গ্রীষ্মের তাপদাহে একসময় যে শীতল পাটি ছড়িয়ে দিত প্রশান্তির পরশ, সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ সিরাজগঞ্জে বিলুপ্তির মুখে। একসময় অতিথি আপ্যায়ন, দৈনন্দিন ব্যবহার কিংবা বিয়ে, গায়েহলুদ ও সুন্নতে খাতনাসহ নানা সামাজিক আয়োজনে শীতল পাটির বিকল্প ছিল না। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাজার জুড়ে প্লাস্টিক ও কৃত্রিম উপকরণের আধিপত্যে এখন ফিকে হতে বসেছে শতবর্ষী এই লোকশিল্প।
শীতল পাটি মূলত বাংলাদেশের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প। ‘মুর্তা’ বা ‘পাটিবেত’ নামক গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল থেকে এটি তৈরি হয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই সিরাজগঞ্জের শীতল পাটির সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমানে জেলার প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মানুষের জীবিকা এই পাটিশিল্পের ওপর নির্ভরশীল হলেও প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতা ও সঠিক মূল্যের অভাবে বিপাকে পড়েছেন কারিগররা। এর মধ্যেও কামারখন্দের চাঁদপুর, সদর উপজেলার চুনিয়াহাটি এবং রায়গঞ্জের আটঘরিয়া ও দরবস্ত গ্রামের শতাধিক পরিবার এখনও পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।
চাঁদপুর গ্রামের কারিগর মননজয় চন্দ্র বলেন, “একটি পাটি বুনতে কয়েক দিন সময় লাগে। কিন্তু পরিশ্রম ও শ্রমের তুলনায় ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন।”
একই গ্রামের মমতা রাণী ও স্বপ্না রাণী জানান, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে প্লাস্টিক ম্যাটের আধিপত্য এই শিল্পের প্রধান বাধা। সপ্তাহে একটি পাটি বুনে মজুরি মেলে মাত্র ৫-৬ শত টাকা। ফলে নতুন প্রজন্ম এ কাজ শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
৯০ বছর বয়সী কারিগর দুলাল চন্দ্র ভৌমিক জানান, ৫ ফুট বাই ৭ ফুট আকারের একেকটি শীতল পাটি দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বুটকা দিয়ে তৈরি একই মাপের সাধারণ পাটি বিক্রি হয় মাত্র ৬০০ টাকায়। তিনি বলেন, “আগে সারা দেশ থেকে পাইকাররা এসে পাটি কিনে নিয়ে যেত, কদরও ছিল অনেক। কিন্তু এখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়া ও বৈচিত্র্যময় বিকল্পের কারণে ব্যবহারে ভাটা পড়েছে।” কারিগরদের একাংশ জানান, পুঁজির সংকট ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশা এ শিল্পের গতিকে থমকে দিয়েছে।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, “জেলার এই প্রাচীন ঐতিহ্য ও কারিগরদের সুরক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিপণন সহায়তার উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।”
