বাংলা কাঠঠোকরা


সুন্দরবনসংলগ্ন চাঁদপাই এলাকার একটি গাছপালাঘেরা বাড়িতে পাখি দেখতে বের হয়েছি খুব সকালে। শুরুতেই টিকেলের দামা ও বড় র‌্যাকেট ফিঙের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। খেজুরের রস পান করতে কিছুক্ষণ পরপরই বড় ফিঙে দুটি আসা-যাওয়া করছে। এরপর একে একে ঝুঁটি শালিক, বুলবুলি, খয়রালেজ কাঠশালিক এসে খেজুরের রস পান করল।

ধীরে ধীরে বেলা বাড়তে লাগল। ততক্ষণে এক জোড়া বাংলা কাঠঠোকরা খেজুরের রসের খবর পেল। উড়ে এসে অনেকক্ষণ ধরে তাদের লম্বা ঠোঁট দিয়ে মিষ্টি রস পান করতে লাগল। রস পান করে আর পাখি দুটি এদিক-ওদিক তাকায়।

রস পান করে প্রথমে উড়ে গেল ছেলে পাখিটি, এরপর উড়াল দিল মেয়েটি। সাধারণত অনেক প্রজাতির পাখি খেজুরের রস খেয়ে নিজেদের তৃষ্ণা মেটায় এবং একই গাছে বারবার আসে। বাংলা কাঠঠোকরা আমাদের অতিচেনা। বন, বাগান ও লোকালয়ে সর্বত্র বিচরণ করে।

একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। তবে জোড়ায় থাকতেই আমি বেশি লক্ষ করেছি। গাছের কাণ্ড ও ডালে হাতুড়ির মতো আঘাত করে অথবা মাটিতে ঝরাপাতা উল্টে এরা খাবার সংগ্রহ করে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে পিঁপড়া, শুঁয়ো পোকা, বিছা, মাকড়সা, অন্যান্য পোকামাকড় এবং খেজুরেরও ফুলের রস। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ সোনালি-হলুদ, দেহতলে কালো আঁইশের মতো দাগ থাকে।

ওড়ার পালক ও লেজ কালো, থুতনিতে কালো ডোরা থাকে। সাদা ঘাড়ের পাশে কালো দাগ, বুকে মোটা কালো আঁইশের দাগ থাকে। চোখে কালো ডোরা, ডানার গোড়ার ও মধ্যে পালক ঢাকনিতে সাদা বা ফিকে ফুটকি এবং পিঠ ও ডানার অবশেষ সোনালি। সবুজ গোলকসহ এর চোখ লালচে-বাদামি, পা ও পায়ের পাতা ধূসর সবুজ। ঠোঁট শিং রঙ ও কালোর মিশ্রণ।

ছেলে ও মেয়ে পাখির চেহারায় পার্থক্য থাকে চাঁদি ও ঝুঁটির রঙে। ছেলে পাখির চাঁদি ও ঝুঁটি উজ্জ্বল লাল ও মেয়ে পাখির সাদা বিন্দুসহ চাঁদির সামনের অংশ কালো ও পেছনের ঝুঁটি লাল। শক্ত পা ও অনমনীয় লেজে ভর দিয়ে ছোট ছোট লাফ মেরে এরা গাছের কাণ্ড বেয়ে ওপরে ওঠে। ওড়ার সময় উচ্চ স্বরে ডাকে। কিয়ি কিয়ি কিয়ি কিয়ি কিয়িকিরইররর-র-র-র…। ফেব্রুয়ারি-জুলাই মাসে গাছের কাণ্ডে গর্ত খুঁড়ে বাসা বাঁধে ও ডিম পাড়ে। ডিমের রং সাদা। সংখ্যা তিন। ছেলে ও মেয়ে পাখি দুজনেই বাসার কাজ করে, ডিমে তা দেয়। বাসায় হামলা হলে ছানারা সাপের মতো হিস হিস শব্দ করে। সাধারণত বড় গাছের শুকনা কাণ্ডে গর্ত করে। গর্ত খোঁড়ার প্রাথমিক সময় টক্ টক্ শব্দ হয়। মানুষ দেখলে বাসার কাছ থেকে আড়ালে চলে যায়। বাংলা কাঠঠোকরা গাছের পোকামাকড় খেয়ে গাছকে পরিষ্কার রাখে। ঢাকা শহরে যেকোনো উদ্যানে এমনকি গাছ-গাছালি আছে এমন বাড়িতেও দেখা যায় এবং কর্কশ ডাক শোনা যায়। রমনা পার্কে গিয়ে একাধিকবার এ পাখির দেখা পেয়েছি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন