মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করার দাবিতে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট সিলেট জেলা শাখার উদ্যোগে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সোমবার (১১মে) বিকাল ৫টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে থেকে মিছিল শুরু হয়ে সিটি পয়েন্টে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বাসদ সিলেট জেলা শাখার আহ্বায়ক আবু জাফর এর সভাপতিত্বে ও বাসদ (মার্ক্সবাদী) নেতা পিনাক রঞ্জন দাস এর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এডভোকেট আনোয়ার হোসেন সুমন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজ আহমদ,বাসদ(মার্ক্সবাদী) জেলা সমন্বয়ক সঞ্জয় কান্ত দাশ, সাম্যবাদী আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক এডভোকেট মহীতোষ দেব মলয়, নাগরিক আন্দোলনের অধ্যাপিকা জিনাত আরা খান পান্না, সিপিবি জেলা সাধারণ সম্পাদক খায়রুল হাসান,বাসদ নাজিকুল ইসলাম, এমএ ওয়াদুদ, সাম্যবাদী আন্দোলনের এডভোকেট রণেন সরকার রণি,সিপিবি নেতা মনীষা ওয়াহিদ, প্রমূখ ।
.
সমাবেশে বক্তারা অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের আমলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সম্পাদিত বৈষম্যমূলক ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (ART) বাতিলের দাবি জানান এবং এই চুক্তির মূল হোতা বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের অবিলম্বে অপসারণ দাবি করেন।একটি সত্যিকারের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দুটি পক্ষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করে। কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে স্বাক্ষরিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে ‘Bangladesh shall’ বাক্যাংশটি ১৫৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে, আর ‘United States shall’ মাত্র ৯ বার। এটিই প্রমাণ করে এই চুক্তি কার স্বার্থে তৈরি।
নেতৃবৃন্দ বলেন, এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে মার্কিন ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে, যেখানে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১,৬৩৮টি পণ্যে সুবিধা। CPD-এরৃ হিসাবে এর ফলে বাংলাদেশ বার্ষিক ১,৩২৭ কোটি টাকার আমদানি-শুল্ক রাজস্ব হারাবে। এর বিনিময়ে যে ‘সুবিধা’ দেওয়া হয়েছে তা নেহাতই নামমাত্র—মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপর রেসিপ্রোকাল শুল্ক ৩৭% থেকে কমিয়ে মাত্র ১৯% করা হয়েছে এবং বিদ্যমান ১৫.৫% শুল্ক মিলিয়ে মোট কার্যকর শুল্কের বোঝা দাঁড়ায় ৩৪.৫%-এ। এই চুক্তি বাংলাদেশকে আন্তর্জতিক বাজার থেকে সস্তায় পণ্য কেনার স্বাধীনতা হরণ করে মার্কিন পণ্য বেশি দামে কিনতে বাধ্য করবে। গম, তুলা, রাসায়নিক ও শিল্প পণ্য, এলএনজি, প্রতিরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী মার্কিনীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, নির্বাচনের মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই চুক্তির অর্থ বাংলাদেশকে ১০ থেকে ২০ বছর ধরে প্রতি বছর ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা কিস্তি দিতে হবে — যা জনগণের উপর অন্যায় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেবে। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে সব কিছু ঠিক থাকলেও ১৪টির মধ্যে প্রথম বিমানটিও আসবে ২০৩১ সালের অক্টোবরের পর। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় চুক্তি করা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি একটি কৌশলগত অধীনতার দলিল।
নেতৃবৃন্দ বলেন,বিএনপি-জামাতের শীর্ষ নেতাদের সাথে মার্কিন প্রতিনিধির ‘কথা বলা’ মানে জনগণের সম্মতি নয়। সাংবিধানিক নীতি অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তি সংসদে অনুমোদিত হতে হয়—এই চুক্তিতে তা হয়নি।এই চুক্তি বিএনপি সরকারের কথিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
নেতৃবৃন্দ বলেন,সাম্রাজ্যবাদী চুক্তি বহাল রেখে বিএনপি সরকার যদি মার্কিন মনিবদের সন্তুষ্ট রাখার নীতিতে অটল থাকে, তাহলে দেশপ্রেমিক জনগণক তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তুলবে। শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও প্রগতিশীল শক্তির সমন্বয়ে এই আন্দোলন একটি জাতীয় গণ-প্রতিরোধে পরিণত হবে।
বক্তারা বলেন,জাতীয় সংসদে অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট ও অর্থের অপচয় করা হচ্ছে। অথচ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে দেওয়া হচ্ছে না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।দেশের অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকী স্বরূপ এই বাণিজ্য চুক্তি আগামীকাল ৩০ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে আলোচনা জন্য উত্থাপন করার জোর দাবি জানানো হয় এবং জাতীয় স্বার্থ বিরোধী অসম বাণিজ্য চুক্তি বাতিলে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার ও জাতীয় সংসদের সকল সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
