বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এখন সরাসরি আঘাত হানছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় চলমান যুদ্ধের প্রভাবে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং উৎপাদন খরচের চাপ মিলিয়ে সরকারের ভর্তুকিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ছে। মাঠপর্যায়ে জ্বালানি তেলের সংকটের অভিযোগ বাড়তে থাকলেও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংকট অস্বীকার করছে। এ অবস্থার মধ্যেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ এবং ধাপে ধাপে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সামনে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠককে ঘিরেও ভর্তুকি কমানোর চাপ বাড়ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুতের দাম ১০ শতাংশ বাড়ালে ভর্তুকি কতটা কমবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে এর প্রভাব কী হবে তা জরুরি ভিত্তিতে বিশ্লেষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ খাত মূলত আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যে বড় ব্যবধান থাকায় প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিট খরচ ২৭ টাকা পর্যন্ত ওঠে। এটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল। বিপরীতে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন তুলনামূলক কম। নিজস্ব উৎপাদিত গ্যাস পর্যায়ক্রমে কমে যাচ্ছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি ইরান যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার অর্ধেক কেন্দ্র কার্যত অলস পড়ে থাকে।

এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে গিয়ে এখন স্পট মার্কেট থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বছরে লাখ কোটি টাকার ঘরে পৌঁছাতে পারে।

সংকট মোকাবিলায় সরকার এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। তবে বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে কয়লা আমদানির পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে, যা নতুন করে ব্যয়চাপ তৈরি করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম আমাদের সময়কে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বা কমানোর বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হবে সেভাবে আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিতিশীল। য্দ্ধুকালীন কয়লাভিত্তিক সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোদমে চালানোর একটি পরিকল্পনা হয়েছে। আমাদের হাতে এক মাসের কয়লার মজুদ আছে। আরও কয়লা আমদানির চেষ্টা করছি। তবে যুদ্ধের কারণে কয়লা পরিবহনের জাহাজ বা মাদার ভেসেলের ভাড়ার দাম বেড়ে গেছে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে বিপিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, নতুন সরকারের একটা প্রচেষ্টা ছিল অন্তত এক বছরের মধ্যে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে থাকার। সেটা হয়তো ভর্তুকি বাড়িয়ে দিয়ে সম্ভব ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে নতুন সরকারকে ফেলে দিয়েছে; এখন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি যেভাবে খারাপ দিকে টার্ন করছে তাতে বাংলাদেশের সামনে আরও বিপদ। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করা হতো সেটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকার এখন স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ দামে এলএনজি আমদানি করছে। কিন্তু স্পট মার্কেট থেকে এমন অব্যাহতভাবে এলএনজি আমদানির অর্থ নেই সরকারের কাছে। ফলে সরকারকে বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে বছরে ভর্তুকির পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ কর্মকর্তা বলেন, এ ছাড়া দাতা সংস্থাগুলোর অব্যাহত চাপ রয়েছে বিদ্যুতের ভর্তুকি কমিয়ে আনার। ফলে সরকার ভর্তুকি কমাতে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এ কর্মকর্তা বলেন, বিগত সরকারের সময়ে একবার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল প্রতিমাসে ৫ শতাংশ হারে বিদ্যুতের দাম বাড়বে। বর্তমান সরকারকেও হয়তো সেই ধরনের একটা সিদ্ধান্ত যেতে হতে পারে। এই কর্মকর্তা বলেন, আমি যতটুকু জেনেছি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে হয়তো বছরে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর একটা প্রক্রিয়ায় হতে পারে। তবে সেটা সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য হবে, নাকি প্রায় দেড় কোটি লাইফলাইন ট্যারিফের গ্রাহকদের বাদ দিয়ে হবে সেটা সিদ্ধান্তের বিষয়।

প্রসঙ্গত, ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রায় নিয়মিত বিরতিতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। সেই বিষয়টি বিবেচনায় তিনি কর্মকর্তাদের বলেছেন বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করতে। তবে সেই বৈঠকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক দুরবস্থার বিষয় তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে গত অর্থ বছরেও প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। চলমান অর্থবছরে অনেক দেনা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কম রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় বিপিডিবি এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ভর্তুকি বা লোকসান কমিয়ে আনতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, উপস্থিত দুই মন্ত্রী বিদ্যুৎ খাতের সরকারি কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক বিষয়ে আলোচনা শেষে কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেন কী করে অপারেশনাল কস্ট বা পরিচালনার খরচ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ট্যারিফ নেগোসিয়েশনের লক্ষ্যে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে সেই কমিটির সূত্র ধরে আর বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ট্যারিফ কমিয়ে সংকট সমাধান করা যায় কিনা সেই পরামর্শ দিয়েছেন।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বিশাল পরিমাণ ঋণ জমা হয়েছে বিপিডিবির। সরকারি-বেসরকারি কোম্পানি এবং জ্বালানি আমদানিতে অনেক দেনা জমা হয়েছে। ফলে অর্থ পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ও বিক্রির মধ্যে ফারাক রয়েছে। ফলে প্রতিবছর ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে এবং ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে দাম বাড়াতে হবে। অথবা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তুকি খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এখন সরকার কীভাবে ম্যানেজ করবে সেটা নীতিনির্ধারকদের বিষয়। এ কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমাতে হলে প্রতিবছরই দাম সমন্বয় করতে হবে। সেটা না করলে অবশ্যই ভর্তুকিতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেটা কীভাবে সরকার সমন্বয় করবে অবশ্যই একটা বড় সিদ্ধান্তের বিষয়। একই সঙ্গে দাতা সংস্থার পরামর্শ বা চাপ তো রয়েছেই। তিনি বলেন চলতি মাসেই আইএমএফ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের। সেখানকার প্রস্তুতি হিসাবেও কিছু বিষয় সরকারকে বিশ্লেষণ করে রাখতে হচ্ছে।

এদিকে, ইরান যুদ্ধের পর বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সূত্রে জানা যায়, যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ৮৫টি দেশে তেলের দাম বেড়েছে। তবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বা অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানো হলেও গত মঙ্গলবার বিমানের জ্বালানি তেল জেট ফুয়েল দাম এক লাফে ৯০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগের দাম ১১২ টাকা থেকে ২০২ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে বিমানের টিকিটের দাম অনেক বেড়ে যাবে।

এদিকে, জ্বালানি তেল নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন প্রত্যাশা অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাচ্ছে না গ্রাহক। পেট্রলপাম্প মালিকরা বলছেন সরকারও তাদের চাহিদার অর্থেক তেল সরবরাহ করছে। ফলে পাম্পে যতক্ষণ তেল থাকে ততক্ষণ দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট নেই। তবে গ্রাহকরা বেশি বেশি তেল সংগ্রহ করার কারণে সংকট তৈরি হচ্ছে।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন