বিশ্বজুড়ে সেহরি ও ইফতার: ভিন্ন স্বাদেও অনুভূতি অভিন্ন

রমজান এমন একটি মাস, যা পৃথিবীর সব প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন রঙে ধরা দেয়, তবু অনুভূতিটা এক। রোজা মানেই সংযম, কৃতজ্ঞতা আর আত্মশুদ্ধির প্রতিচ্ছবি। ভোরের আগে নীরব রান্নাঘরে সেহরির প্রস্তুতি, আর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতারের টেবিলে প্রাণের উচ্ছ্বাস, এই দুই সময় যেন রমজানের হৃদস্পন্দন। চলুন ঘুরে দেখা যাক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেহরি ও ইফতারের বিচিত্র সব আয়োজন, আর সঙ্গে থাকছে বাংলাদেশের নিজস্ব মেন্যুর বিস্তারিত চিত্র।

তুরস্কে ভূমধ্যসাগরীয় স্বাদে সাদামাটা সেহরি, জমকালো ইফতার

তুর্কিতে সেহরি সাধারণত পুষ্টিকর ও হালকা। টাটকা রুটি, জলপাই, সাদা পনির, টমেটো, সেদ্ধ ডিম, দইয়ের সঙ্গে মধু ও বাদাম- এই সরল আয়োজনেই দিন শুরু হয় সেখানে।

ইফতারে থাকে বিশেষ রমজানের রুটি ‘রামাজান পিদেসি’। খেজুর ও মসুর ডালের স্যুপ দিয়ে শুরু করে এরপর কাবাব, দোলমা (আঙুরপাতায় মোড়ানো পুর), ভাতের নানা পদ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। শেষে থাকে সিরাপভেজা বাকলাভা।

সৌদি আরবে সুন্নাহর অনুসরণে ঐতিহ্যের ছোঁয়া

সৌদি আরবে সেহরি শুরু হয় খেজুর ও পানি দিয়ে। অনেক পরিবার হরিস (গম ও মাংসের ধীরপাক রান্না) বা ফুল (শিমজাতীয় খাবার) খায়।

ইফতারে প্রধান আকর্ষণ খাবসা বা মান্দি, মসলা মেশানো ভাতের ওপর মুরগি বা খাসির মাংস। সঙ্গে সমুসা, স্যুপ, সালাদ ও বিভিন্ন ফলের শরবত। খেজুরভর্তি মামুলও জনপ্রিয়।

মরক্কোয় হারিরার উষ্ণতা

মরক্কোর ইফতার মানেই হারিরা। মানে টমেটো, ডাল ও ছোলার ঘন স্যুপ। সেহরি তুলনামূলক হালকা হয়। যেমন রুটি, ডিম, দই, পুদিনা চা, মধু বা জলপাই তেল।

সূর্যাস্তে দুধ ও খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু হয়। এরপর হারিরা, সেদ্ধ ডিম, পনির ও মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়।

পাকিস্তানে ভরপুর ও ভাগাভাগির আনন্দ

পাকিস্তানে সেহরি সাধারণত হয় রুটি বা পরোটা, ডিম, দই ও চা দিয়ে। ইফতারে খেজুরের পর ফলের চাট, পাকোড়া, সমুসা, দই বড়া। গোলাপি শরবত রূহ আফজা রমজানের পরিচিত পানীয়। মূল খাবারে হালিম ও বিরিয়ানি প্রধান।

ভারতে মসলার বৈচিত্র্যে রঙিন আয়োজন

ভারতে অঞ্চলভেদে সেহরি ভিন্ন। অনেকেই পরোটা, তরকারি, ডিম, দই বা আগের রাতের বিরিয়ানি খান। কেউ কেউ সঙ্গে ফল ও দুধ রাখেন।

ইফতারে বাজার জমে ওঠে সেখানে। সমুসা, পাকোড়া, কাবাব, ফলের চাট। মূল খাবারে থাকে হালিম ও সুগন্ধি বিরিয়ানি। ইফতার এখানে উৎসবের মতো প্রাণবন্ত।

