় এক ডজন গ্রামের লাখো মানুষের যাতায়াতের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন এই রুট ব্যবহার করে খিলগাঁও, বাসাবো কিংবা মতিঝিলের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে হয় হাজার হাজার কর্মজীবী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীর।
কর থাকলেও সেবা নেই: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাসিরাবাদ ইউনিয়ন ভেঙে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এই এলাকার মানুষের ট্যাক্সের বোঝা বেড়েছে প্রায় তিন থেকে পাঁচ গুণ। আগে যেখানে ইউনিয়ন পরিষদে নামমাত্র কর দেওয়া হতো, এখন সেখানে প্রতিটি পরিবারকে বছরে হাজার হাজার টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স গুনতে হচ্ছে। এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ব্যবসার ওপর ডিএসসিসিকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছে এখানকার বাসিন্দারা। সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। বালু নদীঘেঁষা বালুরপাড় গ্রাম। এ গ্রামের দবির কাজী বলেন, ‘ঢাকায় বাস করেও যেন মনে হয় কোনো দ্বীপে আছি। রাস্তা আছে, কিন্তু সরু। রাস্তার মাঝখানে অনেক বৈদ্যুতিক খুঁটি। ফলে বাঁশের সাঁকোই আমাদের ভরসা। কয়েক বছর আগে আমার বাবা মারা গেছেন বিনা চিকিৎসায়।’
গৌড়নগর গ্রামের ৫৮ বছর বয়সী ট্রলারের মাঝি সামসুল হক আক্ষেপ করে বলেন, ‘কত্তো এমপি আইলো আর গেলো, কেউ সেতু কইরা দেয় না। হগলতে ইলেকশন আইলে কয়, সেতু কইরা দিবো। আর খবর থাহে না।’
নাসিরাবাদ স্কুলের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার। তার বাড়ি ইদেরকান্দি এলাকায়। সে বলে, ‘বৃষ্টি হলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ। সাঁকো পার হওয়ার সময় ভয়ে বুকের ভেতরটা কাঁপতে থাকে। আমার বান্ধবীর ছোট ভাই গত বছরের বর্ষায় এখান থেকে পড়ে গিয়ে হাতে চোট পেয়েছিল।’
আছে সাঁকোর টোল বাণিজ্য: স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সাঁকোগুলো কোনো সরকারি অনুদান বা সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে চলে না। এগুলো পরিচালনার পেছনে রয়েছে এক সুনির্দিষ্ট ‘সাঁকো অর্থনীতি’। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও যুবকের সমন্বয়ে তৈরি সিন্ডিকেট এই সাঁকোগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। পারাপারের জন্য জনপ্রতি পাঁচ টাকা হারে টোল আদায় করা হয়। সাইকেল বা হালকা মালপত্র থাকলে টোলের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ টাকা। প্রতিদিন একেকটি সাঁকো থেকে গড়ে তিন থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত টোল আদায় হয়। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় লাখ টাকার ওপরে। সরকারি কোনো তদারকি না থাকায় সাঁকো মেরামতের দায়িত্ব পালন করে স্থানীয় বাসিন্দারা এবং টোল আদায়কারী সিন্ডিকেট।
সাঁকো যখন অভিশপ্ত : স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সাঁকো এখন আর শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়, এটি যেন একটি মৃত্যুকূপ। গত পাঁচ বছরে এই সাঁকো পার হতে গিয়ে কিংবা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে অন্তত ২১ জন মুমূর্ষু রোগী। গত ২০২৪ সালে সাঁকো থেকে পড়ে গৌড়নগর গ্রামের শফি মিয়া (৬৫) মারা যান। ২০২৫ সালে সাঁকো পার হতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফাতেমা বেগম (১০) পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। ২০২৬ সালের গত ছয় মাসে ছোট-বড় অন্তত ৯টি দুর্ঘটনার তথ্য জানা গেছে। বালুরপাড় এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স আমরা ঠিকই দিই, কিন্তু আমরা সুবিধা পাই না।’
এই এলাকার সমস্যাগুলো নিয়ে কথা হয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্থপতি মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এগুলোর দায়িত্ব আমাদের নয়। কোনো হাসপাতাল, ভবন নির্মিত হলে সেটি দেখার দায়িত্ব আমাদের।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘তৎকালীন সরকার কোনো পরিকল্পনা করেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ঢাকার বুকে এমন বাঁশের সাঁকো, এটা আসলে কেমন জানি দেখায়? আমি খোঁজ নিয়ে দেখব কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?’
