কুসুমগাছ সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি ড. নওয়াজেশ আহমদের ‘বাংলার বনফুল’ গ্রন্থ থেকে। ফুলটির চটকদারী রং রীতিমতো চোখ-ধাঁধানো। প্রেমে পড়ে গেলাম। বর্ণনা পড়ে জানতে পারি, গাছটি পথের ধারে, পরিত্যক্ত স্থানে, ঝোপজঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে।
এর পর থেকেই সতর্ক দৃষ্টি। কিন্তু রমনা পার্কে বৃক্ষাচার্য দ্বিজেন শর্মা যখন উঁচু কয়েকটি গাছ দেখিয়ে বললেন—এর নাম কুসুম, তখন বিভ্রান্ত না হয়ে পারি না। অবশ্য সমাধানও তিনিই করে দিলেন। বললেন, শেষোক্ত গাছটি লটকন বা লাক্ষ্যা নামেও পরিচিত।
কিন্তু প্রথমোক্ত কুসুম দীর্ঘদিন আমার কাছে অধরাই থেকে যায়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, গাছটির বীজ নানা কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় দেশের কোথাও কোথাও যৎসামান্য চাষ হয়। অবশেষে কৃষিবিদ কামরুজ্জামানের মাধ্যমে কুসুমের সন্ধান পাই। পাবনা জেলার সুজানগরে গেলে এই সুদর্শনার দেখা মিলবে।
সেখানে গেলাম একদিন। ঢাকা থেকে প্রত্যুষে বেরিয়ে দুপুর নাগাদ পৌঁছানো গেল সেখানে। স্থানীয়দের সহায়তায় মাঠে গিয়েই দেখা পেলাম কাঙ্ক্ষিত ফুলটির। সেই সৌন্দর্য তুলনাহীন। মাঠে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রজাপতি যেন বসে আছে।
উচ্ছ্বসিত আমি ছবি তুলতে থাকি। অর্ধশত ছবি তোলার পরও অতৃপ্তি থেকে গেল। অথচ এমন মোহনীয় এই ফুলের চাষ হয় নিতান্তই অবহেলায়, পেঁয়াজক্ষেতের পাহারাদার হিসেবে। কারণ গাছটি কণ্টকিত। মানুষ তো নয়ই, গবাদি পশুরাও এর ধারেকাছে আসে না। সেখানকার কৃষকরা পেঁয়াজবীজের গোলাকার ফুলটিকে কদম নামে ডাকেন। আর এসব বীজের ক্ষেত কদমক্ষেত নামেই পরিচিত।
মেঘদূতের কবি কালিদাস কুসুম সম্পর্কে লিখেছেন—
‘নব কুসুম্ব পুষ্পবরণ সিন্দুরসম রাঙা
আগুন প্রবল পবনে দ্বিগুণ জ্বলে
ব্যাকুল অনল অটবীলতারে বাঁধিতে আলিঙ্গনে
ধরণীতে ঘিরি দাহ করে পলে পলে।’
কুমুস (Carthamus tinctorious) মূলত বীরুৎ শ্রেণির প্রাকৃতিক রঙের গাছ। এরা বর্ষজীবী, খুবই ছোট, ঝোপালো ধরনের। থাকে মাটির কাছাকাছি। মূলত এ গাছের পাপড়ি থেকেই রং পাওয়া যায়। একসময় কাপড় তৈরির জন্য বয়নশিল্পীরা সুতা রাঙানোর কাজে কুসুমের রং ব্যবহার করতেন। প্রাচীন মিসরে প্রায় তিন হাজার পাঁচ শ বছর আগেও এর চাষ হতো। আমাদের দেশে ইংরেজ আমলে কুসুমের বেশ কদর ছিল।
একসময় কুসুম পরিত্যক্ত মাঠ কিংবা ঘাসবনে আপনা-আপনিই জন্মাত। এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজক্ষেতে বেড়ার প্রয়োজনে চাষ করা হয়। কাপড়ের রং হিসেবে কুসুম অনেক পুরনো ও বিখ্যাত। কুসুমের রং সংগ্রহ করা হয় তার পাপড়ি থেকে। ফুল ফোটে ফাল্গুন মাসে। লম্বাটে পাতার কিনারে ধারালো ও তীক্ষ কাঁটা থাকে। কুসুমের বীজতেল নানা রোগের মহৌষধ হিসেবে ব্যবহার্য। বীজ পাখিদের প্রিয় খাবার।
কুসুমের কমলা-লাল রঙের ফুল কোথাও কোথাও খাবারের রঙে জাফরানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হাঙ্গেরি বা উত্তর আফ্রিকায় পর্যটকদের কাছে এগুলো প্রায়শই ‘জাফরান’ হিসেবে বিক্রি করতে দেখা যায়। তবে মসলা হিসেবে এর মূল্য প্রায় শূন্য হলেও রঞ্জক হিসেবে অসাধারণ। কুসুম থেকে তৈরি চা তীব্র ঘাম উৎপন্ন করে। এ কারণে ঠাণ্ডা এবং এ সম্পর্কিত রোগের জন্য এই চা বেশ কার্যকর। কখনো কখনো হিস্টিরিয়ার জন্যও কুসুম শান্তিদায়ক। বীজের গুঁড়া নবজাতকের গর্ভাশয়ের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফুল জন্ডিস নিরাময়েও উপকারী।
