বন্ধ হোক শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও বলৎকার

একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সেখানে শিশু, নারী ও দুর্বল মানুষ কতটা নিরাপদ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে মানবিক মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটছে। দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে শিশু নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে হৃদয়বিদারক সব খবর—কোথাও আপন চাচা, কোথাও নানা, কোথাও শিক্ষক, আবার কোথাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। এসব ঘটনা শুধু অপরাধ নয়, মানবতার বিরুদ্ধে নির্মম আঘাত।
শিশুদের কোমল মন, সরল বিশ্বাস এবং অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর বিকৃত মানসিকতার মানুষ তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট, মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফির বিস্তার, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—অনেক ঘটনা লোকলজ্জা, সামাজিক ভয় কিংবা প্রভাবশালীদের চাপে প্রকাশই পায় না। ফলে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
বিশেষ করে কিছু আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি ধর্মীয় বা শিক্ষকের পরিচয়ের আড়ালে শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করছে। অবশ্যই এটি পুরো কোনো শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করার বিষয় নয়; কারণ অসংখ্য আলেম, শিক্ষক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন কিন্তু ভয়াবহ ঘটনা পুরো সমাজকে নাড়া দিচ্ছে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার জন্য কঠোর নজরদারি, জবাবদিহিতা ও কার্যকর নীতিমালা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা ও কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান দুই ধারা। এর মধ্যে কওমি মাদ্রাসা উপমহাদেশের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা, যা ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে “দেওবন্দি মাদ্রাসা” নামেও পরিচিত। মূলত ভারতের ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাস, আদর্শ ও ধর্মীয় দর্শনের ভিত্তিতেই এই শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে। ১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ধারার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯০১ সালে চট্টগ্রামের দারুল উলুম হাটহাজারী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার বিস্তার শুরু হয়।
এই মাদ্রাসাগুলো সাধারণত মুসলিম সমাজের দান, সদকা, যাকাত ও লিল্লাহ বোর্ডিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরাও এখানে বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে ভিন্নতা দেখা যায়। ২০১৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৪ হাজার কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে প্রায় ১৪ লক্ষ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এই সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। আবার ২০০৯ সালে উইকিলিকসে প্রকাশিত ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের এক গোপন বার্তায় বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ২৩ হাজার থেকে ৫৭ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
এত বিশাল একটি শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের লাখো শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ জড়িত। তাই কওমি মাদ্রাসা নিয়ে আলোচনা করতে হলে অবশ্যই দায়িত্বশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষাবিষয়ক কার্যকর নীতিমালা যুক্ত করা গেলে এই শিক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আরও যুগোপযোগী ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে বের হলেও তাদের অনেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না। ফলে হতাশা, দারিদ্র্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা গেলে তারা দেশ ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী শিক্ষা চালু করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মনিটরিং, সিসিটিভি ব্যবস্থা, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ পদ্ধতি এবং অভিভাবকদের সরাসরি তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক ব্যবস্থার বিষয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও বলৎকারের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য। একই সঙ্গে পরিবার থেকেই শিশুদের সচেতনতা শিক্ষা দিতে হবে—কোন স্পর্শ নিরাপদ, কোনটি অনিরাপদ, কোথায় প্রতিবাদ করতে হবে, কাকে জানাতে হবে—এসব বিষয়ে শিশুদের বয়স উপযোগী শিক্ষা প্রয়োজন।
সমাজের প্রতিটি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক সংগঠন, প্রশাসন এবং অভিভাবকদের সম্মিলিতভাবে শিশু সুরক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কারণ শিশুদের নিরাপত্তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
বর্তমান সমাজে শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা অপরিচিত মানুষের চেয়ে পরিচিত ও কাছের মানুষদের দ্বারাই বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আত্মীয়স্বজন, পারিবারিক বন্ধু, প্রতিবেশী, গৃহশিক্ষক কিংবা পরিচিত কারও বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ এখন প্রায়ই শোনা যায়। তাই শুধু বাইরের মানুষ নয়, শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিবারকেও এখন অনেক বেশি সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।
মা-বাবাদের মনে রাখতে হবে, শিশুর সরলতা ও বিশ্বাসই অনেক সময় অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়। তাই ছোট শিশুদের কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে শেখানো ঠিক নয়। বিশেষ করে মেয়ে শিশুকে একা কারো বাসায় পাঠানো, পরিচিত বা দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের কাছে দীর্ঘ সময় একা রেখে যাওয়া কিংবা শিশুকে নজরদারি ছাড়া অন্যত্র অবস্থান করতে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
একইভাবে কিশোর ছেলে বা মেয়েদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা প্রয়োজন। অনেক সময় “আত্মীয়” বা “পরিচিত” হওয়ার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ শিশুদের মানসিক বা শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে পারে। তাই সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, কোথায় রাত কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে মা-বাবাকে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রয়োজনে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই “ভালো স্পর্শ” ও “খারাপ স্পর্শ” সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা দেওয়া জরুরি। সন্তান ভয় পেলে, অস্বস্তি বোধ করলে বা কারও আচরণে বিরক্ত হলে যেন নির্ভয়ে মা-বাবাকে বলতে পারে—সেই পরিবেশ পরিবারে তৈরি করতে হবে। শিশুকে কখনোই চুপ থাকতে শেখানো যাবে না।
মনে রাখতে হবে, সতর্কতা মানে সন্দেহপ্রবণ হওয়া নয়; বরং সন্তানের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। একজন সচেতন মা-বাবার দায়িত্বশীল আচরণ একটি শিশুর জীবনকে ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই—শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও হাসি রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও বলৎকারের সকল পথ বন্ধ হোক।
মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হোক, বিবেক জাগুক, সমাজ আলোকিত হোক। শিশুর হাসি হোক নিরাপদ বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিচ্ছবি। লেখক: কবি কলামিস্ট সম্পাদক দৈনিক সিলেট

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন