- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

বাহুবলে থমকে আছে সাড়ে ১২ কোটি টাকার মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ

হবিগঞ্জের বাহুবলে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ প্রায় ১৫ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এ প্রকল্পের কাজ মাঝপথে থেমে যাওয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি, নির্মাণমান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের বালু, ইট ও ব্লক ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নির্ধারিত মান অনুসরণ করা হচ্ছে না। তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশন, কার্যাদেশের শর্ত এবং ব্যবহৃত সামগ্রীর পরীক্ষার প্রতিবেদন পর্যালোচনা প্রয়োজন।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। প্রকল্প এলাকায় নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য উপকরণ পড়ে রয়েছে। দুই-তিনজন শ্রমিককে দেখা গেলেও মূল নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ ছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক সপ্তাহ আগে প্রকল্পের কাজের গতি কমে আসে। এরপর প্রায় ১৫ দিন ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন জানান, সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এ ধর্মীয় স্থাপনার কাজ দ্রুত শেষ করে নামাজসহ ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম চালুর প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতায় সেই প্রত্যাশা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়া, সেলিম মিয়া ও তৌফিক মিয়া অভিযোগ করেন, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু ও ইট-ব্লকের মান নিয়ে শুরু থেকেই তাদের প্রশ্ন রয়েছে। ছাদ নির্মাণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত কাজে নির্ধারিত নিয়ম ও প্রকৌশলগত মান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি-না, তা নিয়েও তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন।

তাদের দাবি, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে প্রকৌশলীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা ও কাজের পরিমাপ যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, সে জন্য এখনই কারিগরি যাচাই করা দরকার।

অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে বালু, ব্লক, কংক্রিট ও রডসহ ব্যবহৃত সামগ্রীর নমুনা পরীক্ষা করে প্রকল্পের অনুমোদিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্মাণকাজের মান ও বালু ব্যবহারের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. হিমায়েত হোসেন বলেন, তারা দুজন যৌথভাবে প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করছেন। নির্মাণকাজে গুণগত মান বজায় রেখেই কাজ করা হচ্ছে।

বালুর মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকেই বালু নেওয়া হচ্ছে এবং মান ঠিক রেখেই তা ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে বালু না নিলে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে হিমায়েত হোসেন বলেন, শ্রমিকরা ছুটিতে ছিলেন। কয়েকজন শ্রমিক ইতোমধ্যে কাজে ফিরেছেন। অন্য শ্রমিকরাও ফিরে এলে পুনরায় পুরোদমে নির্মাণকাজ শুরু হবে।

ঠিকাদারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ছুটিকে কাজ বন্ধ থাকার কারণ বলা হলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি বড় সরকারি প্রকল্পের নির্মাণকাজ টানা প্রায় ১৫ দিন বন্ধ থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না। এ সময়ে প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

এছাড়া কাজ বন্ধ থাকার সময়ে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

হবিগঞ্জ জেলার অন্যান্য উপজেলায় নির্মাণাধীন মডেল মসজিদ প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোর কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। কোথাও কোথাও মুসল্লিরা নিয়মিত নামাজও আদায় করছেন। এর বিপরীতে বাহুবল মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণকাজ এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে একই জেলার অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় বাহুবল প্রকল্পের অগ্রগতি কেন পিছিয়ে রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, শুধু দ্রুত কাজ শেষ করলেই হবে না। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবনটি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ, টেকসই ও ব্যবহার উপযোগী করাও জরুরি।

তাদের মতে, কাজ বন্ধ থাকার পেছনে শ্রমিক সংকট ছাড়াও বিল পরিশোধ, নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহ, কারিগরি সমস্যা কিংবা প্রশাসনিক কোনো জটিলতা রয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয়, পরিশোধিত বিল, নির্ধারিত সময়সীমা এবং বর্তমানে কাজ বন্ধ থাকার কারণও পরিষ্কার করা দরকার।

নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা, প্রকল্পের অগ্রগতি, নির্মাণসামগ্রীর মান ও প্রকৌশলগত তদারকির বিষয়ে হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাবিব উল্লাহর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা ও কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি-না, ব্যবহৃত বালু, ইট-ব্লক, রড ও কংক্রিট নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী রয়েছে কি-না এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত কাজগুলো প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে কি না, এসব বিষয়ে কারিগরি তদন্ত করা হোক।

সরকারি অর্থে নির্মিত একটি মডেল মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এর সঙ্গে জনগণের অর্থ, ধর্মীয় কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যবহার জড়িত। তাই নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ঠিকাদারের পক্ষ থেকে দ্রুত পুরোদমে কাজ শুরুর কথা বলা হলেও বাস্তবে কবে নাগাদ কাজ পূর্ণ গতিতে শুরু হয় এবং নির্মাণমান ও তদারকি নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এখন সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন