ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন। এ আসনে অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া বিএনপি’র প্রাথমিক সদস্য হওয়ার পর দেখা দিয়েছে সমীকরণ। এখানে বিএনপি’র তিন শক্তিশালী প্রার্থী সমান্তরালে গণসংযোগ, শোডাউন দিয়ে মাঠে রয়েছেন। হাটে-ঘাটে, মাঠে আলোচনায় সাবেক দু’বারের এমপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপি’র নির্বাহী সদস্য আলহাজ শেখ সুজাত মিয়া। নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্র শিকাগো বিএনপি’র সভাপতি শাহ মোজাম্মেল নান্টু। উপজেলা ও ১৩ ইউনিয়ন বিএনপি’র নির্বাচিত কমিটি নিয়ে বিশাল শোডাউন দিয়ে শক্তির জানান দিয়েছেন। বিভক্ত বিএনপি’র মূলস্রোত নিয়ে আনুষ্ঠানিক গণসংযোগ করছেন তিনি। পিছিয়ে নেই সাবেক দু’বারের মেয়র আলহাজ ছাবির আহমদ চৌধুরী। শহরে বিশাল শোডাউন ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিদিন মোটর শোভাযাত্রা নিয়ে গণসংযোগ করছেন। শক্তির জানান দিতে শেখ সুজাত মিয়াও তৃণমূল বিএনপি’র বড় একটি অংশ নিয়ে ইউনিয়নভিত্তিক গণসংযোগ করছেন। বিএনপি’র মনোনয়ন নিয়ে ড. রেজা শতভাগ আশাবাদী হলেও নির্বাচনী এলাকায় অনুপস্থিত রয়েছেন। তৃণমূল নেতাদের দাবি, যিনিই পাবেন ধানের শীষ, তাকে নিয়েই কাজ করবেন তারা।
ড. রেজা কিবরিয়া: ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। দুপুর ২টায় আলোচিত রাতের ভোটের ওই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন তিনি। অল্প সময়েই প্রায় ৮৫ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের জালালসাফ আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার পুত্র ড. রেজা কিবরিয়া। অর্থনীতিবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত মুখ। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক নীতি সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৩৪ বছরেরও বেশি কাজের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তিনি। আইএমএফ-এ কর্মরত থাকাকালে (১৯৮৪-৯৩) কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ পাপুয়া নিউগিনির রাজস্ব বিভাগের ম্যাক্রো ইকোনমিক এডভাইজার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ২০০০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেন। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি তাঞ্জানিয়ায় আইএমএফ’র পূর্ব-আফ্রিকা আঞ্চলিক কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের সামষ্টিক অর্থনীতি উপদেষ্টা ছিলেন। এ ছাড়াও আফ্রিকান দেশ ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, মালাউই প্রভৃতি দেশের সরকারসমূহের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। সর্বশেষ (২০১৬-১৮) তিনি কম্বোডিয়া সরকারের অর্থনীতি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইএমএফ ম্যাক্রো ফিসক্যাল এডভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
শেখ সুজাত মিয়া: আলহাজ শেখ সুজাত মিয়া ১৯৯১ সাল থেকে নির্বাচনী এলাকায় দুর্বল বিএনপিকে সবল করতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া শুরু করেন। ১৯৯৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি প্রথমবার বিএনপি’র মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য হন। ২০১১ সালে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজীর মৃত্যুজনিত কারণে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই তিনি দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতা হিসেবে মাঠে সরব ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী এলাকায় দিন-রাত গণসংযোগ করছেন।
শাহ মোজাম্মেল নান্টু: দলের ক্রান্তিলগ্নে উপজেলা বিএনপি’র গঠন প্রক্রিয়ায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। হামলা, মামলায় পাশে থেকে অনুপ্রেরণা দেন। এরই প্রতিদান হিসেবে উপজেলা ও ১৩ ইউনিয়ন বিএনপি’র নির্বাচিত কমিটির নেতাকর্মী তাকে নিয়ে শহরে বিশালাকারের শোডাউনে অংশ নেন। তিনি ১৯৮৭ সালে মৌলভীবাজার ডিগ্রি কলেজ থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০১৩ সালের ২৯শে ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে হবিগঞ্জ-১ আসনের নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি পল্টন এলাকায় জমায়েত হন। সেখানে সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনাম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে শাহ মোজাম্মেল নান্টুকেও পুলিশ আটক করে এবং পরে ছেড়ে দেয়। এরপর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আওয়ামী লীগের হামলায় গুরুতর আহত হন। আন্দোলনের ক্রান্তিকালে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিনিধিদল নিয়ে তিনি বিএনপি’র জাতীয় কাউন্সিলে যোগদান করেন। শাহ মোজাম্মেল নান্টু উপজেলার ১১ নম্বর গজনাইপুর ইউনিয়নের দরগা পাড়া (দরগা বাড়ির) গ্রামের প্রয়াত শাহ ফখরুল ইসলামের সন্তান।
ছাবির আহমদ চৌধুরী: তিনবার সাবেক কাউন্সিলর, শক্তিশালী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপরীতে দু’বারের সাবেক নির্বাচিত মেয়র। তৃণমূলের পরিচিত মুখ। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কর্তৃক জাতির সামনে উপস্থাপিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা কর্মসূচির লিফলেট বিতরণ ও ধানের শীষের পক্ষে বিরামহীন গণসংযোগ করছেন তিনি। পৌর বিএনপি আহ্বায়ক ছাবির আহমদ চৌধুরীসহ বৃহৎ অংশ নিয়ে গ্রামাঞ্চল, হাটবাজারে মতবিনিময় আর উঠান বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। তার সমর্থনে বাহুবল ও নবীগঞ্জে একাধিক পথসভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়াও দলের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন- স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতা মো. মখলিছুর রহমান, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোশাহিদ আলম মুরাদ।
