বিলুপ্ত অধ্যায়-স্থানীয় সরকারের সার্কেল পঞ্চায়েত সরপঞ্চ’ গ্রন্থের প্রচ্ছদের ছবি

ভারতীয় উপমহাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন। চাণক্য বা কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্রে’ এর উল্লেখ রয়েছে।পঞ্চায়েত বা সরপঞ্চ প্রথা হল ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রাচীনতম একটি ব্যবস্থা।পঞ্চায়েতগুলো স্থানীয় জ্ঞানী,সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হত।স্থানভেদে এ পরিষদের গঠনে অনেক ভিন্নতা রয়েছে।পঞ্চায়েত প্রধানকে এলাকাভেদে মুখিয়া, সরপঞ্চ বা প্রধান বলা হত।পঞ্চায়েত শব্দের ‘পঞ্চ’ শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে যার অর্থ পাঁচ এবং আরবি ‘আয়াত’ মানে প্রমাণ, পরীক্ষা বা সাক্ষ্য।শাব্দিক অর্থে পঞ্চায়েত শব্দের অর্থ দাঁড়ায় পাঁচ ব্যক্তির মাধ্যমে কোনো ঘটনা বা সমস্যার পরীক্ষা বা নিষ্পত্তি করা।নির্বাচন বা স্থানীয় জনগণের স্বীকৃতির মাধ্যমে সরপঞ্চ হিসেবে অলংকৃত হতেন সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ।ভারতীয় উপমহাদেশে স্থানীয় সরকারের পঞ্চায়েত বা সরপঞ্চ পদ্ধতিতে পাঁচজন নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তিকে নিয়ে গ্রামীন জনগণের কল্যাণে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকান্ড পঞ্চায়েত বা সরপঞ্চ প্রথাতে সম্পন্ন হতো। গ্রাম পর্যায়ে সুশাসন, শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কারণে মহাত্মা গান্ধী পঞ্চায়েত প্রথাকে মনে প্রানে সমর্থন জানিয়েছিলেন।ভারতে ১৯৯২ সালে সংবিধানের ৭৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে পঞ্চায়েত প্রথা বা পঞ্চায়েত রাজ ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে।তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় সরকারের শাসন ব্যবস্থায় ‘সরপঞ্চ’পদটি বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের পদবীর সমতুল্য এবং পঞ্চায়েতগুলো বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলীর মতো বিভিন্ন গনকল্যাণমূলক সেবা প্রদান করতো বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমাদের দেশে পুরাতন এই পঞ্চায়েত প্রথা বিলুপ্ত হলেও পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ, সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, ফরিদাবাদ, দোলাইরপাড়, কসাইটুলী ও বংশালসহ কিছু এলাকায় সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম করে থাকে বর্তমানে বিদ্যমান পঞ্চায়েত কমিটি।স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ। মৌর্য যুগে ও মৌর্যপূর্ব যুগে গ্রাম কেন্দ্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা,গুপ্ত শাসন আমলে স্থানীয় সরকার কাঠামো ছয়টি ইউনিটে ভাগ ছিল, পাল শাসন আমলে একটি শক্তিশালী আমলাতন্ত্রের বিকাশ লাভ করে। পাল শাসন আমলের পর বাংলায় সেন বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বংশের শাসনামলের শেষ দিকে বাংলায় মুসলমানদের শাসন বিস্তার লাভ করে। মুঘল শাসন আমলে বাংলাকে বিভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা হয়,তখন গ্রাম এলাকায় পঞ্চায়েত প্রথা গড়ে তোলা হয়। গ্রাম প্রশাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। ব্রিটিশ শাসন আমলে মুঘল আমলের শাসন ব্যবস্থার কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। ১৮৭০ সালে বেঙ্গল চৌকিদারী আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে গ্রাম পর্যায়ে পাঁচজন ব্যক্তির মাধ্যমে একটি পঞ্চায়েত কমিটি গঠন করার ক্ষমতা ও নির্দেশনা দেয়া হয়। তখন পঞ্চায়েত কমিটির কাছে গ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা ও চৌকিদার নিয়োগের দায়িত্ব অর্পিত হয়।

