- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

নিরাপত্তার প্রহরায় মানবিকতার ছোঁয়া
বিয়ানীবাজার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনসারদের প্রশংসনীয় ভূমিকা


হাসপাতাল মানেই অসুস্থ মানুষের ভিড়, চিকিৎসার ব্যস্ততা আর নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্ভাবনা। এমন একটি স্পর্শকাতর পরিবেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালনরত অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা। সরকারি নির্দেশনা ও জেলা কমান্ড্যান্টের আদেশে দায়িত্ব পালনকারী এসব সদস্যের সতর্কতা, সাহসিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক তৎপরতায় হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যেমন ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তেমনি রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন আস্থা।

নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শুধু হাসপাতালের প্রবেশপথ পাহারা দেওয়া কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না তারা। হারানো মালামাল উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, অসহায় রোগীকে সহযোগিতা করা, স্বজনদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত এগিয়ে আসা এবং হাসপাতাল এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা।

হাসপাতালে দায়িত্ব পালনরত সাধারণ আনসার সদস্য সৈনিক আসলাম সরকার (আইডি নং-৯৫৬১৭), নুরুল ইসলামসহ অন্যান্য সদস্যদের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতায় বিভিন্ন সময়ে এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা তাদের পেশাদারিত্ব ও মানবিকতার পরিচয় বহন করছে। সম্প্রতি তাদের তৎপরতায় হাসপাতাল থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আনসার সদস্য আসলাম সরকার ও নুরুল ইসলামের তৎপরতায় উদ্ধার হওয়া Redmi A7 Pro মোবাইল ফোনটি যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত মালিক মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন, পিতা—মোঃ কমর উদ্দিন, গ্রাম—উত্তর দুবাগ, বিয়ানীবাজার, সিলেটের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হারানো সম্পদ উদ্ধারের এ ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে আনসার সদস্যদের সততা ও দায়িত্ববোধের প্রশংসা করেন রোগী ও স্বজনরা।

শুধু হারানো সম্পদ উদ্ধার নয়, হাসপাতালের নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের সতর্কতার আরেকটি দৃষ্টান্ত দেখা গেছে গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ওইদিন বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমার্জেন্সি বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে আনসার সদস্যদের সতর্ক ও তাৎক্ষণিক তৎপরতায় সৈনিক আসলাম সরকারের সহযোগিতায় আনসার সদস্য রবিন দাশ (প্রহর আইডি নং-৮৫৭৬৪) ৭.৬২ ক্যালিবারের পাঁচ রাউন্ড গুলিসহ একজন ব্যক্তিকে আটক করেন। পরে আটক ব্যক্তিকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আটক ব্যক্তির নাম মোঃ পারভেজ আহমদ। তিনি টিকরপাড়া, বাঘপ্রন্দ্র, ডাকঘর—বাহাদুরপুর, বিয়ানীবাজার, সিলেট এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

হাসপাতালের মতো জনসমাগমপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানে অস্ত্র ও গুলিসহ একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করে আটক করার ঘটনা নিরাপত্তা দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টিই সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের তৎপরতা হাসপাতালকে অপরাধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড থেকে নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে নিরাপত্তার কঠোর দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিকতার জায়গাতেও পিছিয়ে নেই এসব আনসার সদস্য। অসুস্থ, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত রোগীদের সহযোগিতা করা, স্বজনদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং জরুরি প্রয়োজনে রোগীর পাশে দাঁড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড নিয়মিতই করছেন তারা। গত ৬ আগস্ট ২০২৬ দায়িত্ব পালনকালে অসহায় এক রোগীকে সহযোগিতা করার ঘটনাও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

মানবিকতার এ ধারাবাহিকতায় স্বেচ্ছায় রক্তদানেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সৈনিক আসলাম সরকার। অসুস্থ রোগীর প্রয়োজনে তিনি ২৮ এপ্রিল ২০২৫ এবং ২ মার্চ ২০২৬ দুই দফায় স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। দায়িত্বের পোশাকের বাইরে একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসার এমন উদ্যোগ হাসপাতালকেন্দ্রিক আনসার সদস্যদের মানবিক দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

হাসপাতালে দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্যরা জানান, তাদের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা নয়; বিপদে পড়া রোগী ও স্বজনের পাশে দাঁড়ানোও দায়িত্বেরই অংশ। কোনো রোগী অসহায় অবস্থায় থাকলে তাকে সহযোগিতা করা, হারানো কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং হাসপাতালের পরিবেশে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়াকে তারা নিজেদের কর্তব্য হিসেবে দেখেন।

সৈনিক আসলাম সরকার বলেন, “আমরা সবাই একটি টিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের সহযোগিতা করাও আমাদের দায়িত্ব। সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করে হাসপাতালের পরিবেশ নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাখাই আমাদের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতেও আমরা সততা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে চাই।”

এদিকে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের সাহসিকতা, সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। তাদের ভাষ্য, হাসপাতালে নিরাপত্তাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। বিশেষ করে হারানো সম্পদ উদ্ধার, অসহায় রোগীকে সহযোগিতা কিংবা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত এগিয়ে আসার মতো ঘটনায় আনসার সদস্যদের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, দালালচক্র ও অনিয়ম প্রতিরোধ এবং সেবাগ্রহীতাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। এরই অংশ হিসেবে দেশের ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ হাজার সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন প্লাটুন কমান্ডার, একজন সহকারী প্লাটুন কমান্ডার এবং আটজন আনসার সদস্যসহ মোট ১০ জন করে সদস্য ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন।

গত ১ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদরদপ্তরে আয়োজিত অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনূর রশিদ এ তথ্য জানান। তিনি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি জনগণের নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র, অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য, ওষুধ চক্রসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আনসার সদস্যদের কার্যকর ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা বিধান এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীকে সহায়তা, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রদান, দুর্যোগ মোকাবিলা, ত্রাণ বিতরণ এবং জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডেও বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৪৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আনসার বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়। বাহিনীর সদর দপ্তর ঢাকার খিলগাঁওয়ে এবং আনসার-ভিডিপি একাডেমি গাজীপুরের শফিপুরে অবস্থিত।

বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—নিরাপত্তা আর মানবিকতা একে অপরের পরিপূরক। দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহসিকতা, হারানো সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার সততা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাদের দায়িত্বকে কেবল নিরাপত্তা প্রহরায় সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং হাসপাতালকেন্দ্রিক জনসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।

রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি হাসপাতালের সেবার পরিবেশকে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মানবিক করতে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের এমন দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের। নিরাপত্তার প্রহরায় মানবিকতার এই সমন্বিত উদ্যোগ বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনআস্থা আরও সুদৃঢ় করবে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন