৮০০ বছরের পুরোনো ইটের তৈরি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ

বগুড়ায় মহাস্থান দুর্গনগরীর পশ্চিমে বিষমর্দন এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া গেছে কমপক্ষ ৮০০ বছরের পুরোনো ইটের তৈরি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। খননের সঙ্গে জড়িত প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, মন্দিরটি সম্ভবত পাল আমলে তৈরি। ইট পুনরায় ব্যবহার করে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতক থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে কোনো একসময় তৈরি করা হয়েছে। সমতল থেকে প্রায় ৫ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় বিভিন্ন পর্যায়ে মন্দির তৈরি করা হয়েছে শক্ত মাটির ওপর প্লাবনভূমিতে। খননের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, দুর্গনগরীর ভেতরে থাকা অবকাঠামোগুলোর নির্মাণশৈলী ও নির্মাণসামগ্রীর সঙ্গে মিল রয়েছে খননে পাওয়া মন্দিরের অবকাঠামোর। ৬ জনের একটি দল গত ১২ জানুয়ারি বিষমর্দনে খনন শুরু করে। আর শেষ হবে জানুয়ারিতেই।

বগুড়ায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ে কর্মরত গবেষণা সহকারী এস এম হাসানাত বিন ইসলাম বলেন, ‘উন্মোচিত অবকাঠামো নির্মাণে পাল আমলে তৈরি ইট পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছে, খননে ইটের দেয়ালের সঙ্গে পাওয়া গেছে মন্দিরের মেঝে। আর নির্মাণকৌশল থেকে ধারণা করা যায়, বেশ কয়েকটি ধাপে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আরও খনন করা সম্ভব হলে অবকাঠামোর নির্মাণকাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। সেই সঙ্গে জানা যাবে মহাস্থান দুর্গনগরীর ভেতরের অবকাঠামোগুলোর সঙ্গে বাইরের অবকাঠামোর কী ধরনের সাদৃশ্য রয়েছে। আমরা নিচের দিকে আরও খনন চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, খনন শেষ হলে আরও নিদর্শন পাওয়া যাবে জানা যাবে নতুন নতুন তথ্য।’

দুর্গনগরীর পশ্চিমে ১০০ মিটার দূরে খননে পাওয়া অবকাঠামোর প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানান এস এম হাসানাত বিন ইসলাম।

খনন দলের আরেক সদস্য রাজিয়া সুলতানা। তিনি মহাস্থান জাদুঘর কাস্টোডিয়ান হিসেবে বেশ কয়েক বছর ধরেই আছেন। বগুড়ার আরও বেশ কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক খননে অংশ নিয়েছেন তিনি। রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘বিষমর্দনে খননে পাওয়া গেছে নকশা করা ইট, বিভিন্ন ধরনের বিপুলসংখ্যক মৃৎপাত্রের টুকরা, পোড়ামাটির ফলকের ভাঙা অংশ, পোড়ামাটির বিট, পোড়ামাটির নারী মূর্তির ভগ্নাংশ, পোড়ামাটির তৈরি জালের কাঠি আর শত শত প্রাচীন ইট।’

তিনি জানান, ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবকাঠামোর পূর্বাংশে মাটির নিচে একটি স্থানেই পাওয়া গেছে মৃৎপাত্রের অনেক টুকরা।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুল রহমান বলেন, ‘এবারের খননের মূল লক্ষ্য ছিল মহাস্থান দুর্গনগরীর ভেতর যেসব বসতি ছিল, এর সঙ্গে দুর্গনগরীর চারপাশে যেসব বসতি ছিল তাদের মধ্যে মিল খুঁজে বের করা এবং এ বসতিগুলো সমসাময়িক কি না, তা জানার চেষ্টা করা। বিষমর্দন সাইট খনন করে আমরা ৪ থেকে ৫টি সময়কালে বসতির সন্ধান পেয়েছি। একটির পর একটি মন্দির তৈরি করা হয়েছে এবং তা করা হয়েছে একটি লম্বা সময় ধরে।’ তিনি জানান, সবচেয়ে নিচে যে কাঠামো পাওয়া গেছে, তা খুব সম্ভবত প্রাচীন করতোয়া নদীর ফ্লাড প্যানের ওপর তৈরি এটার সঙ্গে মহাস্থানগড়ে সবচেয়ে প্রাচীন মৌর্য আমলের তুলনা করে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, এ মন্দিরগুলো একটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আরেকটি নির্মাণ করা হয়েছে। আবার এমনটাও হতে পারে, ধারাবাহিকভাবে তৈরি করা হয়েছে।

প্রাচীন এ অবকাঠামোর বয়স কত হতে পারে–এ প্রশ্নের জবাবে এ কে এম সাইফুল রহমান বলেন, ‘কমপক্ষে ৮০০ বছর হবে। ১০০০ বছরও হতে পারে, কিন্তু এখনো নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় ঠিক কত বছর আগে এ মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে।’ প্রত্নতাত্ত্বিকরা জানান, প্রাচীন এ দুর্গনগরীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় খননে পাওয়া গেছে মৌর্যপূর্ব, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, মুসলিমসহ বিভিন্ন আমলের শত শত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। খননে পাওয়া নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাপাঙ্কিত গোল্ড কয়েন, পোড়ামাটির নকশা করা ফলক, মূর্তিসহ নানা ধরনের ধাতব, মাটি ও পাথরে তৈরি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মহাস্থান দুর্গনগরীতে বিভিন্ন সময় যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে তার মধ্যে যিশুখ্রিষ্টের জন্মেরও বহু বছর আগে তৈরি একটি মাটির চুলাও রয়েছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন