২০ ঘণ্টার বাসযাত্রা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চার্টার্ড বিমানে উড়াল, এরপর ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষের প্রত্যাশা কাঁধে নিয়ে এক ম্যাচের লড়াই। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরাকের পথচলা ছিল রূপকথার মতোই কঠিন, আবেগময় ও নাটকীয়।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে ২১ ম্যাচের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বাছাই পর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে ইরাক। এই গ্রীষ্মের বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া শেষ দলও তারা।
তবে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল মেক্সিকোতে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফ ফাইনালে পৌঁছানোর যাত্রা।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে তৈরি হয় জটিলতা।
সেই পরিস্থিতিতে ইরাকের অনেক ফুটবলারকে সড়কপথে জর্ডানে যেতে হয়। এরপর ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পর বিলম্বিত ফ্লাইটে অঞ্চল ছাড়েন তারা।
ইরাক কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড আল জাজিরাকে বলেন, ‘মেক্সিকো পৌঁছানোর পর পুরো যাত্রার ধকল কাটাতে তাদের তিন দিনের ছুটি দিতে হয়েছিল। সফরটা কঠিন ছিল। তবে আমি তাদের বলেছিলাম, এটাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার কোরো না।’
কোচের সেই বার্তা ঠিকই মাঠে বাস্তবায়ন করেন ফুটবলাররা। মনতেরেইয়ে প্লে-অফ ফাইনালে সব চাপ ও বিভ্রান্তি দূরে সরিয়ে বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারায় ইরাক। তাতেই ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’।
ইরাকের সেই ঐতিহাসিক রাতে প্রথম গোলটি করেন আলী আল-হামাদি। ২৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড গত মৌসুমে ইংলিশ ক্লাব লুটন টাউনে ধারে খেলেছেন।
আল-হামাদির জীবনের গল্পও ইরাকের মতোই সংগ্রামের। বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখন পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তিনি। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারণে ইরাকে কারাবন্দি ছিলেন তার বাবা। মুক্তির পর ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের কিছুদিন পর দেশ ছাড়ে তার পরিবার। পরে তারা বসতি গড়ে লিভারপুলের টক্সটেথ এলাকায়।
দেশ থেকে দূরে থাকলেও পরিবারে ইরাকি সংস্কৃতির উপস্থিতি ছিল সবসময়। আল-হামাদি বলেন, ‘বড় হওয়ার সময় আমরা ঘরে নিজেদের ভাষায় কথা বলতাম। একই খাবার খেতাম, একই গান শুনতাম। আমাদের ইরাকি টিভিও ছিল, আলাদা ব্যবস্থায় দেশের চ্যানেলগুলো দেখা যেত।’
নিজ দেশের সঙ্গে সেই আবেগের সম্পর্কই বোঝা যায় বলিভিয়ার বিপক্ষে গোলের পর তার উদ্যাপনে। কর্নার থেকে গোল করে ইরাককে এগিয়ে দেওয়ার পর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন তিনি।
আল-হামাদি বলেন, ‘ওই মুহূর্তটা পাওয়ার জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। জীবনের বাকি সময় এটা আমার সঙ্গে থাকবে।’
ইরাকের সমর্থকদের জন্য এই মুহূর্তের অপেক্ষা ছিল ৪০ বছরের। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা একসময় এশিয়ার শক্তিশালী ফুটবল দল হিসেবে পরিচিত ইরাককে অনেকটাই পিছিয়ে দেয়। জাতীয় দলকে দীর্ঘদিন ঘরের ম্যাচও খেলতে হয়েছে দেশের বাইরে।
এই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ে বড় এক আনন্দ এসেছিল ২০০৭ সালে। সেবার ফাইনালে সৌদি আরবকে হারিয়ে এশিয়ান কাপ জিতেছিল ইরাক। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেরার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। তাই মেক্সিকোর সেই প্লে-অফ ফাইনালের গুরুত্ব ছিল আরও বড়।
আল-হামাদি বলেন, ‘ইরাকের জাতীয় দলের জার্সির ভার অনেক বেশি। আপনি যখন সেখানে থাকেন, তখন সেটা অনুভব করেন। মানুষের প্রত্যাশার চাপ অনুভব করেন, তারা চায় আপনি জিতুন, সফল হন।’
ইরাকিদের জন্য ফুটবলকে ‘আনন্দের বাহন’ হিসেবে দেখেন আল-হামাদি। দেশের দীর্ঘদিনের সংকট থেকে সাময়িক মুক্তির পথও মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘এই অঞ্চলে এখন যা চলছে, তার মধ্যে ম্যাচের পর এবং বিশ্বকাপে ওঠার পর মানুষের মুখে আনন্দ দেখা দারুণ ব্যাপার।’
