ব্রিটেনে সিলেটের মুন্নার ঐতিহাসিক বিজয়

দীর্ঘ ২৮ বছরের এক অনিশ্চিত যাত্রা আর রুদ্ধশ্বাস আইনি লড়াই শেষে অবশেষে ব্রিটিশ আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে দেশটিতে থাকার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন ৪৬ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক মুন্না মিয়া। সিলেটের এই ব্যক্তির এই জয় কেবল তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জন্য একটি ‘নতুন উদাহরণ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকায় ক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং ব্রিটিশ সরকারের অভিবাসন সংক্রান্ত কড়াকড়ির মধ্যে এই রায় অ্যাসাইলাম প্রত্যাশী ও অভিবাসন আইনজীবীদের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

সিলেট থেকে ১৯৯৮ সালে অত্যন্ত সংগোপনে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন মুন্না মিয়া। দীর্ঘ ১২ বছর তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে লন্ডনে বসবাস করেন। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ ১৪ বছরের আইনি যুদ্ধ।

ব্রিটিশ হোম অফিস দাবি করেছিল, মুন্না ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যে এসেছেন এবং এর আগের কোনও প্রমাণ নেই। তবে আপার টিয়ার ট্রাইব্যুনাল সেই দাবি নাকচ করে দিয়ে মুন্নার দীর্ঘ ২৮ বছরের বসবাসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। আদালত স্বীকার করেছে যে, প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ তিন দশক ধরে প্রামাণ্য দলিল জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব, যা এই মামলায় মুন্নার পক্ষে মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে।

মুন্না মিয়া দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একজন সক্রিয় কর্মী এবং বাংলাদেশে ফিরলে তিনি রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হবেন। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় আসীন হওয়ায় তার এই যুক্তি আইনিভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার কথা ছিল। কারণ, নিজের দল ক্ষমতায় থাকলে ‘রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়’ সাধারণত ধোপে টিকে না।

কিন্তু এখানেই মুন্নার আইনজীবীরা মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, দীর্ঘ সময় বিলেতে বসবাসের ফলে সামাজিক একীভূতকরণ এবং ব্রিটিশ হোম অফিসের পদ্ধতিগত ভুলগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রায় প্রমাণ করলো যে, দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাজ্যে বসবাস এবং পারিবারিক জীবন এখন অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে শক্তিশালী আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে।

২০২৪ সালের ১৬ মে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাজ্য একটি ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ প্রত্যাবাসন চুক্তি সই করেছিল। সেই চুক্তির লক্ষ্য ছিল ব্যর্থ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার ছাড়াই দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। মুন্নার আইনজীবীরা সেই চুক্তিজনিত আশঙ্কার জটিলতাগুলো এড়িয়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলে এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালে এই বিজয় ছিনিয়ে আনেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুন্নার এই বিজয় ব্রিটিশ সরকারের ‘অটোমেটেড’ বা দ্রুত বহিষ্কার নীতির মুখে একটি বড় আইনি বাধা।

মুন্না মিয়ার মামলাটি এখন পুনরায় শুনানির জন্য ফার্স্ট-টিয়ার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাজ্য যে নতুন আশ্রয় নীতি ঘোষণা করেছে। এতে প্রতি ৩০ মাস অন্তর শরণার্থী স্ট্যাটাস পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। মুন্নার মামলাটি সেই নীতির জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে লন্ডনের চ্যান্সেরী সলিসিটর্সের কর্ণধার ব্যারিস্টার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, সরকারের কঠোর বহিষ্কার নীতি থাকলেও দীর্ঘ সময় বসবাসের শক্ত প্রমাণ থাকলে আইনি পথে বিজয় সম্ভব।

সৌজন্যে: বাংলাট্রিবিউন

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন