প্রচলিত ধারণা, বখতিয়ার খলজি এবং শাহজালাল (রহ.)-এর বিজয়ধারায় বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ এসব ঘটনার বহুকাল আগেই আরব বণিকরা চট্টগ্রামে ঘর-বসতি গড়ে তুলেছিলেন। বঙ্গোপসাগরের মেঘনা মোহনায় আরবিয়, ইরানি, আবিসিনিয় মুসলমানদের ব্যাপ্তি এবং সাবত-ই-গাঙ শব্দ থেকে চট্টগ্রাম নামকরণ এ অঞ্চলে রচনা করেছে আরব উপস্থিতির নীরব আখ্যান।
নুহ (আ.)-এর সঙ্গে বাঙালি জাতিসত্তা, বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত।
ঐতিহাসিক ইবনু খালদুনের মতে আদম (আ.)-এর দশম অধস্তন পুরুষ নুহ (আ.)। বংশপরিক্রমাটি : আদম পুত্র শিষ, শিষ পুত্র আনু, তার পুত্র কাএন, তার পুত্র মাহলাএল, তার পুত্র ইয়্যারবু, তার পুত্র ওখনুখ, তার পুত্র মুতাশলাখ, তার পুত্র লামাক, লামাক পুত্র নুহ (আ.)। নুহ (আ.)-এর চার পুত্রের একজন হাম। হামের পুত্র হিন্দ।
হিন্দের পুত্রদের একজন বঙ্গ (বঙ্গ থেকে বঙ্গদেশ/বাংলাদেশ)।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম অবস্থানের প্রামাণ্যতার মূল ঐতিহাসিক উৎস নির্দেশক হলো ছয়টি, যথা : (১) মুদ্রা, (২) শিলালিপি, (৩) মসজিদ, স্মৃতি-স্থাপত্য ও অট্টালিকা, (৪) কালোত্তীর্ণ সাহিত্য সম্ভার, (৫) রাজকীয় দলিলপত্র, (৬) ভিনদেশি পর্যটকদের বিবরণ।
৬১৭ খ্রি. ১৪ রজব বৃহস্পতিবার প্রিয় নবী (সা.)-এর আঙুলের ইশারায় চাঁদ দুই ভাগ হতে দেখে ‘রাজাভোজ’ মুসলমান হয়ে আব্দুল্লাহ নাম ধারণ করেন। ইনিই ভারতীয় সর্ব প্রথম মুসলমান।
এতে বোঝা যায়, প্রিয় নবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় এই উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। ওমর (রা.)-এর শাসনামলে মা’মুন, মুহাইমেন (রা.) নামক সাহাবিদ্বয় বাংলাদেশে আগমন করেন। এ ছাড়া উপমহাদেশে আগত সাহাবিদের মধ্যে রয়েছেন—আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল্লাহ ওতবান, আশইয়াম বিন আমর তামিমি, মা’মার তামিমি প্রমুখ।
খলিফা হারুন-অর-রশিদের আমলের মুদ্রা (১৭৬ হি./৭৮৮ খ্রি.) রাজশাহীর পাহাড়পুরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে, কুমিল্লার ময়নামতিতেও এমন আরাবিয় মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।
বিশিষ্ট সাহাবি আবু ওয়াক্কাস (রা.) তৃতীয় হিজরিতে ইসলাম প্রচারের জন্য চীন যাওয়ার পথে কিছুকাল রংপুর এলাকায় অবস্থান করে ইসলাম প্রচার করেন। কালের সাক্ষী রংপুরের ৪৮ কিমি দূরে লালমনিরহাট জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নে বড়বাড়িতে রামদাস মৌজার মসতারপাড় নামক স্থানে ৬৯ হিজনি নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম মসজিদ।
বাংলাদেশের অসংখ্য গুণী-দরবেশের উল্লেখযোগ্য হলেন—শাহ সুলতান বলখি (১০১৪ খ্রি.) বগুড়া, শাহ সুলতান রুমি (১০৫৩ খ্রি.) বৃহত্তর ময়মনসিংহ, শাহ মাখদুম রূপোস (১১৮৪ খ্রি.) রাজশাহী, শাহজালাল (১৩০৩ খ্রি.) সিলেট, খান জাহান আলী (১৪৩৭-১৪৫৮ খ্রি.) খুলনায় ইসলাম প্রচার করেন। এ ছাড়া শাহ আমানত, শাহ বদর, শাহ আলী বাগদাদি (১৪৮৯ খ্রি.), শারফুদ্দিন আবুতাওয়ামা, বায়জিদ বোস্তামি, শেখ বোরহানুদ্দিন প্রমুখ।
শাহজালাল (রহ. মৃ: ৮১৫ হি. ১৪১১ খ্রি.) ৭০৩/৭০৪ খ্রি. সিলেট জয় করেন। তাঁর ৩৬০ জন সঙ্গীর সবাই ছিলেন উচ্চ মর্যাদার দরবেশ।
খান জাহান আলী (রহ.) মৃ: ৮৬৩ হি. ১৪৫৮ খ্রি. খুলনা অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন এবং বাগেরহাটে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ডড়ত্ষফ যবত্রঃধমব (বিশ্ব ঐতিহ্য) খ্যাত ‘ষাট গম্বুজ’ মসজিদসহ অসংখ্য অমর কীর্তিগুণে তিনি স্মরণীয়।
বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখে যাওয়া সাধকদের তালিকায় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি—হাজি শরিয়তুল্লাহ (১১৮৬-১২৪৫ হি., ১৭৭৯-১৮৩৮খ্রি.) মাওলানা কারামতুল্লাহ জৈনপুরী (১২১৫-১২৯০ হি., ১৮০১-১৮৭৩ খ্রি.) শাহ নেয়ামতুল্লাহ (মৃ: ১৭০০ খি.), মাও. শামসুল হক ফরিদপুরী, মাও. আব্দুল ওয়াহহাব পিরজি হুজুর, মাও. আব্দুর রহমান কাশগড়ি (চীন), মাও. সৈয়দ আমিমুল ইহসান, মুফতি দ্বীন মুহাম্মদ খাঁ, মাও. মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) প্রমুখ। সমসাময়িক আরো কয়েকজন রয়েছেন, যাঁরা উজ্জ্বল নক্ষত্রের দ্যুতি ছড়িয়ে স্বনামেই খ্যাত। তাঁরা হলেন মাও. শামসুল হুদা পাঁচবাগী, শামসুল উলামা মাও. হেদায়েত হোসেন, খান বাহাদুর মুসা, খানবাহাদুর আহসানুল্লাহ, নওয়াব সলিমুল্লাহ প্রমুখ।
বাংলাদেশের নগর-বন্দর নামকরণে আরবি-ফারসির যোগসূত্র লক্ষণীয়। ‘সাবাউর’ থেকে সাভার, ‘বার-হিন্দ’ থেকে বরেন্দ্র, ‘আদ্খুলনা’ থেকে খুলনা, ‘সাব্ত-ই-গাঙ’ থেকে চট্টগ্রাম নামের বিকাশ। আবার ময়মনসিংহ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মৌলভীবাজার ইত্যাদির নামকরণ আর ইসলামাবাদ, জালালাবাদ, নাসিরাবাদ সবই মুসলিম ঐতিহ্য স্মারক হিসেবে সমুজ্জ্বল।
ইসলামের জন্য অবদান রাখছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ইসলামিক স্টাডিজ। কলেজে ইসলাম শিক্ষা। স্কুলে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা। আছে বিশ্বমানের কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা। প্রতিবছর লক্ষাধিক বাংলাদেশি পবিত্র হজব্রত পালন করেন।
