অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা খোদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বিরুদ্ধে শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে লিখিত চিঠি দিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। কিন্তু অলৌকিক এক প্রশাসনিক বেড়াজালে আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে পার পেয়ে গেছেন সেই বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা। বিচার হওয়া তো দূরের কথা, শাস্তির মেয়াদ শেষ না হতেই আবারো প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে হবিগঞ্জেই পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি।
বলা হচ্ছে শায়েস্তাগঞ্জ থানার সাবেক বিতর্কিত ওসি এবং বর্তমানে লাইনওয়ার ইন্সপেক্টর শেখ নাজমুল হক কামালের কথা। তার এই রহস্যজনক পুনঃযোগদানে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের খোলসে ঢাকা এমন ‘চাঁদাবাজ’ ও রাজনৈতিক দোসরদের খুঁটির জোর কোথায়?
চিঠি লিখে সাড়ে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি!
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ওলিপুরে অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ ‘প্রাণ-আরএফএল’ এর ‘হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ সহ তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাছে সহযোগিতা চেয়ে পৃথক তিনটি লিখিত চিঠি দেন তৎকালীন ওসি নাজমুল হক কামাল। ১০ অক্টোবর ওসির নিজ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিগুলোতে শারদীয় দুর্গাপূজা ও কমিউনিটি পুলিশিং ডে উপলক্ষে প্রত্যেকের কাছে সাড়ে তিন লাখ টাকার খরচের একটি আজব হিসাব দেওয়া হয়।
চিঠিতে পূজা উদযাপনের নামে কাচ্চি বিরিয়ানি, জিলাপি, মিষ্টি, দই, পানি ও বিভিন্ন প্রকার ফলের খরচ বাবদ ১ লাখ টাকা এবং ২৮ অক্টোবর কমিউনিটি পুলিশিং ডে উদযাপনের ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং ও ৫শ লোকের খাবারের আয়োজন বাবদ আরও আড়াই লাখ টাকার মালামাল চেয়ে সরাসরি চাঁদা দাবি করা হয়।
তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ও নাটকীয় বরখাস্ত:
সরকারি পদের অপব্যবহার করে এভাবে প্রকাশ্য চিঠিতে চাঁদা দাবির ঘটনাটি জানাজানি হলে ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর তৎকালীন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সামছুল হককে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি ঘটনার সত্যতা পেয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট জমা দিলে ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এক আদেশে ওসি কামালকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হলে বিষয়টি তদন্ত করেন হবিগঞ্জ ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মাহিদুজ্জামান। এই বিভাগীয় মামলায় প্রাণ কোম্পানীর কর্মকর্তা এহসান হাবিব ও সাংবাদিক নুর উদ্দিন সুমন সহ সংশ্লিষ্টরা ২০২৫ সালের ২ জুলাই সরাসরি সাক্ষ্য প্রদান করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাক্ষ্যগ্রহণের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও অদৃশ্য কারণে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হবিগঞ্জ সদর ও শায়েস্তাগঞ্জ এলাকায় শেখ নাজমুল হক কামাল ছিলেন ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারী এক কর্মকর্তা। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি বিএনপি ও আলেম ওলামাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছেন। বিএনপি দলের কেন্দ্রীয় ঘোষিত কোনো কর্মসূচিই তিনি হবিগঞ্জে বাস্তবায়ন করতে দেননি। শুধু রাজনৈতিক নিপীড়নই নয়, তার বিরুদ্ধে নিরীহ লোকজনকে হয়রানি, ভাঙারির দোকান থেকে চাদা আদায় এবং ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা তোলারও গুরুতর অভিযোগ ছিল।
নতুন মোড়কে ২০০৫ ব্যাচের দোহাই: অতীতে আ’লীগের দোসর, এখন বিএনপি সাজার চেষ্টা!
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটলেও রাতারাতি খোলস বদলে ফেলেছেন এই ধূর্ত কর্মকর্তা। নিজেকে রক্ষা এবং পুনরায় ফায়দা লুটতে তিনি এখন ‘২০০৫ ব্যাচের’ দোহাই দিচ্ছেন। মূলত ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ হওয়ায়, নিজেকে রাজনৈতিকভাবে সেই আমলের ‘বঞ্চিত’ বা ‘সহানুভূতিশীল’ হিসেবে প্রমাণ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। অথচ বিগত ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করে তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছেন। সেই চরম অপরাধের শাস্তি বা বিচার না পেয়ে উল্টো অলৌকিক ক্ষমতাবলে গত সপ্তাহে আবারো হবিগঞ্জেই লাইনওয়ার ইন্সপেক্টর হিসেবে দাপটের সাথে যোগদান করেছেন। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, নিজের অতীত পাপ ঢাকতে এবং পোস্টিং টিকিয়ে রাখতে তিনি এখন বর্তমান সরকার দলের কিছু প্রভাবশালী নেতার ডানা ও আশ্রয়ের নিচে লুকানোর জন্য জোর লবিং, তদবির ও দৌড়ঝাঁপ করছেন।
জনমনে ক্ষোভ, প্রশাসনের নীরবতা:
একটি জেলায় গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ও প্রমাণিত চাঁদাবাজ কর্মকর্তাকে পুনরায় একই জেলায় পোস্টিং দেওয়া নিয়ে সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, যেখানে জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর এবং সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে এমন বিতর্কিত কর্মকর্তার পুনর্বাসন পুলিশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এদিকে নাজমুল হক কামালের হবিগঞ্জে যোগদানের খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, চাঁদাবাজির ঘটনায় অভিযুক্ত ও বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত একজন কর্মকর্তাকে আবার হবিগঞ্জে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ। এ নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে।
হাজী মতিউর রহমান লিখেছেন, এই নাজমুল ওসি আওয়ামী লীগের প্রভাব বলয়ে চলাফেরা করতেন এবং আমাদের তৎকালীন নেতাকে বর্তমান এমপিকেও নাজেহাল করেছিলেন। এসডি রুয়েল মন্তব্য করেন, তিনি স্প্রে পার্টির গডফাদার ছিলেন। তার সময় মানুষের সঙ্গে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
মো. সৌকত লিখেছেন, বর্তমান সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, এই ওসিকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। তা না হলে তিনি হবিগঞ্জের সুনাম ক্ষুণ্ন করবেন।
শুধু তাই নয় শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন চত্বরে আয়োজিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানস্থলের ব্যানার ছিঁড়ে ফলে দেন এবং পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে লাঠিচার্জ করে উপস্থিত আলেম, মুসল্লি ও অংশগ্রহণকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। নাজমুল হক কামালের – বিভাগীয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, হবিগঞ্জ ইন-সার্ভিস পুলিশ সুপার মাহিদুজ্জামান জানান, তার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিটি তিনি নিজ মোবাইল ফোন থেকে প্রেরণ করেছিলেন। পরবর্তীতে মোবাইল ফোনটি জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। ফরেনসিক প্রতিবেদনে চাঁদা দাবির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রায় এক বছর আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হওয়ার কথা ছিল। কীভাবে তার আবার পোস্টিং হলো, তা আমার জানা নেই।
এবিষয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো: তারেক মাহমুদ জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই খোঁজ নিয়ে দেখছি। সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই বিতর্কিত কর্মকর্তার পোস্টিং বাতিল করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত রায় ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