মিসরে আলোকিত রজনী ও ঐতিহ্যবাহী পদ

মিসরে রমজানের রাত হয় আলোকোজ্জ্বল। সেহরিতে ফুল মেদামেস (মসুর বা শিমজাতীয় রান্না) ও রুটি জনপ্রিয়।

ইফতারে স্যুপ দিয়ে শুরু, এরপর কোশারি (ভাত, ডাল, পাস্তা ও টমেটো সসের মিশ্রণ) বা মোলোকিয়া। কুনাফা ও কাতায়েফ মিষ্টান্ন হিসেবে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

ইন্দোনেশিয়ায় মিষ্টি দিয়ে ইফতার

ইন্দোনেশিয়াতে সেহরিতে ভাতভিত্তিক খাবার থাকে বেশি। যেমন নাসি লেমাক, ভাজা ভাত বা পায়েসজাতীয় ভাত।

ইফতার শুরু হয় কলাক পিসাং দিয়ে। এটি নারকেলের দুধ ও খেজুর গুড় দিয়ে রান্না করা কলা। স্যুপ ও ভাতের কেকও পরিবেশন করা হয়।

নাইজেরিয়ায় পুষ্টিকর ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ

নাইজেরিয়াতে সেহরি হয় রুটি, শিম, চা বা ভুট্টার পায়েস দিয়ে।

ইফতারে ময় ময় (শিমের পুডিং), ভাজা কলা, গ্রিল মাংস ও জোলফ ভাত জনপ্রিয়।

মালয়েশিয়ায় রমজান বাজারের উচ্ছ্বাস

মালয়েশিয়াতে সেহরিতে ভাত বা নাসি লেমাক থাকে। ইফতারে খেজুরের পর বাবুর লাম্বুক (মসলাযুক্ত ভাতের পায়েস), সঙ্গে রুটি ও মিষ্টি চেনডোল পরিবেশন করা হয়।

বাংলাদেশে ঐতিহ্য, স্বাদ ও পারিবারিক বন্ধনের মেলবন্ধন

বাংলাদেশে রমজান মানেই ঘরোয়া উষ্ণতা ও পরিচিত স্বাদের টান। এখানে সেহরি সাধারণত ভাত বা রুটি দিয়ে শুরু হয়। সঙ্গে থাকে ডাল, সবজি, ডিম ভাজি বা ঝোল, মাছ বা মাংসের হালকা তরকারি। অনেকেই দই, কলা বা খেজুর রাখেন। গ্রামাঞ্চলে নানা পদের ভর্তা থাকে। যেমন আলু, বেগুন বা ডাল ভর্তা খুব জনপ্রিয়। শহরে অনেকে ওটস, দুধ ও ফল দিয়ে হালকা সেহরি সারেন। পর্যাপ্ত পানি পান করা ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলা এখন সচেতনতার অংশ হয়ে উঠছে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের ইফতার টেবিল সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। খেজুর ও পানি দিয়ে শুরু হয় ইফতার। এরপর ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, হালিম, ফলের চাট- এসব যেন অপরিহার্য। পুরান ঢাকার ইফতার বিশেষভাবে বিখ্যাত, যেখানে কাবাব, বড়া ও মিষ্টান্নের বিশাল আয়োজন দেখা যায়।

শরবতের মধ্যে লেবুর শরবত, বোরহানি, তোকমার শরবত জনপ্রিয়। মূল খাবারে থাকে খিচুড়ি, পোলাও বা বিরিয়ানি। অনেক পরিবারে ইফতার শেষে তারাবির নামাজের আগে হালকা ভাত বা রুটি খাওয়ার প্রচলনও আছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ইফতার শুধু খাবারের আয়োজন নয়, বরং পারিবারিক মিলনমেলা ও ভাগাভাগির আনন্দ।

একই চেতনা, ভিন্ন স্বাদ

দেশভেদে উপকরণ ও রান্নার ধরন বদলায়। যেমন মরক্কোর হারিরা, দক্ষিণ এশিয়ার হালিম, সৌদি আরবের কাবসা বা ইন্দোনেশিয়ার কলাক- সবকিছুর স্বাদ আলাদা। কিন্তু সূর্যাস্তের পর প্রথম খেজুর মুখে দেওয়ার যে প্রশান্তি, তা সবার জন্য একই। সূত্র: কার্লিটেলস

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন