বিষাক্ত ভারী ধাতু ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে কুশিয়ারা নদী

কুশিয়ারা নদী-এর তলদেশ ভয়াবহভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। বিষাক্ত ভারী ধাতু ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতিতে নদীটির পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ানীবাজার উপজেলার কুশিয়ারা নদীর ৯টি জনবহুল পয়েন্ট থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় বিপজ্জনক মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের গবেষক দল।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নদীর তলদেশের প্রতি কেজি পলিতে সর্বোচ্চ ৪৩০০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গড়ে এই সংখ্যা প্রায় ২৮০০টি। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে ফ্র্যাগমেন্ট ৫১ শতাংশ, ফাইবার ২৬ শতাংশ এবং ফিল্ম ১৮ শতাংশ। এছাড়া পলিইথিলিন, পলিস্টাইরিন ও পলিপ্রোপিলিনসহ ৭ ধরনের পলিমারের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, নদীর তলদেশে ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতুর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে। ফলে বিষাক্ত ধাতু মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি কুশিয়ারা নদীতে ফেলা হচ্ছে। বিভিন্ন খাল-নালার মাধ্যমে নর্দমার দূষিত পানিও নদীতে মিশছে। এতে দিন দিন দূষণের মাত্রা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, কুশিয়ারা নদীর পলিতে দূষণের মাত্রা বর্তমানে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ বা ক্লাস-ভি পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের আধিক্য নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে বৈরাগীবাজার এলাকায় মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত মৎস্যজীবী জাবেদ বলেন,
“আগে নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন পানি দূষিত হয়ে গেছে, মাছও কমে গেছে। জীবন চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

বিয়ানীবাজার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হাসান বলেন, নদীতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পড়ছে। তিনি পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আমির হোসাইন খান জানান, নদীর স্রোতের গতি কমে যাওয়ায় এর স্বাভাবিক পরিবহন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে নদীর গভীরতা কমছে এবং তলদেশে দূষিত পদার্থ জমে থাকছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে কুশিয়ারা নদীর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য দ্রুত নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন