ঈদের আনন্দমুখর পরিবেশ কাটতে না কাটতেই সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয় জনমনে গভীর উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে এক স্কুলছাত্রী ও এক অটোরিকশা চালকের মৃত্যুকে ঘিরে আত্মহত্যার আলোচনা থাকলেও, অপর এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হত্যার অভিযোগও উঠেছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
গত ২৯ মে কিশোরী তাওহীদার মৃত্যু ঘিরে রহস্য নিয়ে চলছে আলোচনা বিয়ানীবাজারের মাথিউরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাওহীদা জান্নাত (১৬) নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। সে পশ্চিমপাড়ার ইকবাল হোসেনের মেয়ে।
পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় এবং তদন্তের স্বার্থে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করে। যদিও ফোনটিতে কোনো সিম কার্ড ছিল না, তবে সে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করত বলে জানা গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল এবং কোনো মানসিক বা সামাজিক চাপ কাজ করছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকেও একজন সন্দেহভাজনের নাম পুলিশের কাছে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এসএসসি পরীক্ষা শেষ না হওয়া এবং সামনে ব্যবহারিক পরীক্ষা থাকা অবস্থায় এক কিশোরীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।
এছাড়া গত রোববার (৩১ মে) উপজেলার খাসাড়িপাড়া গ্রাম থেকে সাদিকুল ইসলাম রুপক (৩০) নামে এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরিবারের দাবি, মরদেহ উদ্ধারের সময় তার দুই হাত পেছনের দিকে বাঁধা ছিল। এ কারণে তারা ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে মানতে নারাজ। স্বজনদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এইদিকে সোমবার (১ জুন) সকালে উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের বারইগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের কবরস্থান থেকে অটোরিকশা চালক শামীম আহমদ ধনু (৪৭)-এর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পারিবারিক সূত্র জানায়, আগের রাতে তিনি স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি ফিরেছিলেন। পরদিন সকালে স্থানীয়রা তার মরদেহ দেখতে পান। মরদেহ উদ্ধারের সময় তার দুই পা বাঁধা ছিল বলে জানা গেছে।
ঘটনাস্থলে থাকা বিয়ানীবাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মহি উদ্দিন জানান, নিহতের শরীরে প্রাথমিকভাবে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ওমর ফারুক বলেন, “মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
এইসব মৃত্যু নিয়ে সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা বা আত্মহননের প্রবণতা সাধারণত একক কোনো কারণে তৈরি হয় না। পারিবারিক সংকট, সামাজিক চাপ, হতাশা, মানসিক রোগ, সম্পর্কজনিত জটিলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক কষ্ট এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সুজন সভাপতি ও কলামিস্ট অ্যাডভোকেট মো. আমান উদ্দিন বলেন, “প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে মানুষ হতাশায় ভোগে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ অনেক সময় চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সংকট অনেক সময় পরিবার ও সমাজের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়।”
নিউরো ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শ্রী সুনান্ত বিশ্বাসের মতে, “আমি আর বাঁচতে চাই না”, “সব শেষ করে দিতে চাই” এধরনের মন্তব্য, হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, অতিরিক্ত হতাশা প্রকাশ কিংবা অস্বাভাবিক আচরণকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
আত্মহত্যার চিন্তা কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা ও জটিল মানসিক সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। সময়মতো চিকিৎসা ও মানসিক ,পারিবারিক সহায়তা পেলে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে সব কারণে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে-গভীর বিষণ্ণতা ও অন্যান্য মানসিক রোগ,মাদকাসক্তি ও আসক্তিজনিত সমস্যা,পারিবারিক কলহ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন,সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব,অতীতের মানসিক ট্রমা বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতা,দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা,মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জটিলতা।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে ,সমাজ ও পরিবারের দায়িত্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,সন্তান বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত খোলামেলা কথা বলা,আচরণগত পরিবর্তন, হতাশা বা একাকীত্বের লক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা,মানসিক কষ্টকে অবহেলা না করে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া,পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও বিচারহীন আচরণ করা,মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি,আত্মহত্যা নিয়ে কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা দূর করা,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার করা,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা।
বিয়ানীবাজারে কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই তিনটি ঘটনা কেবল তিনটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
মৃত্যুগুলোর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব, তেমনি মানুষের মানসিক কষ্ট, হতাশা ও সামাজিক সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা আমাদের সবার দায়িত্ব।
প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি গল্প, কিছু না বলা কষ্ট, কিছু অদেখা সংকেত। সেই সংকেতগুলো সময়মতো বুঝতে পারলে হয়তো অনেক জীবনই বাঁচানো সম্ভব।
ঈদের আনন্দের পর বিয়ানীবাজারের এই তিন মৃত্যু তাই শুধু তদন্তের বিষয় নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য আত্মসমালোচনারও একটি উপলক্ষ।