বিশ্বকাপের শেষ দল হিসেবে জায়গা পাওয়ায় প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে কম পাচ্ছে ইরাক। টুর্নামেন্টের আগে স্পেনে অনুশীলন ক্যাম্প করবে তারা। সেখানে স্পেন ও আন্দোরার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রে যাবে ইরাক। তবে বিশ্বকাপে তাদের অপেক্ষায় কঠিন পরীক্ষা। ‘আই’ গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স, নরওয়ে ও সেনেগাল। তাই গ্রুপটিকে অনেকে দেখছেন ‘গ্রুপ অব ডেথ’ হিসেবে।
বিশ্বকাপে অভিজ্ঞতাহীন এই ইরাক দলকে সামলানোর দায়িত্বে আছেন অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। বড় টুর্নামেন্টের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা তার যথেষ্ট। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে শেষ ষোলোতে তুলেছিলেন তিনি। সেবার আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় সকারুরা। ২০০৬ বিশ্বকাপেও অস্ট্রেলিয়ার সহকারী কোচ ছিলেন আর্নল্ড, যখন শেষ ষোলোতে শেষ মুহূর্তে ইতালির কাছে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া।
উচ্চ র্যাঙ্কিংয়ের দলের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা এবার ইরাকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আর্নল্ড বলেন, ‘আমাদের সেখানে যেতে হবে এই মানসিকতা নিয়ে যে, এটা মানুষ বনাম মানুষ, একজন ফুটবলার বনাম আরেকজন ফুটবলার। দুনিয়াকে চমকে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামতে হবে। নিজের ওপর বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে যে আপনি কিছু করতে পারেন।’
১৬ জুন বোস্টনে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করবে ইরাক। সেই ম্যাচেই আর্নল্ডের মানসিকতার পরীক্ষা নেবে আর্লিং হালান্ডদের নরওয়ে। গত কয়েক মৌসুমে গোল করার ক্ষমতায় হালান্ড যেন সাধারণ মানুষের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে রোমাঞ্চিত ইরাকের মিডফিল্ডার আইমার শের। ২৩ বছর বয়সী এই ফুটবলার শৈশবের বড় একটা সময় কাটিয়েছেন সুইডেনে। এখন খেলেন নরওয়ের ক্লাব সার্পসবর্গ ০৮-এ।
শের বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরু করার জন্য যদি আমি একটি ম্যাচ বেছে নিতে পারতাম, তাহলে এই ম্যাচটাই বেছে নিতাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন যে দেশে থাকি, সেই দেশের বিপক্ষে খেলা স্বপ্নের মতো। বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগেই আমার সতীর্থরা এই ম্যাচ নিয়ে কথা বলত।’
আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার পাবলো আইমারের নামে নাম রাখা শের চার বছর বয়সে সুইডেনে যান। সেখানে নতুন জীবন শুরু করতে হয়েছিল তাকে। ফুটবল প্রতিভা লুকিয়ে থাকেনি। যুব পর্যায়ে সুইডেন জাতীয় দলের হয়েও খেলেছেন তিনি। পরে বেছে নেন জন্মভূমি ইরাককে।
ইরাকে না থাকলেও বিশ্বকাপে ওঠার অর্থ কত বড়, সেটি ভালোই বোঝেন শের। তিনি বলেন, ‘গত ৪০ বছরে ইরাক প্রায় সবকিছুর মধ্য দিয়ে গেছে, বিশ্বকাপে শেষবার খেলার পর থেকে। এমন একটি দলের অংশ হতে পারা, যারা মানুষকে আনন্দ, আশা ও ভালোবাসা দেয়..এটার জন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ এবং বিনীত।’
১৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ইরাক যখন মাঠে নামবে, সেটি হবে দীর্ঘ ও কষ্টকর বিশ্বকাপযাত্রার সমাপ্তি। একই সঙ্গে শুরু হবে নতুন অধ্যায়। যুদ্ধ-সংঘাত ও অস্থিরতার বাইরে বিশ্বকে নিজেদের আরেকটি পরিচয় দেখানোর সুযোগ পাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ।
ইরাককে কেউ ফেভারিট ভাবছে না। গ্রুপও কঠিন। তবু আল-হামাদির বিশ্বাস, লড়াই ইরাকিদের রক্তে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ হিসেবে লড়াইটা আমাদের রক্তে। বিশ্বকাপে মানুষ সেটা দেখবে।’
আল-হামাদির বিশ্বাস, ইরাক সহজে হার মানার দল নয়। তার ভাষায়, ‘তারা এমন একটি দল দেখবে, যারা দৌড়ায়, যারা কিছু ঘটাতে পারে। কোনো দল যদি অঘটন ঘটাতে পারে বা কারও আনন্দের মঞ্চ নষ্ট করতে পারে, সেটা ইরাকই হবে।’