ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে সুনামগঞ্জের এক যুবককে সীমান্তপথে ভারতে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। বর্তমানে ওই যুবক ভারতের গুয়াহাটির একটি রিফিউজি ক্যাম্পে আটক রয়েছেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
আটক যুবকের নাম মান্নান মিয়া (২৮)। তিনি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের কাইয়ারগাঁও গ্রামের দিনমজুর মো. আলী আকবর ও সখিনা খাতুনের ছেলে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসে একই ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের আলামিন নামের এক ব্যক্তি মান্নানের বাবা-মাকে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে কয়লা কুড়ানোর ভালো কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেন। এ জন্য ২২ হাজার টাকার বিনিময়ে মান্নানকে ভারতে পাঠানোর বিষয়ে চুক্তি হয় বলে পরিবারের দাবি। পরে আলামিনের মাধ্যমে মান্নানকে একই উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের নৈইগাঁও গ্রামের মৃত শাহাব উদ্দিনের ছেলে শাহ আলমের কাছে তুলে দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, শাহ আলম ২০২৫ সালের মে মাসে মান্নানকে নিয়ে তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে তাকে জম্মু-কাশ্মীরে নিয়ে গিয়ে সেখানে একা রেখে শাহ আলম চলে যান।
পরিবারের দাবি, মান্নান ভারতে গিয়ে ভাষা না জানায় এবং তার কাছে পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা না থাকায় চরম বিপাকে পড়েন। একপর্যায়ে কাশ্মীর থেকে গুয়াহাটি হয়ে বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টা করলে ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা তাকে আটক করেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে মান্নান জানান, বাংলাদেশ থেকে কাজ দেওয়ার কথা বলে দালালদের মাধ্যমে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে কাশ্মীরে রেখে দালালরা চলে যায়।
বর্তমানে মান্নান মিয়া ভারতের গুয়াহাটির কচুতলা রিফিউজি ক্যাম্পে আটক রয়েছেন এবং সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সময়ে আরও এক যুবক ভারতে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একই সময়ে কাইয়ারগাঁও গ্রামের বিল্লাল নামের আরও এক যুবককেও ওই চক্রের মাধ্যমে মান্নানের সঙ্গে কাশ্মীরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সুনামগঞ্জের বনগাঁও এলাকার মালিক মিয়ার মাধ্যমে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিল্লালকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে মান্নানের বাবা আলী আকবর পেশায় দিনমজুর। আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় ভারতে থাকা ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা-মায়ের আকুতি মান্নানের বাবা আলী আকবর ও মা সখিনা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের গ্রামের আলামিন ও রঙ্গারচর ইউনিয়নের নৈইগাঁও গ্রামের শাহ আলম মিলে আমার সহজ-সরল ছেলেকে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ২২ হাজার টাকার বিনিময়ে ভারতে নিয়ে যায়। পরে তাকে কাশ্মীরে রেখে তারা চলে যায়। আমরা অসহায় অবস্থায় আছি।”
তারা দ্রুত সরকারি উদ্যোগে মান্নানকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে আলামিন ও শাহ আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রতন শেখ পিপিএম জানান, মান্নানকে ভারতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তার অভিভাবকদের বিজ্ঞ আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মান্নানের পরিবার এখন সরকারি উদ্যোগে দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