সুরমা–কুশিয়ারা ও টেমস পাড়ের শক্তিমান লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক মতিয়ার চৌধুরী রচিত ‘বিলুপ্ত অধ্যায়- স্থানীয় সরকারের সার্কেল পঞ্চায়েত সরপঞ্চ’ গ্রন্থটি ইতিহাসের এক অমূল্য নথি। অতীত ঐতিহ্যের বিস্মৃত পথগুলি তিনি যে নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে উন্মোচন করেছেন তা আমাদের মনে প্রচন্ড ইচ্ছা জাগায় হারিয়ে যাওয়া সমাজ-ব্যবস্থার স্পন্দন পুনরায় অনুভব করার।গ্রন্থটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে কালের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প, ক্ষমতার প্রান্তিক কাঠামো এবং গ্রামের সামাজিক রীতিনীতির নিঃশব্দ ইতিহাস। প্রতিটি তথ্য, প্রতিটি বিশ্লেষণ লেখকের গভীর অনুসন্ধিৎসা,পরিশ্রম ও সৎ গবেষণার পরিচয় বহন করে।মতিয়ার চৌধুরীর লেখার ভাষা যেমন প্রাঞ্জল;তেমনি তাঁর উপস্থাপন ভঙ্গি ইতিহাসকে শুধু নথিবদ্ধই করে না,পাঠকের মনে জীবন্ত করে তোলে। বইটি পড়া শেষ করে আমার মনে হয়েছে,এই বিলুপ্ত অধ্যায়কে নতুন করে জানার সৌভাগ্য পেলাম।বইটিতে সরপঞ্চ ব্যবস্থার প্রাচীন পদ্ধতিকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।এতে সিলেট অঞ্চলের তৎকালীন মহকুমা ও থানাভিত্তিক সার্কেল সংখ্যা এবং সেগুলোর মানচিত্র উল্লেখ করা হয়েছে।গ্রন্থে সিলেট অঞ্চলের ১২০ জন সরপঞ্চ ও সহকারী সরপঞ্চের নাম এবং তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য এক অমূল্য দলিল। এই গ্রন্থটিতে তৎকালীন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি আঞ্চলিক,ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক রূপরেখা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে এবং এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পঞ্চায়েত প্রথার অমূল্য অধ্যায় লিপিবদ্ধ হয়েছে।

লেখক মতিয়ার চৌধুরীর মরহুম পিতা রফিকুল হক চৌধুরী এবং উনার দুই চাচা মরহুম শফিকুল হক চৌধুরী ও মরহুম আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী প্রায় ৩০ বছর সরপঞ্চ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গণমানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। গ্রন্থটি লেখক , গবেষক, সাংবাদিক ও ইতিহাস অনুসন্ধানী যেকোনো পাঠকের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ।হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের কামারগাঁও (পুরাদিয়া) গ্রামের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী পরিবারের সন্তান,লেখক ও গবেষক মতিয়ার চৌধুরীর জন্ম সিলেট শহরে।এশিয়ার প্রাচীনতম সংবাদপত্র তৎকালীন সাপ্তাহিক যুগভেরী (বর্তমানে দৈনিক) পত্রিকার মাধ্যমে আশির দশকে সাংবাদিকতা শুরু করেন।যুক্তরাজ্যে ও সিলেট বিভাগে মতিয়ার চৌধুরী বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।তিনি লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক এবং ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।’বিলুপ্ত অধ্যায়- স্থানীয় সরকারের সার্কেল পঞ্চায়েত সরপঞ্চ’ গ্রন্থটির লেখক মতিয়ার চৌধুরী প্রায় ৫০টি সিলেটি ভাষার পুথি’র অনুবাদ করেছেন এবং কম্পিউটারে সিলেটি ভাষার ফন্ট তৈরি করে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছেন। মুক্তমনা ও প্রগতিশীল লেখক, গবেষক মতিয়ার চৌধুরী তাঁর ছাত্র জীবন থেকেই গণমাধ্যমের সাথে সম্পৃক্ত।তাঁর লেখা প্রতিবেদন ও কলাম বাংলাদেশ,যুক্তরাজ্য এবং আমেরিকার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও নিউজ পোর্টালে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এবং তাঁর লেখা একাধিক গ্রন্থ পাঠক মহলে অনেক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস (স্নাতকোত্তর) বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী লেখক মতিয়ার চৌধুরী বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ।বর্তমানে তিনি স্থায়ীভাবে ইংল্যান্ডের পূর্ব লন্ডনে বসবাস করছেন।

শাহ মনসুর আলী নোমান: কলাম লেখক; সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার,নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন