- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

৪২ উচ্চ বিদ্যালয়ে পাসের হার ৭২.২৮ শতাংশ; ফলাফল বিপর্যয়ে নানা প্রশ্ন

সিলেটের বিয়ানীবাজারে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে মিশ্র চিত্র দেখা দিয়েছে। উপজেলার ৪২টি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এ বছর উপজেলায় মোট ৭৪৫ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। ৪২টি উচ্চ বিদ্যালয়ে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ২৮ শতাংশে।

ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেন এবার এত শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলো, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল কি না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মান কেমন ছিল এবং পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কোনো সমস্যা ছিল কি না—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত। কেউ মনে করছেন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনীহা, মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি, কোচিংনির্ভরতা এবং মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতা এর অন্যতম কারণ। আবার কেউ কেউ শিক্ষা প্রশাসনের নজরদারি, পরীক্ষাব্যবস্থা ও প্রশ্নপত্র প্রণয়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সময়চিত্র পত্রিকার সম্পাদক ফয়জুল হক শিমুল বলেন, এবারের এসএসসি ফলাফল বিপর্যয়ের দায় সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে সিসি ক্যামেরা, কঠোর নজরদারি এবং নানা ধরনের কড়াকড়ির মাধ্যমে পরীক্ষার পরিবেশকে ভীতিকর করে তোলা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রশ্নপত্রও তুলনামূলকভাবে কঠিন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরাই শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার বলির পাঁঠা হয়েছে।

তিনি বলেন, “ইতিপূর্বে আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করেছে। তাহলে এবার হঠাৎ করে ফলাফলে এমন বিপর্যয় কেন? শুধু বিগত সরকারের সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দায় চাপিয়ে বর্তমান সংকটের ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। বর্তমান সরকারের শিক্ষা নীতি ও ব্যবস্থাপনারও মূল্যায়ন প্রয়োজন।”

প্রশ্নপত্র প্রণয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফয়জুল হক শিমুল বলেন, “প্রশ্নপত্রে ভুল বা অসংগতির অভিযোগ থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা দরকার। যারা প্রশ্নপত্র তৈরি করেন, তাদের দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতাও যাচাই করা উচিত। প্রশ্নপত্রে ভুল হলে তার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। কারা প্রশ্নপত্র তৈরি করেন এবং সেখানে কোনো ধরনের ভুল-ত্রুটি হয়েছে কি না, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “পরীক্ষায় নকল বন্ধ করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নকল প্রতিরোধের নামে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়-ভীতি সৃষ্টি করে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। সিসি ক্যামেরা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো কিংবা পরীক্ষার হলে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে না।”

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দক্ষ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন ও উন্নয়নের জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন শিক্ষামন্ত্রী প্রয়োজন। শুধু কঠোরতা দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করতে হবে।”

কুড়ার বাজার কলেজের প্রভাষক বিজিত আচার্য্য বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো শিক্ষার সূতিকাগার ও শিক্ষার মেরুদণ্ড। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারা নজরদারির দায়িত্বে রয়েছেন। তবে তাদের নজরদারি শুধু খাতা-কলমে কিংবা আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। বিদ্যালয়ে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চলছে কি না, শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে পাঠ গ্রহণ করছে কি না—এসব বিষয় বাস্তবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।”

মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এ পর্যায়ে অবাধ কোচিং-বাণিজ্য ও কোচিংনির্ভরতা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ফলাফলের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো শিক্ষক যখন কোচিং-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন, তখন যেসব শিক্ষার্থীর প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য নেই, তারা এক ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়। একই শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এভাবে বিভেদ ও বৈষম্যের সুযোগ তৈরি হয়, যা শিক্ষার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।”

অভিভাবকদের ভূমিকার বিষয়ে বিজিত আচার্য্য বলেন, “অত্র অঞ্চলের অনেক অভিভাবক সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিদেশগমনের স্বপ্নকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেন। ফলে অনেক সময় সন্তানরা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে বইবিমুখ হয়ে পড়ে। এমনকি শিক্ষকদের পাঠদানের প্রতিও তাদের অনীহা তৈরি হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ও পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে পড়ে।”

তিনি আরও বলেন, “ফলাফল খারাপ হলেই শুধু শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীর পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রশাসন—সবার দায়িত্ব রয়েছে। তাই দোষারোপ না করে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর নিতে হবে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা চিহ্নিত করে সম্মিলিতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।”

অন্যদিকে মুফাসসিরে কোরআন ও শিক্ষাবিদ মাওলানা হুমায়ুন রশীদ জাঈদী মনে করেন, এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্যের পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। সারা বছর নিয়মিত পড়াশোনা না করা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল ভিত্তি, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এবং সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি যথাযথভাবে না বোঝা এর অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, “অভিভাবকদের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব, আর্থিক সংকট, দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি, সঠিক নির্দেশনার অভাব এবং দাখিল পর্যায়ে অতিরিক্ত বিষয়ের চাপও শিক্ষার্থীদের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে কোচিং-বাণিজ্য ও গাইডনির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের বুঝে শেখার প্রবণতা কমে যাচ্ছে।”

ফলাফল উন্নয়নের বিষয়ে মাওলানা হুমায়ুন রশীদ জাঈদী বলেন, “প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের ভিত্তি শক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মোবাইল ও কোচিংনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।”

শিক্ষাবিদদের মতে, এবারের ফলাফলকে শুধু পাস-ফেলের পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে এর পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা কঠিন।

তাই বিয়ানীবাজারে এবারের এসএসসি ফলাফলে ৭৪৫ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্যের কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের জবাবদিহিতা, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনামুখী করার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন