রংপুরে টানা বৃষ্টিতে জনদুর্ভোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। মুষলধারে বৃষ্টি নামলেই যেন দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে ওঠে রংপুর রেলওয়ে স্টেশন। প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের জন্য যে ছাউনিটি থাকার কথা আশ্রয় হিসেবে, সেটিই এখন দুর্ভোগের প্রধান কারণ।
ছাউনির বড় বড় ছিদ্র দিয়ে টপটপ করে পড়া বৃষ্টির পানিতে পুরো প্ল্যাটফর্ম একসময় পরিণত হয় কাঁদাপানির স্তরে।
ফলে যাত্রীদের ভিজে-নষ্ট হওয়া কাপড়, পিচ্ছিল মেঝেতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি-সব মিলিয়ে এক চরম ভোগান্তির চিত্র বৃষ্টি হলে দেখা যাচ্ছে।
রোববার (২৬ এপ্রিল) সকাল থেকে টানা বৃষ্টিতে সরেজমিনে দেখা যায়, প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে ছোট ছোট জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ছাউনির নিচেও শুকনো থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে যাত্রীরা ছাতা হাতে নিয়েও নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছেন না।এর আগে শনিবার রাতে বৃষ্টির ফলে অনেক ট্রেন যাত্রী পরে ভোগান্তিতে।
ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানান, বর্ষা এলে এ দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। সামান্য বৃষ্টিতে প্ল্যাটফর্মের বারান্দা ভিজে একাকার হয়ে যায়। টিনের ছাউনি ফুটো হয়ে যাওয়ায় অঝোরে পানি পড়ে।
এতে পিচ্ছিল হয়ে পড়ে মেঝে, আর ঘটছে দুর্ঘটনাও। অনেকে পা পিছলে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও জানিয়েছেন।
প্ল্যাটফর্মে বসার পর্যাপ্ত জায়গার অভাবও ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বৃষ্টি হলে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ভেজা জায়গায়। এদিকে ছাউনির নিচে রাতযাপন করা ভাসমান মানুষদের দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ।
মনসুর আলী জানান, ‘রাতে বৃষ্টিতে পুরো প্ল্যাটফর্ম ভিজে যায়। ছাউনি ফুটো থাকায় ঘুমানো যায় না, ভিজে একাকার হয়ে থাকতে হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা স্বাধীন সরকার বলেন, ‘প্ল্যাটফর্মে বসার জায়গা কম, তার ওপর ভাসমান মানুষের উপস্থিতি বেশি। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতারও বালাই নেই। এটা যে বিভাগীয় শহরের স্টেশন, বোঝার উপায় নেই।’
ঢাকাগামী ট্রেন যাত্রী আল-মামুন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি নিয়মিত যাতায়াত করি। বর্ষায় এখানে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয়। শুনে ছিলাম সংস্কার হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রভাব দেখা যায় না।’
একই কথা বলেন আরেক যাত্রী এমদাদুল হক। তিনি বলেন, ‘ছাউনির ফাঁক দিয়ে ব্যাপকভাবে পানি পড়ছে। বসার কোনো পরিবেশ নেই। এমন অবস্থায় প্ল্যাটফর্মে থাকা খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।’
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে রংপুরবাসীর নানা দাবি থাকা সত্ত্বেও রেল কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।’
রংপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক মোনাব্বর হোসেন মনা বলেন, ‘১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টেশনটি ১৯৪৪ সালে একবার সংস্কার হয়েছিল। এরপর প্রায় ৮০ বছরেও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি। বিভাগীয় শহর হলেও এটি এখনও ‘বি’ গ্রেডের স্টেশন।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘সমস্যা সীমিত পরিসরে। স্টেশনে কর্মরত কর্মকর্তারা জানান, ছাউনির কিছু টিন সরে যাওয়ায় কয়েকটি স্থানে পানি পড়ছে। দ্রুত তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ভারী বর্ষণে স্টেশনের অব্যবস্থাপনার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’
যাত্রীদের দাবি, দ্রুত ছাউনির সংস্কার, প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা না হলে এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না। বিভাগীয় শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন হিসেবে রংপুর স্টেশনকে আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করার এখন সময়-এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।
রংপুর আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা মৌসুমের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। এতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পানি জমে যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
এ বিষয়ে রংপুর রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট আবদুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে, ‘সমস্যাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে নাগরিকদের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ পারে এ দুর্ভোগ লাঘব করতে।’
