ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে বিয়ানীবাজারে জমে উঠেছে গ্রামীণ রাজনীতি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, জনসংযোগ ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগে সরগরম উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন। দলীয় মনোনয়ন পেতে কেউ তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, আবার কেউ প্রভাবশালী নেতা ও সংসদ সদস্যের সমর্থন আদায়ে চালাচ্ছেন জোর লবিং। তবে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে একক প্রার্থী বাছাই। উপজেলার ১০ ইউনিয়নের অধিকাংশেই একাধিক নেতা দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। এর মধ্যে চারখাই, মাথিউরা ও মুল্লাপুরে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী থাকায় মনোনয়ন নিয়ে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে নির্বাচন সামনে থাকলেও দলীয় প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ে সিলেট জেলা বিএনপি থেকে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা আসেনি। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বাছাই কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্র ও জেলা পর্যায় থেকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এরই মধ্যে একাধিক নেতা নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কোন পদ্ধতিতে প্রার্থী বাছাই করা হবে, তৃণমূলের মতামত কীভাবে নেওয়া হবে কিংবা মনোনয়নের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা কীভাবে করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমদ রেজা বলেন, ইউনিয়ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শের পাশাপাশি এলাকার জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের মতামত নেওয়া হবে। বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা করা হবে।
প্রার্থী বাছাইয়ে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে চারখাই, মাথিউরা ও মুল্লাপুর ইউনিয়নে। এসব ইউনিয়নে একাধিক পরিচিত নেতা দলীয় মনোনয়ন পেতে সক্রিয় রয়েছেন। চারখাইয়ে সিলেট জেলা বিএনপির নেতা অহিদ আহমদ তালুকদার এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ইমরান আহমদ চৌধুরী মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন। মাথিউরায় সিলেট মহানগর বিএনপির উপদেষ্টা আব্দুল ফাত্তাহ বকসি, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি কছির আলী আব্দুর রব, সিলেট জেলা যুবদল নেতা সাকের মাহমুদ ও উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এনামুল ইসলাম দলীয় মনোনয়নের জন্য তৎপর রয়েছেন। মুল্লাপুরে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও একাধিকবারের চেয়ারম্যান আব্দুল মন্নান, সিলেট জেলা বিএনপির শিশুবিষয়ক সম্পাদক সিদ্দিক আহমদ এবং উপজেলা বিএনপি নেতা আব্দুল করিম নির্বাচনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
আলীনগরে সাবেক একাধিকবারের চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ মামুনকে এখন পর্যন্ত বিএনপির একক সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এ ইউনিয়নে তাঁর বাইরে অন্য কোনো প্রার্থীর নাম তেমনভাবে আলোচনায় আসেনি। শেওলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আখতার হোসেন খান জাহেদ ও যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুল করিম তাজুল মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন। দুবাগে উপজেলা বিএনপি নেতা নুরুল কিবরিয়া, দারুল ইসলাম দারা ও বর্তমান ইউপি সদস্য নিয়াজ উদ্দিন দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। কুড়ারবাজারে উপজেলা বিএনপি নেতা জুবের আহমদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিলপাড়ায় উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও একাধিকবারের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সায়ফুল ইসলাম সায়েক এবং সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। লাউতায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল জব্বার, উপজেলা জাসাসের আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান ও ছাত্রদল নেতা আবিদ রাজা। মুড়িয়া ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুল কুদ্দুছ মনোনয়ন পেতে আগ্রহী।
তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীদের মতে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ প্রভাবশালী নেতাদের ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে এগিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু সাধারণ ভোটারের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক কম। অন্যদিকে এলাকায় জনপ্রিয় অনেক নেতা রয়েছেন, যাদের সঙ্গে প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠতা নেই। ফলে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও মাঠের অবস্থান কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়েও তৃণমূলে আলোচনা রয়েছে।
সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি নজমুল হোসেন পুতুল বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে কেন্দ্র বা জেলা আমাদের কোনো নির্দেশনা দেয়নি। তাছাড়া স্থানীয় নির্বাচন হয় আঞ্চলিক ভিত্তিতে। সুতরাং আসন্ন ইউপি নির্বাচনে দল কীভাবে একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেবে, তা এখনো বোধগম্য নয়।’
সিলেট জেলা বিএনপির সহপরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ছরওয়ার হোসেন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দলের দায়িত্বশীল নেতাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন অপরিহার্য।
বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া দলীয় মনোনয়ন দিলে ভোটের মাঠে হিতে বিপরীত হতে পারে।’
সব মিলিয়ে বিয়ানীবাজারে ইউপি নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতাও তত বাড়ছে। এখন দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তবে একাধিক প্রার্থীর ভিড়ে শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেওয়া হবে এবং মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের কীভাবে দলীয় সিদ্ধান্তের পক্ষে রাখা হবে, সেটিই হতে যাচ্ছে বিয়ানীবাজার বিএনপির বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
