
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা বাড়ছে। তবে সেই আগ্রহের ধরনে এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়া ছিল শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে পছন্দের দেশ, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে চীন। বেইজিং, সাংহাই, উহান, গুয়াংজু, শিয়ামেনসহ বিভিন্ন চীনা শহরে বর্তমানে অসংখ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসায় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—প্রায় সব ক্ষেত্রেই
চীনাবিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বিশ্বমানে জায়গা করে নিয়েছে। শিক্ষার মান, আধুনিক গবেষণাগার, বৃত্তির সুযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পরিবেশ চীনকে শিক্ষার্থীদের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে শিক্ষায় সহযোগিতা
বাংলাদেশ ও চীনের ঘনিষ্ঠ শিক্ষা সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)। এই উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর চীনা সরকারের স্কলারশিপ কাউন্সিল (CSC) এবং চীনে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে পূর্ণ বা আংশিক বৃত্তি পেয়ে শিক্ষালাভ করছেন।
চীন সরকার শুধু শিক্ষা নয়, বরং সাংস্কৃতিক বিনিময় ও দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু একাডেমিক জ্ঞানই অর্জন করছেন না, বরং চীনা ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি নিয়েও বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে পারছেন।
ভাষা ও মানদণ্ড
চীনে উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাইনিজ ভাষার এইচএসকে (HSK) লেভেল ৪ পাস করা। সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল জাবের জানান, এই লেভেল না পেলে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রির সার্টিফিকেট প্রদান করা হয় না।
বর্তমানে চীনে প্রায় তিন হাজার বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ৬০টির অধিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বসেরা ৫০০-এর তালিকায় স্থান পেয়েছে। সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়, ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়, ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংহাই জিয়াওতং বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বজুড়ে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা সাধারণত ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স, মেডিসিন, কৃষি, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয়ে আগ্রহী। ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদানের পরিমাণ বাড়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সহজ হয়েছে চীনে পড়াশোনা।
খরচ
বিশ্বমানের শিক্ষা কম খরচে পাওয়াই চীনের প্রতি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ার অন্যতম কারণ। একটি স্নাতক কোর্সের বার্ষিক ফি প্রায় ২০,০০০–৫০,০০০ ইউয়ান (প্রায় ২–৫ লাখ টাকা), যা ইউরোপ বা আমেরিকার তুলনায় অনেক কম। এছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম।
‘স্টাডি ইন চায়না’ প্রোগ্রামের অধীনে বর্তমানে চীনে প্রায় পাঁচ লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, যার মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাংশই বাংলাদেশি।
বৃত্তির সুযোগ
চীনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন স্কলারশিপের সুযোগে। সবচেয়ে জনপ্রিয় চীনা স্কলারশিপ কাউন্সিল (সিএসসি)-এর আওতায় শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি, আবাসন, মাসিক ভাতা এবং স্বাস্থ্যবীমাসহ পূর্ণ সহায়তা পান। এছাড়া ‘সিল্ক রোড স্কলারশিপ’, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ফেলোশিপ’ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-নির্ভর স্কলারশিপ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে চীনা সরকারের বৃত্তি পেয়েছেন ৫৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, আর ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮০।
নানজিং টেক ইউনিভার্সিটি এবং বিজিএলইউ চায়না লিংক প্রোগ্রামে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণ বৃত্তির সুযোগ রয়েছে। যাদের এইচএসকে স্কোর রয়েছে, তাদের জন্য আইইএলটিএস ছাড়াই আবেদন করা সম্ভব।
জনপ্রিয় প্রোগ্রাম ও বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম), ব্যবসা এবং মেডিসিন কোর্স জনপ্রিয়। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স, এমবিএ এবং মেডিসিন কোর্সে তাদের আগ্রহ বেশি।
গুয়াংজির বেইবু গালফ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করা আব্দুল্লাহ আল জাবের জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অত্যন্ত উন্নত এবং ডর্ম সুবিধা ইউরোপের অনেক দেশের চেয়েও ভালো। শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক মানের, বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অনেক শিক্ষকই ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তবে কিছু চীনা শিক্ষকের ইংরেজি দুর্বল হওয়ায় মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তু বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।
পেকিং, ফুদান ও সাংহাই জিয়াওতং বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল ও আইন শিক্ষায় বিশেষ জনপ্রিয়। বিজিএলইউ চায়না লিংক প্রোগ্রাম অর্থনীতি ও আইন বিষয়ে ভালো। নানজিং টেক ইউনিভার্সিটি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ দেয়।
আগে চীনে বিদেশি শিক্ষার্থীরা কাজ করতে পারতেন না। তবে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে নিয়মে শিথিলতা আনা হয়। এখন তাঁরা সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত খণ্ডকালীন কাজ করতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ উপার্জনের একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চীনে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সাইফ রহমান বলেন, ‘রেস্টুরেন্টে কাজ করলে সপ্তাহে পাঁচ-সাত হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। এতে নিজের খরচ অনেকটাই উঠে আসে। অনেক বাংলাদেশি আবার পর্যটক গাইড হিসেবেও কাজ করেন। চীনে পড়াশোনার ব্যয় তুলনামূলক কম, ফলে পরিবার থেকে পাঠানো টাকায়ও ভালোভাবে পড়ালেখা চালানো যায়।’
আবেদন প্রক্রিয়া
চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা সহজ ও অনলাইনভিত্তিক। সিএসসি স্কলারশিপের জন্য (http://campuschina.org) বা (http://csc.edu.cn)-এ আবেদন করতে হয়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
১) পাসপোর্ট
২) একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট
৩) স্টেটমেন্ট অফ পারপাস
৪) রেকমেন্ডেশন লেটার
৫) এইচএসকে বা আইএলটিএস স্কোর (যদি প্রযোজ্য হয়)
আবেদনের ডেডলাইন সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে। বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস আবেদনগুলোর প্রি-স্ক্রিনিং করে, যা নির্বাচনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
চীনে এক্স১ বা এক্স২ ভিসা পেতে স্কলারশিপ অফার লেটার থাকা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে কিছু কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান এই আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে থাকে।
চ্যালেঞ্জ
চীনে পড়াশোনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো এইচএসকে লেভেল ৪ পাস করা। আব্দুল্লাহ আল জাবের জানান, এ পরীক্ষায় পাস না করলে ডিগ্রির সার্টিফিকেট মেলেনা।
ভাষাগত বাধা ছাড়াও সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং স্কলারশিপ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক খরচ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে যারা সফলভাবে এইচএসকে ৪ পাস করেন, তাদের জন্য চাকরির বাজারে সম্ভাবনা অনেক বেশি। চীন কিংবা বাংলাদেশ— উভয় দেশেই তারা ভালো চাকরি পেতে পারেন।
পরামর্শ
আগে থেকেই চাইনিজ ভাষা শিখে নিন
স্কলারশিপ-ভিত্তিক আবেদন করুন
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন
গবেষণাগার ও ল্যাব সুবিধা ভালোভাবে কাজে লাগান
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশ সরকার চীনের সঙ্গে শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যৌথ গবেষণা, স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ ও অনলাইন শিক্ষায় সহযোগিতা দৃঢ় হচ্ছে। উহান বিশ্ববিদ্যালয়, দালিয়ান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি ও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা সমঝোতা করেছে।
বিশেষত কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যৌথ গবেষণায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া হুয়াওয়ে ও আলিবাবার মতো চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ দিচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী চীনে পড়াশোনা শেষে এসব প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ বা চাকরির সুযোগও পাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, এশিয়ার পরাশক্তি চীনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। সঠিক প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও ভাষা দক্ষতা থাকলে চীনের বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের একাডেম।